কেমন সাংবাদিকতা চাইতেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী
“রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া গণমাধ্যমের কাজ নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা বদলের কোনো প্রক্রিয়ায় কোনো সংবাদমাধ্যমের জড়িয়ে পড়া আমরা সমর্থন করি না।”
‘শখের বশে’ যখন সাংবাদিকতা শুরু করলেন ২২ বছরের ‘আড্ডাবাজ’ তরুণ তৌফিক ইমরোজ খালিদী, তখন পরিবার বা বন্ধুরা ভেবেছিলেন, পড়াশোনা শেষে হয়তো সিভিল সার্ভিস কিংবা অন্য কোনো চাকরিতে যাবেন ইংরেজি সাহিত্যের এই ছাত্র।
কিন্তু তৌফিক ইমরোজ খালিদী সেখান থেকে বের হতে পারেননি কখনও; দুয়েকবার কিছুদিনের জন্য সাংবাদিকতায় বিরতি নিয়ে অন্যত্র গেলেও ফিরে এসেছেন আবারও।
এক দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের দুটি নেতৃস্থানীয় ইংরেজি দৈনিকে মাঠের সাংবাদিকতা আর সম্পাদনার টেবিলে কাজের পর তিনি গেলেন বিবিসিতে।
এর পরের পাঁচ বছর সেখানে কাটিয়ে তৌফিক খালিদী দেশে ফিরলেন; বাটন-ফোনের সেই সময়ে তার হাত ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মধ্য দিয়ে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদের নতুন যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ ঘটল।
প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দুই দশক দায়িত্বের এই সময়ে অনেক প্রথমের জন্ম দিয়েছিলেন তৌফিক খালিদী; যা মানুষের সংবাদ সেবা গ্রহণের অভ্যেসকেও বদলে দিয়েছিল নানাভাবে।
‘শখের বশে’ আসা পেশায় এক জীবন কাটিয়ে যাওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদী আসলে কেমন সাংবাদিকতা চাইতেন? তার প্রায় চার দশকের সাংবাদিকতার যাত্রা-ই বা কেমন ছিল?
নিজের লেখা আর কথামালায় নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ তৌফিক খালিদী বিভিন্ন সময়ে ঘটিয়েছেন; ৫৯ বছর বয়সে তার বিদায়ের পর সাবেক সহকর্মীদের স্মৃতিচারণায়ও এসেছে সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কাজের সাক্ষ্য।
অন্য পেশায় যাননি কেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী, তার একটি ভাষ্যও ২০১৫ সালে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিয়েছিলেন তিনি।
“আর কোনো ব্যবসা আমি জানি না সাংবাদিকতা ছাড়া”, কবি আল মাহমুদের কবিতার পঙক্তি ‘ছলনা জানি না বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি’-এর সঙ্গে মিলিয়ে বলেছিলেন খালিদী।
কারও কাছে ‘নাকউঁচু’, কারও কাছে ‘একরোখা’ আর কারও কাছে কেবলই ‘অহঙ্কারী’ তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে ‘সবার আগে নির্ভুল খবর’ প্রকাশের যে ধারা গড়ে উঠেছে, সেটির প্রশংসা করেছেন তার শত্রু-মিত্র সবাই।
দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা এবং আইনি ‘হয়রানির’ মুখেও সাংবাদিকতার নিজস্ব ধরণ বজায় রাখার দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ করে ‘শুধু সাংবাদিকতাই তো করেছিলাম!’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক। তার মৃত্যুর পর ওই লেখাকে একজন সাংবাদিকের রচনা হিসেবে ‘মাস্টারপিস’ বলে বর্ণনা করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু।
‘সবার আগে বস্তুনিষ্ঠতা‘
তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলতেন, “বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা আমরা করতে পেরেছি। চাইলেই এখন কেউ গল্প-গুজবভিত্তিক প্রতিবেদন করতে পারে না।
সূত্রের নাম উল্লেখ করেই সংবাদ লিখতে হবে, বাংলাদেশে এমন ধারা কঠোরভাবে চালু করার কথা গর্বের সঙ্গে বলতেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক। তার এই অবদানের কথা স্মরণ করেন তার কড়া সমালোচকরাও।
২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানের পঞ্চদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে পথচলার শুরু থেকে দেশে সাংবাদিকতার মৌলিক পরিবর্তনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘উদাহরণ সৃষ্টিকারী’ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছিলেন প্রধান সম্পাদক খালিদী।
স্পর্শকাতর তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তত দুই সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া এবং নামহীন সূত্র ব্যবহার না করার যে চর্চা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম চালিয়ে আসছে, সে কথাও তিনি বলেন।
“অনেকে বলেছিলেন, এটা সম্ভব নয় বাংলাদেশে। সেটা বিদেশে হতে পারে, বাংলাদেশে সম্ভব নয়। সেটা আমরা করে দেখিয়েছি।”
তিনি বলেন, মৌলিক এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় জল্পনা ও গুজবভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ এবং গুজব সৃষ্টিতে সংবাদমাধ্যমের ব্যবহার অনেকটা বন্ধ করে দিয়েছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
“তখন ‘বড় সংবাদমাধ্যম’ হিসেবে যেগুলো পরিচিত ছিল, মূলধারার সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত ছিল, তারা বাধ্য হয়েছিল আমাদের সেই ধারা অনুসরণ করতে।”
আগামী দিনেও সেই ধারা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মাধ্যমেও নতুন নতুন সাংবাদিক তৈরিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “সৎভাবে, নৈতিকভাবে, নীতিনিষ্ঠভাবে সাংবাদিকতা করা সম্ভব এখনো বাংলাদেশে। অনেক অবক্ষয় হয়েছে সমাজে, অনেক খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাই আমরা, অনেক সমস্যা আছে এই সমাজে। তারপরেও কিন্তু অনেক ভালো মানুষ আছেন, অনেক ভালো কাজ করা হয়, অনেক উদ্ভাবনী শক্তি আছে মানুষের মধ্যে; তারপরও কিন্তু এদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়-অনেক দুর্নীতি মধ্যেও, অনেক দুর্বৃত্তায়নের মধ্যেও।”
