‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’: ভিন্ন ধর্মে প্রেমের অভিযোগে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, হুমকি ও হয়রানি
হিন্দু ছেলের সঙ্গে মুসলিম মেয়ের প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ তুলে ফেইসবুকে ছড়ানো হচ্ছে নাম, ছবি, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা। ভুক্তভোগীদের কেউ নিরাপত্তার ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন বন্ধ করেছেন, কেউ পড়াশোনা ও কাজকর্মে বিরতি দিয়েছেন।
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচারকারী বিভিন্ন ফেইসবুক পেইজে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে ব্যক্তির নাম, ছবি, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা প্রকাশ করে মানুষকে কীভাবে হয়রানির মুখে ফেলা হচ্ছে, তার উদ্বেগজাগানো চিত্র উঠে এসেছে ডিজিটাল মিডিয়া গবেষণা সংস্থা ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে।
ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ২৩টি ফেইসবুক পেইজে এ ধরনের ২৮৮টি পোস্টের সন্ধান পেয়েছেন তাদের গবেষকরা। এসব পোস্টের শিকার ১২ জনের সাক্ষাৎকারও নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি।
সাক্ষাৎকারদাতারা বলেছেন, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের পর তারা হুমকি, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ সামাজিক কলঙ্কের ভয় ও নিরাপত্তার উদ্বেগে দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং পড়াশোনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
সাক্ষাৎকারদাতারা এক নারী শিক্ষার্থী ডিসমিসল্যাবকে বলেছেন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন, ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে তার ছবি, ফোন নম্বর ও বাসার ঠিকানা। হিন্দু এক ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ তুলে তাকে লক্ষ্য করে এসব পোস্ট দেওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্য এখন এমন সবার হাতে পৌঁছে গেছে, যারা তার ক্ষতি করতে পারে। ফলে নিজের পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ওই তরুণী।
ডিসমিসল্যাবকে তিনি বলেন, “আমাকে চোরের মতন জীবন কাটাতে হচ্ছে।”
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ নামের এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বে দাবি করা হয়, হিন্দু ছেলেরা বাংলাদেশের মুসলিম মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করে। ওই তত্ত্বের নামে ফেইসবুক পেইজ বা গ্রুপ খুলেও মেটার নীতিমালা ভেঙে হয়রানিমূলক পোাস্ট দেওয়া হচ্ছে।
এসব পোস্টে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার এমন ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা, যা তাকে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা অন্য কোনো ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে, তাকে বলা হয় ‘ডক্সিং’।
ডক্সিংয়ের শিকার যে ১২ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে ডিসমিসল্যাব, তাদের ফোন নম্বর ওই পোস্টগুলোতে প্রকাশ করা হয়েছিল। তারা সবাই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
একজন আইন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেছেন, ডক্সিংয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা আরও বড় ধরনের নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ যেভাবে ডক্সিংয়ের হাতিয়ার
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ শব্দটির উৎপত্তি ভারতে। ২০২৩ সালে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান অল্ট নিউজের এক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের পাল্টা একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটে।
‘লাভ জিহাদ’ তত্ত্বে অভিযোগ করা হয়, মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেন। এর বিপরীতে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ তত্ত্বে দাবি করা হয়, হিন্দু পুরুষেরা মুসলিম নারীদের প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করেন।
ভারত থেকে পরে বাংলাদেশেও এই তত্ত্বের বিস্তার ঘটে। আন্তধর্মীয় সম্পর্কে জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে শুরু হয় ডক্সিং।
ডিসমিসল্যাব ফেইসবুকে বাংলায় ‘ভাগওয়া লাভ’ শব্দটি দিয়ে অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে পোস্ট প্রকাশকারী ৫৪টি পেইজ শনাক্ত করে। এরপর ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত ওই পেইজগুলোর পোস্ট সংগ্রহ করেন গবেষকেরা। এতে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ সংশ্লিষ্ট ৩ হাজার ৮২৮টি পোস্ট পাওয়া যায়। পরে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, এমন পোস্টগুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