২০২৩ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সপ্তদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান সম্পাদক খালিদী তার সেই মন্ত্রের কথা আরও দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছিলেন। বলছিলেন, ভুল খবর না দেওয়ার যে সম্পাদকীয় নীতি, তা পুরো যাত্রায় বজায় রেখেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এগিয়ে যাবে।
“আমরা চেষ্টা করে গেছি। লড়াইটা অব্যাহত রেখেছি, এ লড়াই অব্যাহত থাকবে। এবং লড়াইটা আমাদের সবার জন্য রাখতে হবে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রাখতে হবে, আমাদের সন্তানদের জন্য করতে হবে, যারা এই পেশায় ভবিষ্যতে আসবেন, তাদের জন্য করতে হবে।”
কেবল সাংবাদিকতাটা করতে চাওয়ার কারণে বাধা-বিপত্তির মুখে পড়ার কথা তুলে ধরে তৌফিক খালিদী বলেন, “পুরা সময়টা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। সাংবাদিকদের জীবন, সাংবাদিকতায় কখনোই সেটা থাকে না।
“আপনি যদি সাংবাদিকতাটা খুব ভালো করে করতে চান, যে কোনো দেশেই, যে কোনো সমাজেই, আমাদের দেশেতো বটেই, আপনি প্রতিনিয়তই নতুন নতুন শত্রু তৈরি করবেন, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবেন। তার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়।”
তিনি বলেছিলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কখনো কখনো ‘সত্য বলতে না পারলে’ চুপ থেকেছে, কিন্তু মিথ্যা বলেনি।
“আমাদের চেষ্টার কমতি ছিল না। আমরা চেষ্টা করে গেছি, লড়াই করে গেছি। দুর্বৃত্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াইটা অব্যাহত ছিল সবসময়।”
তৌফিক খালিদী বলেন, “সমাজে যারা সমস্যা তৈরি করে এবং আইনের শাসনকে তোয়াক্কা করে না বা আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চায় না এদেশে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে কঠিন হয়ে গেছে দিনে দিনে। কারণ, আমরা এতটা সংখ্যালঘু হয়ে গেছি যে, লড়াই করাটা কঠিন হয়ে গেছে।”
এর সঙ্গে তথ্যের সত্যতা ঠিক থাকলে, সব বাধা-বিপত্তির বিপরীতে খবর প্রকাশের বিষয়ে তার দৃঢ়তার কথা বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় লিখেছেন তার সাবেক সহকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা। নানা সময় আর্থিক সংকটে পড়া এবং আইনি হয়রানির মুখে পড়ার কথা উঠে এসেছে তাদের কথায়।
এ প্রসঙ্গে অষ্টাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বক্তব্য ছিল, “অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। শেষ পর্যন্ত মাথা নত করিনি। আমার ধারণা, আমরা শেষ বিচারে বিজয়ী হয়েছি এবং আগামী দিনগুলোতেও আমরা টিকে থাকব মাথা উঁচু করেই। আমাদেরকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।”
‘রাজনীতিক-দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা’ পেছনে লাগলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম মাথা উঁচু করে চলার কথা তুলে ধরে প্রধান সম্পাদক বলেছিলেন, “চেষ্টা হয়েছে, চরম অন্যায় করা হয়েছে, মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে। দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন, রাজনৈতিক নেতারা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন।
“ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন, আমাদের ক্ষতি করবার চেষ্টা করেছেন। অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছে, হয়রানি করেছে। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই মিলে লড়াইটা চালিয়ে গেছি।”
সাংবাদিকতায় সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও সত্যনিষ্ঠাকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার সাবেক সহকর্মী মোস্তফা মামুন বলেন, বাইরের চাপের বিরুদ্ধে লড়াই করে সঠিক তথ্য প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিতেন তিনি। একই সঙ্গে সংবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন এবং কারও প্রশংসার ক্ষেত্রেও বাড়াবাড়ি না করার নীতি অনুসরণ করতেন।
বর্তমানে দৈনিক আগামীর সময় পত্রিকার সম্পাদক মামুন বলেন, “খালিদী ভাই মনে করতেন, বাইরের যে সমস্ত চাপ আছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেই সঠিক তথ্য দিতে হবে। আর সেটা হতে হবে এমনভাবে, যাতে যে লোকটা নিউজ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেও যেন মনে করে যে আমি প্রপার ট্রিটমেন্ট পেয়েছি। কোনো কিছু লেখা হলে অভিযোগ থাকলে সেটা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, আর কারও প্রশংসা করা হলেও যেন বাড়াবাড়ি না হয়।”
এক সময় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খেলা বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়া মোস্তফা মামুন বলেন, “এই যে সংযমটুকু, সত্যের প্রতি নিষ্ঠ থাকা, এইটাই তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছিল।”
‘না, নিউজ সরবে না’
প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর পর এক স্মৃতিচারণায় যে কোনো ধরনের চাপের মুখেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইট থেকে নিউজ না সরানোর বিষয়ে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা লিখেছেন তার সাবেক সহকর্মী মুনীরুল ইসলাম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক এই জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক লিখেছেন, ২০১৮ সালের ৬ জুনের কথা। একটি সংবাদ প্রকাশের পর একটি তথ্য নিয়ে প্রবল চাপ আসছিল। সংবাদটি সরিয়ে নিতে বলা হচ্ছিল বারবার।
একরোখা হয়ে তা উপেক্ষা করে যাচ্ছিলেন বার্তা সম্পাদক মুনীরুল ইসলাম। একটা সময় মনে হল, ‘ভুল করছি না তো?’ এরপর তিনি ফোন করলেন প্রধান সম্পাদককে। প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে তার কথোপকথনের বর্ণনা তিনি দিয়েছেন এভাবে:
প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের নিউজে কি কোনো ভুল আছে?’