পর্যালোচনায় ২৩টি পেইজের ২৮৮টি ডক্সিং পোস্ট পাওয়া যায়। একই পোস্ট একাধিকবার প্রকাশিত হলে সেগুলো বাদ দেওয়ার পর স্বতন্ত্র পোস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৪।
এসব পোস্টে কথিত সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগে এক বা একাধিক ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক এবং একটি ক্ষেত্রে ইমেইল ঠিকানা।
পর্যালোচনা করা ১৯৪টি স্বতন্ত্র পোস্টের ৯৭ শতাংশে ছবি ছিল। ১০৭টি পোস্টে (৫৫ শতাংশ) নাম, ৫৮টিতে (৩০ শতাংশ) ঠিকানা, ৩১টিতে (১৬ শতাংশ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক এবং ১২টিতে (৬ শতাংশ) ফোন নম্বর প্রকাশ করা হয়।
১৯৪টি পোস্টের মধ্যে ১০৩টিতে (৫৩ শতাংশ) একজন পুরুষ ও একজন নারীর নাম উল্লেখ করে তাদের আন্তধর্মীয় সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। ৩৫ শতাংশ পোস্টে শুধু পুরুষ এবং ১২ শতাংশ পোস্টে শুধু নারীর নাম বলা হয়।
এর বাইরেও বিভিন্ন ফেইসবুক পেইজ ও গ্রুপে একই ধরনের ক্যাপশন ব্যবহার করেও পোস্ট ছড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে ডিসমিসল্যাব।
একটি ক্যাপশনে দাবি করা হয়, হিন্দু এক ব্যক্তির সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পর এক মুসলিম শিক্ষার্থীকে ‘উদ্ধার’ করা হয়েছে। এরপর পাঠকদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের ওপর নজর রাখার আহ্বান জানানো হয়।
অন্য একটি ক্যাপশনে বলা হয়, এক যুগল একসঙ্গে পালিয়ে গেছেন। তাদের কোথাও দেখা গেলে অবস্থান জানাতে পাঠকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
আতঙ্ক, হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল
‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ প্রচারণার নামে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের কারণে কী ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে, ডিসমিসল্যাবকে জানিয়েছেন ১২ জন ভুক্তভোগী।
তাদের মধ্যে দুজন বলেছেন, পোস্টে উল্লিখিত অভিযোগ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। বাকি ১০টি নম্বর পোস্টে নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিরাই ব্যবহার করেন। তাদের অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।
ফোন নম্বরের পাশাপাশি ৩১টি পোস্টে প্রকাশিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলের লিংকও যাচাই করেছে ডিসমিসল্যাব। এর মধ্যে ১৭টি প্রোফাইল আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাকি ১৪টি তখনও সক্রিয় ছিল।
এক ভুক্তভোগী (ভিকটিম-১) ডিসমিসল্যাবকে বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের কারণে তার কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি তাকে হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছে।
ছবি ও ফটোকার্ডের মাধ্যমেও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের পোস্ট পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। এরকম একটি পোস্ট ১ হাজার ৫০০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছিল।
‘ইসলাম ইনসাইট’ নামের একটি পেইজের পোস্টে বলা হয়, “দেশের মুসলিম নারীরা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপের শিকার। এখনই সচেতন হওয়ার সময়। গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখছি, এ দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আমাদের মুসলিম বোনদের লক্ষ্যবস্তু করছে, প্রেমের ফাঁদে ফেলছে, ধর্ষণ করছে, ধর্মান্তরিত করছে এবং জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার জন্য ভারতে পাচারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”
এসব পেইজ ও গ্রুপ সম্পর্কে ওই ভুক্তভোগী (ভিকটিম-১) বলেন, “আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এমন অনেক গ্রুপ ও পেইজ রয়েছে, যাদের একমাত্র কাজ এসব পোস্ট তৈরি করা। এগুলো পুরোপুরি সংগঠিত অপরাধ। কিছু পেইজ ও গ্রুপের একমাত্র উদ্দেশ্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়ানো। ব্যক্তিগতভাবে আমার হয়ত কোনো শত্রু ছিল না, কিন্তু ওই গ্রুপগুলোর একটি লক্ষ্যবস্তু দরকার ছিল। নিজেদের পেইজের পরিচিতি ও লাইক বাড়াতে তারা আমার ব্যক্তিগত জীবনকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেছে।”
আরেক ভুক্তভোগী (ভিকটিম-২) বলেন, “মুসলিম মেয়েটি আমার সহপাঠী। তার সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।”
ডক্সিংয়ের কারণে দৈনন্দিন জীবন কীভাবে ব্যাহত হয়েছে, তা জানাতে গিয়ে আরেক ভুক্তভোগী (ভিকটিম-৪) বলেন, “এসব পোস্ট যখন আসছিল, একদিন আমার বাবা অচেনা একটি নম্বর থেকে ফোন পান। আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কেউ হয়ত বাবাকে হুমকি দেওয়ার জন্য ফোন করেছে। পরে দেখি, সেটি কুরিয়ার সার্ভিসের ফোন ছিল। মানসিক আঘাত এতটাই গভীর যে যেখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সেখানেও আমি ভয় পাই। আমি চোরের মতো জীবন কাটাই।”
হয়রানির শিকার হওয়ার পর আইনি সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে ভিকটিম-১ বলেন, “আমি পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম। তারা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি খুব ধীর। প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ ততক্ষণে মিথ্যাটি বিশ্বাস করে ফেলেছে।”
ডক্সিংয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইন বিশেষজ্ঞ মনীষা বিশ্বাস বলেন, “নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে ডক্সিং আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এর ফলে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল কিংবা যৌন সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
“পরিবারের সদস্যরাও হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এমনকি পরিচয় চুরি বা জালিয়াতির সুযোগও তৈরি হয়। তাই ডক্সিংকে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে দেখলে চলবে না; অনলাইন নিপীড়ন থেকে বাস্তব জীবনে ক্ষতির দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবেও একে স্বীকৃতি দিতে হবে।”
অল্প কয়েকটি পেইজ থেকেই অধিকাংশ পোস্ট ও প্রতিক্রিয়া
ডিসমিসল্যাব দেখেছে, ‘ভাগওয়া লাভ’ প্রচারণার নামে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের পোস্টগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব পোস্টে মোট প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ারের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৮১৫। অর্থাৎ প্রতিটি পোস্টে গড়ে ৩৮১টি ইন্টারঅ্যাকশন বা ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এর মধ্যে গড়ে প্রায় ২৫৪টি ছিল প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাকশন।
সব পোস্টই এসেছে ২৩টি ফেইসবুক পেইজ থেকে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি পেইজ থেকে প্রকাশিত হয়েছে মোট পোস্টের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
পেইজগুলো হলো—বিউটিফুল ইসলাম থেকে ৬২টি, ভয়েস অব উম্মাহ থেকে ৩৯টি, রুহের ডাক ও অনার গার্ড বিডি থেকে ৩৬টি করে এবং মো. রাসেল ভালুকা ধীতপুর থেকে ২১টি।
ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনা করা ২৮৮টি পোস্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া পোস্টটি শুরু হয়েছিল ‘এক্সক্লুসিভ ভিডিও’—এই দুটি শব্দ দিয়ে।
২৮ জুলাই ২০২৬-এ মোল্লার আলো নামের একটি পেইজ থেকে পোস্টটি প্রকাশ করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, মানিকগঞ্জে একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ব্যবহার করে মুসলিম মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু করছে।
২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য ও শেয়ার মিলিয়ে ১৫ হাজার ২৮১টি ইন্টারঅ্যাকশন হয়। পর্যালোচনা করা ২৮৮টি পোস্টের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ।
ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের বিষয়বস্তু সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে মোল্লার আলো পেইজ থেকে। পেইজটি ২০টি পোস্ট প্রকাশ করলেও সেগুলোতে মোট ইন্টারঅ্যাকশন ছিল ৩৮ হাজার ১৮৬টি, যা মোট ইন্টারঅ্যাকশনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
পেইজটির প্রতিটি পোস্টে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি ইন্টারঅ্যাকশন হয়েছে। ২৮৮টি পোস্টের সামগ্রিক গড়ের তুলনায় যা প্রায় পাঁচ গুণ।
মোট ইন্টারঅ্যাকশনের হিসাবে মোল্লার আলোর পরের অবস্থানে রয়েছে ভয়েস অব উম্মাহ, রুহের ডাক, ফাইট এগেইনস্ট হিন্দুত্ব ও অনার গার্ড বিডি। শীর্ষ পাঁচটি পেইজ থেকেই সব পোস্টের মোট ইন্টারঅ্যাকশনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এসেছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি পোস্ট প্রকাশ করেছে বিউটিফুল ইসলাম। তবে পেইজটির পোস্টগুলোতে মোট ইন্টারঅ্যাকশন ছিল ৫ হাজার ২৭০টি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও ডক্সিংয়ের বিস্তার