‘না।’
‘কনটেক্সটের বাইরে কি কিছু লিখেছি?’
‘না।’
শুনে বললেন— ‘না, নিউজ সরবে না।’
মুনীরুল ইসলাম এরপর লিখেছেন, কিছুক্ষণ পর ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে গেল। উৎকণ্ঠা নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে জানালেন প্রধান সম্পাককে। তিনি বললেন, ‘ফেইসবুকে একটা ঘোষণা দিয়ে দাও। বাকিটা আমি দেখছি।’
খানিকক্ষণ পর আবার প্রধান সম্পাদকের ফোন এল মুনীরুল ইসলামের কাছে; তার বার্তা, ‘অফিসের গাড়িতে উঠে আমার বাসায় চলে আস।’
“চলে গেলাম। পরে জেনেছিলাম, আমার নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি আমাকে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন,” লিখেছেন মুনীরুল ইসলাম।
ওই লেখায় তিনি আরও লিখেছেন, “‘না, নিউজ সরবে না।’ কিছু কিছু বাক্য খুব ছোট্ট। অথচ কোনো কোনো মুহূর্তে তাই হয়ে ওঠে বড় আশ্রয়।”
খালিদীর মৃত্যুর পর বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করে খবর প্রকাশ এবং চাপের মুখেও তা না সরানোর বেশ কিছু ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে তার সাবেক সহকর্মী এবং পর্যবেক্ষকদের কথায়।
একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে করা কিছু খবর সরাতে না চাওয়ার কারণে আইনি হেনস্তার মুখে পড়ার কথা ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
এক ব্যবসায়ী এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় আদালতের আদেশ নিয়ে গত এক যুগে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন মুছে ফেলার ‘অদ্ভুত, অযৌক্তিক’ চাপের মুখোমুখি হওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, এসব চাপে তারা নতি স্বীকার করবেন না।
“ভুল হলে আমরা স্বীকার করব, সংশোধন করার প্রয়োজন হলে সংশোধন করে দেব, কিন্তু চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আমরা কোনো খবর তুলে নেব না,“ বলেছিলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, পুরনো সংবাদ মুছে ফেলার জন্য চাপ দেওয়ার কৌশল হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এই শীর্ষ চার সম্পাদকের নামে বিভিন্ন জেলা থেকে তিন ডজনের বেশি উকিল নোটিস পাঠানো হয়েছে। সেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং মানহানির অভিযোগে মামলা করারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন নামে পাঠানো হলেও সেগুলোর ভাষা, বক্তব্য ও দাবি একই রকম।
লিখিত বক্তব্যে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব কোনো অনুসন্ধান এসব প্রতিবেদনে নেই; সম্পূর্ণভাবে মামলার কার্যক্রম ও আদালতের আদেশই সেখানে বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাহলে কোন যুক্তিতে একটি সংবাদমাধ্যম এসব প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলবে?”
“আমাদের বার বার বলা হয়েছে, অন্যরাও নাকি এ বিষয়ে তাদের প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলেছে। বিভিন্নভাবে তদবির করানো হয়েছে প্রভাবশালীদের দিয়ে, যাদের মধ্যে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও আছেন। বলা হয়েছে, তারা সরিয়ে ফেলেছেন, আমরা কেন তা করছি না। দীর্ঘদিন নানাভাবে চেষ্টার পরও প্রতিবেদন সরাতে রাজি করাতে না পেরে এখন তারা চাপ দেওয়ার অদ্ভুত এক কৌশল নিয়েছেন।”
যেসব প্রতিবেদন তুলে ফেলার জন্য জেলায় জেলায় মামলা করার ‘হুমকি’ দেওয়া হচ্ছে, সেসব প্রকাশিত হয়েছিল ব্যবসায়ী ও সাবেক এমপি ডা. এইচ বি এম ইকবাল এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন মামলায় আদালতের আদেশ নিয়ে।
এর মধ্যে ২০১০ সালে একটি হত্যা মামলা থেকে ডা. ইকবালের খালাসের রায় নিয়ে যেমন প্রতিবেদন আছে, তেমনি দুদকের মামলায় ২০১৭ সালে তার স্ত্রী সন্তানদের হাই কোর্টে আপিল করার অনুমতি পাওয়ার খবরও আছে।
তৌফিক খালিদী বলেন, “এর বাইরেও ২০০৭ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন তারিখ উল্লেখ করে বলা হচ্ছে, সেসব তারিখে তাকে বা তার পরিবারকে নিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’। কিন্তু কোনো খবরের কোনো নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে কোনো আপত্তির কথা তারা বলছেন না।”
এর মধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিনিয়োগের ঘোষণা আসার খবর প্রকাশের পর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
পাঁচ বছর আইনি লড়াই চালানোর মধ্যে ‘প্রভাবশালী একটি মহলের’ চাপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অভিযোগ করেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মামলাটি প্রত্যাহার করেছিল দুদক।
দ্য ডেইলি স্টারের উপদেষ্টা সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, “তৌফিক খালিদী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে যে অবস্থান থেকে দায়িত্ব নিয়েছেন, সেখান থেকে প্রতিকূলতার বহু ধাপ পেরিয়ে একটি সফল জায়গায় সে নিয়ে এসেছে। সেটা অবশ্যই তার কৃতিত্ব, এজন্য তাকে স্মরণ করতেই হবে।
“বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অপ্রত্যাশিত, অযথাই একটি হয়রানির মুখে তাকে পড়তে হয়েছিল এবং এই হয়রানির সময় তিনি অনেককেই তার পাশে পাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তার দৃঢ়তা ও একাগ্রতার মাধ্যমের সেই বাধা কাটিয়েছেন।”
‘মুক্ত সাংবাদিকতায় মালিকরাই বাধা’
মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সংবাদমাধ্যমের ব্যবহার, বার্তাকক্ষের ওপর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রভাবের বিরুদ্ধে এবং সরকারের বিজ্ঞাপন নীতির কড়া সমালোচক ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতার চর্চার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ‘মালিকদেরই’ মূল সমস্যা মনে করতেন তিনি। তিনি বলতেন, দেশে যে ধরনের ব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যমের মালিকানায় রয়েছেন, সে বিষয়টিই মুক্ত গণমাধ্যমের পথে বাধা তৈরি করছে।
২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফৈার ডটকমের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছিলেন, তার দেখায়, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আসলে কী, এই স্বাধীনতা কার-এ বিষয়গুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মালিকানা ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের দুটি দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে নিজেদের চেষ্টার কথা বলেন।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে অবস্থান বিশদ করতে গিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদক বলেন, সাংবাদিকদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ‘ফোন’ আসে, তিনি নিজেও তা পান।
“সরকার বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন-সেটাই স্বাভাবিক। এছাড়া আরও কেউ কেউ থাকে, যারা হস্তক্ষেপ করতে চান। তাদের চেষ্টা তাদের করতে দিন। এই দেশে তো কোনো কিছুই নিখুঁত নয়। কীভাবে ট্রাফিক সমস্যা সামলানো যায়, তার সমাধান আমরা এখনও বের করতে পারিনি।
“আমার বক্তব্য হল, সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাজটা আমাদের করতে হবে। রাষ্ট্রের সেই ‘অন্য ব্যক্তিদের’ কীভাবে সামলানো যায়, তা আমাদের শিখতে হবে, নিজেদের সেভাবে তৈরি করতে হবে।”
কেন বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম তা পারছে না? এই প্রশ্নের উত্তরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ‘মালিকানার সমস্যার’ কথা বলেছিলেন।
“উত্তরটা খুবই সোজা। মালিকানা। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সব আলোচনাতেই আমি এ কথাটা বলি, তা সেটা দেশে হোক, বা বিশ্বের অন্য যে কোনো স্থানে।”
এই পরিস্থিতির জন্য দেশের রাজনীতিবিদদেরও দায়ী করেছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক।
তিনি বলেছিলেন, সাংবাদিকরা যেমন পাঠক, দর্শক ও শ্রোতাদের কাছে দায়বদ্ধ, তেমনি রাজনীতিবিদদেরও জনগণের কাছে জবাবদিহি করার কথা। সংবাদ পেশাজীবীরা যখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চর্চা করেন, তারা জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করেন।
“তারাই (রাজনীতিবিদ) আমাদের নেতা। কিন্তু আমরা যখন জনগণের হয়ে কোনো প্রশ্ন করি, তার উত্তর তাদের দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের অপরিবর্তনীয় সমর্থনের কথা সবারই জানা।”
তৌফিক খালিদী বলেন, “রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া গণমাধ্যমের কাজ নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা বদলের কোনো প্রক্রিয়ায় কোনো সংবাদমাধ্যমের জড়িয়ে পড়া আমরা সমর্থন করি না। রাজনীতির সংবাদ আমরা পরিবেশন করি, বিশ্লেষণ বা মন্তব্যও তুলে আনি, কিন্তু সরাসরি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া আমাদের কাজ নয়।
“কেউ যখন ‘তৃতীয় শক্তির’ কথা বলে-আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে, তারা তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তি নিয়েই কথা বলছেন। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে তৃতীয় কোনো শক্তিকে আমরা কখনো সমর্থন করিনি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সুরক্ষার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। আর গণমাধ্যমকেও তা সমর্থন করার মতো অবস্থানে থাকতে হবে। কারণ এতে আমাদেরও স্বার্থ জড়িত। সঠিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়া মুক্ত ও কার্যকর গণমাধ্যম টিকে থাকতে পারে না।”
অন্য সব ক্ষেত্রের মতো সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
ওই সময়ে ঢাকায় ঘুরে যাওয়া বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের একটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার কথা জানিয়ে তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মতো দেশের আরও পরিপক্ক ও স্পর্শকাতর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন।
“আমি জানি, সংবাদ পেশাজীবীদের মান নিয়ে আপনাদের অনেকের অভিযোগ রয়েছে। যে স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তি প্রকাশ্যে এই সমালোচনা মানতে রাজি আছেন, আমি তাদের একজন। আমি স্বীকার করি, গঠন নিয়ে যখন কথা হয়, তখন কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করতে কিছু ক্ষেত্রে আমরাও ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু তথ্য পুরোপুরি ভিন্ন বিষয়।
“যখন তথ্যের সত্যতার প্রশ্ন আসে, সেখানে আপসের কোনো সুযোগ নেই। তথ্যের সত্যতা ও সাংবাদিকতায় নৈতিকতার মান নিশ্চিত করার জন্য সম্পাদকীয় নজরদারিতে আমরা বড় পরিসরে বিনিয়োগ করে যাচ্ছি।”
তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “যখন আমরা পক্ষপাতহীনতা ও ভারসাম্যের কথা বলি, আমরা সেটিই বোঝাই। যখন আমরা সবাইকে সংবাদ সূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বলি, তখন আমরা নিজেরাও তার চর্চা করি।”
“আমরা যখন প্রতিশ্রুতি দেই যে সংবাদকে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মেলাব না, আমরা সে কথা রাখি।...সমস্যা হল, সেজন্য আয়ের অংক থেকে বড় একটি অংশ আমাদের হারাতে হয়।”
বার্তাকক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে যে বিভেদরেখা তা তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মেনে চলার কথা বলেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক এহসানুল হক বাবু।
বর্তমানে আগামীর সময়ের এই নির্বাহী সম্পাদক বলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দিক থেকে আমরা কখনো মালিকসুলভ আচরণ দেখিনি। সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতার নীতিতে চলবে, মালিকানা মালিকানার নীতিতে-এটাকে সব সময় আলাদা রাখতেন।
তিনি আরও বলেন, “পলিসি হিসেবে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সাংবাদিকতা করতে বলতেন তিনি; একটা কথাই বলতেন সংবাদের ক্ষেত্রে আমাদের নির্মোহ থাকতে হবে। কারণ, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা যেটা, সেখানে মালিকপক্ষের চাপটা সহ্য করে আমাদের সাংবাদিকতা করতে হয়। তৌফিক ইমরোজ খালিদী এর বিরুদ্ধে ছিলেন।
“সে কারণে অনেক বড় বড় প্রজেক্টের প্রস্তাব তার সামনে ছিল, তিনি গিয়েও ফিরে এসেছেন, মালিকের সঙ্গে তার মতবিরোধ দেখা দিয়েছে দেখে।”
অগ্রভাগে শিশুরা, ভরসায় তারুণ্য
তারুণ্যে ভরসা রেখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নতুন নেতৃত্ব আনার পরিকল্পনার কথা দুবছর আগে বলেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
আর শিশুদের অগ্রভাগে রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা সবসময় বলতেন তিনি; তার হাত ধরে চালু হয়েছিল বাংলাদেশে শিশু সাংবাদিকতার প্রথম ওয়েবসাইট ‘হ্যালো’।
বয়স্কদের লড়াইটা যেন এগিয়ে নিয়ে যায়, সেই উৎসাহ তৌফিক খালিদী দিতেন শিশু-কিশোরদের। তিনি বহু সময় বলেছেন, অনেক ক্ষেত্রে ‘বড়দের চেয়ে ভালো কাজ করছে’ হ্যালোর শিশু সাংবাদিকরা।
২০১৩ সালের ৩১ মার্চ দেশে প্রথমবারের মত শিশু সাংবাদিকতার ওয়েবসাইট ‘হ্যালো’ চালু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এই যাত্রায় সঙ্গী হিসেবে রয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফ।
হ্যালোর জন্য সংবাদ সংগ্রহ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সব কাজেই যুক্ত রয়েছে শিশু ও কিশোর সাংবাদিকরা। তাদের সহযোগিতা ও নিয়মিত পরিচর্যা করেন একদল দক্ষ সম্পাদক।
সারাদেশে বিপুল সংখ্যক কর্মশালার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় হাজারো শিশুকে। সহজ ভাষায় শিশুরা যাতে সাংবাদিকতার খুঁটিনাটি শিখতে পারে, সেজন্য হ্যালো প্রকাশ করেছে ‘সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ’।
২০২২ সালের ৩১ মে হ্যালো ডট বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নতুন ওয়েবসাইট উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশু সাংবাদিকদের তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, বড়রা তাদের মতো করে চেষ্টা করে যাচ্ছেন; অনিয়ম-অবিচারের মুখোশ উন্মোচনে সৎ সাংবাদিকতার যে লড়াই চলছে, তাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ’নির্ভীক ও উদ্যমী’ শিশু সাংবাদিকদেরও প্রস্তুতি নিতে হবে।
শিশুরা অনেক সময় বড়দের চেয়েও ‘ভালো কাজ করে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাদের থেকে ভালো কীভাবে… ওরা আমাদের চাইতে অনেক বেশি আন্তরিক, নির্ভীক, ভয়টা ঢোকে না।
“একটা সময় পর্যন্ত মানুষ ভয় পায় না। মানুষ যখন বেশি বুঝতে শেখে, তখন আস্তে আস্তে ভয় পাওয়া শুরু করে। ভয়ের জ্ঞানটা থাকে না আগে অনেক সময়, বোধটা থাকে না। সেটাও একটা ভালো দিক এক অর্থে। যে নির্ভীক থাকে।”
সাংবাদিকতার পাশাপাশি নৈতিকতার শিক্ষাও হ্যালোর মাধ্যমে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে তুলে ধরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছিলেন, “সমাজে সর্বত্র যে অবক্ষয় হয়েছে, অসম্ভব অবক্ষয় হয়েছে, সেটা রাজনীতির ক্ষেত্রে… রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়েছে, সমাজে হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারে হয়েছে।
“এই বিরুদ্ধ সময়ে নীতি-নৈতিকতা মেনে, সাংবাদিকতার ব্যাকরণ মেনে কাজগুলো শেখার চেষ্টা করা, কাজগুলো করা, এটা জটিল কাজ, একটা জটিল বিষয়। তোমরা অনেকে করো, অনেক উৎসাহ নিয়ে করো…।”
গত নয় বছর খবর প্রকাশের মাধ্যমে শিশু সাংবাদিকরা অনেক পরিবর্তনেও যে ভূমিকা রেখেছে, সে কথা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক।
তিনি বলেন, ”তোমরা অনেক ভালো কাজ করেছ। এবং আসলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি তোমাদের হিংসে করি। আমাদের কথা অনেক সময় কেউ শোনে না। আমি দেখেছি, হ্যালোতে লেখা ছাপা হয়েছে, কাজ হয়ে গেছে। মন্ত্রী ঠিকই সেই কাজটা করেছেন।
“অন্যায়-অবিচার চলেছে কোনো একটা জায়গায়, হ্যালোতে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, খুব দ্রুত কাজ হয়েছে। সেই অন্যায়কারীরা পরাজিত হয়েছে।”