ফেইসবুকের একটি পোস্টের সূত্র ধরে ‘সেইভ মুসলিম গার্লস’ নামের একটি ওয়েবসাইটের সন্ধান পায় ডিসমিসল্যাব। বাংলা ভাষার এই ওয়েবসাইটে মুসলিম নারী ও হিন্দু পুরুষের কথিত সম্পর্ক নিয়ে নিবন্ধ, ভিডিও, সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশ করা হয়।
এসব কনটেন্টের বড় অংশে প্রতারণা, যৌন শোষণ, ধর্মান্তর ও সহিংসতার অভিযোগ তুলে সেগুলোকে ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সাইটটির একটি বিভাগের নাম ‘মুসলিম নামের নষ্টাদের তালিকা’। এই পাতায় পুরুষদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য পাত্রী কোনো অমুসলিম পুরুষের ‘দাসী’ ছিলেন কি না, তা যাচাই করে নিতে। একই সঙ্গে নারীদের সতর্ক করা হয়েছে, যেন তাদের নাম ওই তালিকায় না আসে।
সাইটটির দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে কথিত ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তথ্য শেয়ার করতেও পাঠকদের উৎসাহিত করা হয়েছে।
ডিসমিসল্যাব বলছে, এখানে আন্তধর্মীয় সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগে নারীদের যৌন মর্যাদাহীন ও ধর্মীয়ভাবে অবিশ্বস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এভাবে তালিকাটিকে প্রকাশ্যে হেয়প্রতিপন্ন করার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটটিতে এসব অভিযোগের জন্য আলাদা একটি তালিকাও রয়েছে। সেখানে পোস্টগুলো এলাকাভিত্তিক সাজানো হয়েছে। ৪০টি জেলা ধরে তথ্য খোঁজার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ‘নাম/ঠিকানা পাওয়া যায়নি’ নামে একটি আলাদা বিভাগ রাখা হয়েছে।
শিরোনামগুলোতে কথিত আন্তধর্মীয় সম্পর্ককে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোথাও যৌন অসদাচরণ, কোথাও প্রেমের ফাঁদে ফেলা বা ধর্মান্তরের অভিযোগ, আবার কোথাও জবরদস্তি ও নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে।
কিছু শিরোনামে পাঠকদের কোনো নারীকে ‘চিনে নিতে’ আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যগুলোতে রেস্তোরাঁ, হোটেল কিংবা অবকাশকেন্দ্রে কথিত সাক্ষাতের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
একটি পোস্টে কথিত প্রেমের সম্পর্কের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ‘হিন্দুর দাসী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিছু পোস্টে নাম বা ঠিকানা জানা নেই—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পাঠকদের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে মেটার নীতিমালা কী বলে
মেটার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডে ‘প্রাইভেসি ভায়োলেশনস’ বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনসংক্রান্ত বিধানে অন্যের ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য প্রকাশে বিধিনিষেধ রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ফোন নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা। তবে কিছু সীমিত ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই তথ্য প্রকাশ করলে কিংবা দাতব্য উদ্দেশ্যে, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজতে অথবা কোনো ব্যবসা বা সেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তথ্য প্রকাশ করা হলে তা অনুমোদিত হতে পারে।
অন্যের ব্যক্তিগত বাসস্থানের তথ্য প্রকাশ করা কিংবা সেই তথ্য জানতে চাওয়ার ক্ষেত্রেও মেটার বিধিনিষেধ রয়েছে।
ডিসমিসল্যাব বলছে, তাদের পর্যালোচনা করা যেসব পোস্টের মধ্যে ব্যক্তিগত ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ইমেইল প্রকাশের বিষয়টি পাওয়া গেছে, সেসব তথ্য প্রকাশের পেছনে মেটার নীতিমালায় উল্লেখ করা কোনো বৈধ উদ্দেশ্যের কথা পোস্টগুলোতে দেখা যায়নি।
একটি পোস্টে পাঠকদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল, ‘আপনার আশপাশে এই ছেলে ও মেয়েকে দেখতে পেলে আমাদের তাদের অবস্থান জানান।’
এ ধরনের আহ্বানের মাধ্যমে পোস্টে নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের অবস্থান খুঁজে বের করতে পাঠকদের উৎসাহিত করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। অথচ অন্যের ব্যক্তিগত বাসস্থানের তথ্য জানতে চাওয়াও মেটার নীতিমালায় নিষিদ্ধ।
সাক্ষাৎকার নেওয়া সব ভুক্তভোগীকেই জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তারা ফেইসবুকে পোস্টগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন কি না। কেউই তা করেননি।
তাদের কয়েকজন জানান, পোস্টগুলোর সরাসরি লিংক তারা পাননি। আবার কেউ কেউ অভিযোগ জানানোর পর পোস্ট সরানো হবে কি না, সেই অপেক্ষায় না থেকে ফেইসবুক ব্যবহার বন্ধ করে দেন।