হ্যালোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সাবেক শিশু সাংবাদিকরা পরবর্তী জীবনে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে তুলে ধরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছিলেন, “আমরা দেখেছি, আমাদের যারা শিশু সাংবাদিক, তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে, তারা ভালো করেছে। এই যে, জ্ঞানটা-কোনটা খবর, কোনটা খবর না, কোনটা সত্য, কোনটা সত্য না, কোনটা সঠিক তথ্য, কোনটি সঠিক নয়-এই জ্ঞানটা এই সমাজে বেশি লোকের নেই।”
শিশুদের জন্য শুভকামনা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, “শৈশবের চেয়ে ভালো কিছু হয় না। শিশুর মত সরল, শিশুর মত আন্তরিক, শিশুর মত কর্মক্ষম, শিশুর মত প্রাণচঞ্চল এবং শিশুর মত উদ্যম সবার থাকে না। এই উদ্যমটা যেন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকে সবার।”
শিশুদের এভাবে এগিয়ে রাখার পাশাপাশি মূল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে পরিচালনার দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের হাতে অর্পণের ভাবনার কথা প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের ১৮ বছর পূর্তির দিনে।
ওইদিন সাবেক বর্তমান-সহকর্মীদের মিলনমেলায় তিনি বলেছিলেন, “আমাদের ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, টানা ১০ বছর বাংলাদেশের সবচেয়ে পঠিত সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আমি ছিলাম। তখন পর্যন্ত আমরা কোনো রকম বিতর্ক ছাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদমাধ্যম ছিলাম।
“আমি বলেছিলাম, আমার সরে দাঁড়ানো উচিত। গত আট বছরে সেই পরিবেশ আমরা তৈরি করতে পারিনি, আমি পারিনি।”
তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, “তরুণদের হাতে আমি দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলাম। আমি আশা করব, খুব দ্রুত তরুণ কেউ দায়িত্ব নেবে। আমাদের অনেক সহকর্মী আছেন, যারা অত্যন্ত যোগ্য, অত্যন্ত দক্ষ, কর্মঠ।
“তারা জীবন উৎসর্গ করেছেন ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে। আর তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।… আমি বিশ্বাস করি, এখন যারা তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, তারা আগামী ১৮ বছর এটা পরিচালনা করবে। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।”
‘কন্ট্রোল নয়, তবে রেগুলেশন লাগবে’
বাংলাদেশের ইন্টারনেট সংবাদমাধ্যম এবং টেলিভিশনের ‘অপরিকল্পিত ও আনরেগুলেটেড’ প্রসারের কঠোর সমালোচক ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সরকারি নীতিমালার মাধ্যমে এই দুটি মাধ্যমকে রেগুলেশনের কথা সব সময় বলতেন তিনি।
২০১৫ সালের জুনে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেখতে একই রকম নামের অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রোপাগান্ডামূলক খবর ঠেকানোর বিষয়ে এক প্রশ্নে রেগুলেশনের কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন তিনি।
তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, “রেগুলেশনটা অত্যন্ত জরুরি। আপনার এই এই জিনিসগুলোকে, এই ধরনের এই প্রবণতাকে কিন্তু আমাদের ঠেকাতে হবে।”
রেগুলেশন মানে যে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, সেটা স্পষ্ট করে তিনি বলেছিলেন, “রাষ্ট্র এক্ষেত্রে এই দায়িত্বটি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র তার যে কাজ, এই গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার কাজ, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের কাজ কিন্তু রাষ্ট্রের নয়। রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে গণমাধ্যমের জন্য একটা ফ্যাসিলিটেটিং এনভায়রনমেন্ট তৈরি করা।
“সেই কাজটি করতে গেলে সবার জন্য যেন সমান ক্ষেত্র তৈরি হয়, সেটি নিশ্চিত করা। সেই কাজটি করা হয়নি। কারণ যেসব বিচার-বিবেচনায় আপনি কাউকে কাউকে টেলিভিশন বা রেডিও চ্যানেলের প্রতিষ্ঠার বা পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছেন, সেগুলো ঠিক ছিল না।”
তৌফিক খালিদীর মতো সাংবাদিক ও অংশীজনদের জোর দাবির প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে ‘জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা’ তৎকালীন সরকার করেছিল। ওই নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেলেও সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন না খালিদী।
এর আগে ২০১৪ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা’। ওই দুই নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ার মধ্যে অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নতুন করে করার কথা বলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার।
টেলিভিশনের অপরিকল্পিত বিস্তৃতির কথা তুলে ধরে খালিদী বলেছিলেন, “টেলিভিশনের ক্ষেত্রে অনেক বিস্তৃতি হয়েছে। আমি বলব যে, অতিরিক্ত বিস্তৃতি হয়েছে এবং অপরিকল্পিত বিস্তৃতি হয়েছে। যেটা অনেকে খুব ভালো মনে করেন; অনেকে মনে করেন যে এটি আরেকটু ধীরে হলে ভালো হতো। আরেকটু রেগুলেটেড—আমি নিয়ন্ত্রণ অর্থে বলছি না, রেগুলেশন মানে আপনি জানেন যে কন্ট্রোল এবং রেগুলেশনের মধ্যে পার্থক্য আছে।
“এবং কিছু নিয়মকানুন মেনে হলে ভালো হতো। যেমন ধরুন, এই যে এই সংবাদমাধ্যম পরিচালনার যে কাজটি, এটি কিন্তু একটি পাবলিক সার্ভিস। মানে, আপনি জনসেবামূলক একটি কাজ করছেন। এই কাজটি সবাই করতে পারবেন কি পারবেন না, সে বিষয়টি চিন্তা না করেই বাংলাদেশে অনেকগুলো টেলিভিশন চ্যানেলকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।”
সব টেলিভিশন চ্যানেলে নিউজ প্রকাশের সমালোচনাও বিভিন্ন সময়ে করেছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। এ কারণে টেলিভিশন সংবাদের ক্ষেত্রে জগাখিচুড়ি অবস্থা দাঁড়ানোর কথা ২০১৫ সালের জুনে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি।
তিনি বলেছিলেন, “এখন কোন দেশে প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ করে? আপনি এই যে নিউজ গ্যাদারিং অপারেশন যেটা, সংবাদ সংগ্রহের যে ব্যবস্থাটা, এটি একটি ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত কঠিন একটি প্রক্রিয়া। সবাই সেটি চালাতে পারবেন এমন কোনো কারণ নেই। তারপরও সবাই এই কাজটি করেন।
“২৫-৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল সবাই নিউজ করছেন, সবাই সবকিছু কাভার করছেন। এতে একটা জগাখিচুড়ি ব্যাপার দাঁড়িয়ে গেছে। অনেকে বলবেন প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কিন্তু আমি বলব যে প্রতিযোগিতার চেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে যে, এতে মানের একটা অবনতি ঘটেছে।”
এত বড় কর্মযজ্ঞের বিপরীতে এতগুলো দক্ষ কর্মী, দক্ষ ব্যবস্থাপক, দক্ষ সংবাদ প্রযোজক, কিংবা দক্ষ সম্পাদক তৈরি না হওয়ার কথা তুলে ধরে তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, “হঠাৎ করে অনেকগুলো চ্যানেলকে একসাথে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এবং কোনোরকম ক্রাইটেরিয়া—মানে কোনোরকম নীতিমালা না মেনে দেওয়া হয়েছে। এতে এক ধরনের আমি বলব যে, বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে।”
২০১৫ সালের ওই সময়ে দেশে পাঁচ কোটির বেশি ইন্টারনেট সংযোগ থাকার কথা তুলে ধরে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রসার ঘটাকে স্বাভাবিক হিসেবে বর্ণনা করে তার বিস্তারটা ‘বিশৃঙ্খলার’ সঙ্গে ঘটার কথা বলেছিলেন তিনি।
১০-২০ ডলার দিয়ে ডোমেইন নেইম কিনে ইন্টারনেট সংবাদপত্র চালুর সুযোগ থাকলেও তার বিপরীতে নিউজ অপারেশন চালানোর মতো সামর্থ্য সেখানে না থাকার কথাও বলেছিলেন তৌফিক খালিদী।
“ওইসব ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর, সংবাদপত্রগুলোর, তাদের সামর্থ্য আছে কি-না, দেশব্যাপী কিংবা অন্তত আঞ্চলিক পর্যায়ে হলেও এই যে নিউজ গ্যাদারিং অপারেশন চালানোর ক্ষমতা তাদের আছে কি-না; একটা পরিপূর্ণ পেশাদার দল নিয়ে পরিপূর্ণ একটি বার্তাকক্ষ পরিচালনা করার সামর্থ্য আছে কি-না।”
এগুলো ‘ব্যয়বহুল কাজ শুধুই নয়, এগুলোর জন্য অনেক উঁচু পর্যায়ের পেশাদারিত্বের প্রয়োজন’ থাকার কথা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক বলেছিলেন, “কাজেই এই জিনিসগুলো সব চলে যাচ্ছে অপেশাদারদের হাতে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসৎ ব্যক্তিদের হাতে, অসাধু ব্যক্তিদের হাতে। সেইখানে সরকার বা রাষ্ট্র কিন্তু চুপ করে আছে। সরকারের সেখানে একটা দায়িত্ব আছে।”
ওই সময়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে এক প্রশ্নে সরকারি চাপের চেয়ে ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ এবং মালিকানার সমস্যাকে বড় করে দেখান তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
‘সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বাংলাদেশে কেমন বর্তমানে’, এমন প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা আছে। নির্ভর করছে এই স্বাধীনতা আপনি কী করে এক্সারসাইজ করবেন, ব্যবহার করবেন।
“আমি মনে করি বাংলাদেশে যে সমস্যাটা আছে, সেটি হচ্ছে সেলফ সেন্সরশিপ। মানে আপনি নিজে নিজে অকারণে সেন্সরশিপ করছেন। কেন করছেন? কারণ আপনার কাপবোর্ডে স্কেলিটন আছে অনেকগুলো। এখন আপনি যদি আপনার আলমারিতে কঙ্কাল রেখে জোর গলায় কথা বলতে চান, হবে না। সমস্যাটা ওখানে।”
মালিকানার ক্ষেত্রে সমস্যার থাকার কথা তুলে ধরে তৌফিক খালিদী বলেন, “এরা বেশিরভাগই ব্যবসা করেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে তারা ঋণ নিয়েছেন, ঋণ শোধ করেন না; একে ঠকিয়েছেন, ওকে ঠকিয়েছেন। মূলত রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে লাইসেন্সগুলো পেয়েছেন, তাদেরকে চাঁদা দেন।
“আপনি ভালো লোকজন খুব একটা পাবেন না। মালিকানার সমস্যাটা আছে। দুর্বৃত্ত প্রকৃতির লোক বাংলাদেশের গণমাধ্যমের মালিক হয়েছে। যে কারণে সমস্যাটা দেখা দিয়েছে।”
বিরুদ্ধে যেতে পারে এমন খবর ঠেকানোর চেষ্টা যে কোনো সরকারের তরফে করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, “সরকার ঠেকানোর চেষ্টা করবে, আমি যেন সরকারবিরোধী কোনো কাজ না করি। আমি যেন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এই মুহূর্তে যারা আছেন, তাদেরকে বিপাকে ফেলে এমন কোনো খবর যেন না দেই। সে তো সরকারের কাজ।
“তাদের পাবলিক রিলেশনস এক্সিকিউটিভরা সে কাজটি করবে, আমাকে ঠেকানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু আমার কাজতো সেটি নয়। আমার কাজ হচ্ছে তার কথা আমি শুনব কি শুনব না, সেটা আমার ওপর নির্ভর করবে। আমি কখন বাধ্য হই? আমাকে তো কেউ বাধ্য করতে পারে না! আমাকে কেউই বাধ্য করতে পারবে না, আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি যে বাধ্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি তখনই বাধ্য হব যখন আমার সমস্যা থাকবে।”
সাংবাদিকতায় যেভাবে এলেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার সময়ে ‘শখের বশে’ সাংবাদিকতায় ঢুকে শেষমেশ এ পেশাতে আটকে যাওয়ার কথা ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
সাংবাদিকতায় না পড়েও পেশাগত জীবনে সফল হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে করা এক প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, সাংবাদিকতায় ঢোকা কোনো পরিকল্পিত বিষয় ছিল না তার কাছে। শখের বশে শুরু করে আরও বেরোনো হয়নি।
“যেটা হয়, সবাই মনে করেন যে একধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসলে লোকজন সিভিল সার্ভিসে যায় বা অন্যকিছু করে। তো আমারও হয়তো সেরকমই একটা কিছু হয়ে যেত। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে যে, সাংবাদিকতাটা এমন একটা বিষয়, আমি শখের বশে শুরু করেছিলাম কোনো একটি সময়ে। এবং তারপরে সেখান থেকে আর বেরোনো হয়নি।”
১৯৮৯ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতায় আসা তৌফিক ইমরোজ খালিদী এই পেশায় ছিলেন জীবনের শেষ অবধি।
সানডে এক্সপ্রেসে প্রায় দুই বছরের মতো কাজ করে তিনি ১৯৯১ সালে এস এম আলী সম্পাদিত ডেইলি স্টার পত্রিকায় যোগ দেন কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে।
সেখানে ১৯৯৩ সালের মার্চ পর্যন্ত কাজের পর একই বছরের অক্টোবরে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
ওই পদে ১৯৯৫ সালের মার্চ পর্যন্ত কাজের সময়ে কূটনীতি, রাজনীতি, জাতীয় সংসদ কাভার করার পাশাপাশি তেল-গ্যাসের নেগোসিয়েশন, অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও বাণিজ্য চুক্তিতে দুর্নীতির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন তৌফিক খালিদী।
পঁচানব্বইয়ের মার্চে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বের পাশাপাশি উপ সম্পাদকীয় লেখা শুরু করেন তিনি। সেখানে কাজ করেন ১৯৯৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
সাংবাদিকতায় পাঁচ মাস বিরতি দিয়ে নদী ভাঙন নিয়ে কাজ করা একটি নেতৃস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় আর্থ-সামাজিক ও যোগাযোগ পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হন তৌফিক খালিদী।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিস ভিত্তিক ইউরোপ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসেবে ‘ইউরোপ’নামের ত্রৈমাসিক জার্নালের মাধ্যমে আবার সাংবাদিকতায় ফেরেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সেখানে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন।
সাতানব্বইয়ের অগাস্ট থেকে ডেইলি স্টারের সম্পাদনা বিভাগে বিভিন্ন দায়িত্ব সামলানোর পর ২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেখানে তিনি সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করতেন।
এরপর ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর পুরোপুরি ডিজিটাল মাধ্যম হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পথচলার শুরু থেকে আমৃত্যু প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের প্রেক্ষাপটে আশির দশকের শেষে ছাত্রাবস্থাতেই সাংবাদিকতা শুরু করার কথা বলেছিলেন তিনি।
“কারণ আমাদের সময়ে চার বছর আমরা নষ্ট করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক্সাক্টলি চার বছর। মানে আমি ২০ বছর বয়সে অনার্স পাশ করতাম, ২১ বছর বয়সে এমএ পাশ করতাম। সেটা আমি পাশ করেছি, সার্টিফিকেট হাতে পেয়েছি বা রেজাল্ট দিয়েছে ২৫ বছর বয়সে। কাজেই আমরা সময় নষ্ট করেছি।”
কাজ শুরু করার কারণে ‘এক অর্থে নষ্ট হয়নি’ বলে মন্তব্য করে তৌফিক খালিদী বলেছিলেন, “ক্লাসের বা শ্রেণিকক্ষের বা পাঠ্যক্রমের যে পড়াশোনা, সেটি বাদ দিয়ে অন্য পড়াশোনার দিকে আমার একটু বেশি ঝোঁক ছিল সবসময়ই। সময়টা কাটিয়েছি ক্লাসরুমের বাইরে অন্যত্র। যে কারণে আমার পছন্দ-অপছন্দ বা ইচ্ছেগুলো অন্যরকম ছিল। সেটা হয়তো পরের দিকে কাজে দিয়েছে।”
একবার সাংবাদিকতায় ঢুকে গেলে, সেখান থেকে বেরোনোটা ‘খুব কঠিন বিষয়’ বলে মনে হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যে কারণে আমি আর কোনো ব্যবসা শিখিনি। ওই একজন কবির ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় যে, 'ছলনা জানি না বলে আর কোনো ব্যবসা শিখিনি'।
“তো আমি আর কোনো ব্যবসা আসলে জানি না। আর কোনো ভোকেশন, আর কোনো ট্রেড আমি জানি না সাংবাদিকতা ছাড়া।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বার্তাকক্ষের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর অভিজ্ঞতার কথাও বলেছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, “এখন যেহেতু এই কোম্পানির সঙ্গে জড়িত, এখানে আমার অন্য একটি ভূমিকাও আছে—ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। আমার কিছু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেগুলো অনেক সময় অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত, বিব্রতকর সিদ্ধান্ত, সেগুলোও আমার নিতে হয়।
“তো হ্যাঁ, আমি দুটো হ্যাট পরি এইখানে। একটি তো সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন করি, আরেকটি হচ্ছে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করি। সব মিলিয়ে ভালোই চলছে। …একঝাঁক তরুণ সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করে আমার ভালোই লাগে।”
