০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: ‘এ যুগের সাংবাদিকতার এক অনন্যসাধারণ চরিত্র’

“তার আত্মবিশ্বাসটাকে অনেকে অহংকার হিসেবে দেখত। যারা আসলেই জানে যে, তারা উনার চেয়ে ভালো না, তারা আসলে তাকে ঈর্ষা করত।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: ‘এ যুগের সাংবাদিকতার এক অনন্যসাধারণ চরিত্র’

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Oct 2026, 01:36 AM

Updated : 04 Oct 2026, 01:36 AM

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতি ‘অবিচল’ অবস্থান এবং নিজের কাজে ‘সেরা’ হওয়ার মনোভাব তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে বলে মনে করছেন দেশের নেতৃস্থানীয় সাংবাদিক এবং তার পুরোনো সহকর্মীরা।

বাংলাদেশে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের পথিকৃৎ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত এই প্রধান সম্পাদককে তারা স্মরণ করছেন অতীত আর বর্তমানের বিপ্রতীপ দর্পণে। পেশাগত জীবনের ‘মধ্যগগনে’ তৌফিক খালিদীর এই চলে যাওয়ায় হাহাকার ঝরেছে তাদের কারও কারও কথায়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রায় চার দশকের দৃপ্ত পথচলার কথা স্মরণ করার পাশাপাশি দৃঢ়চেতা মনোভাব নিয়ে তার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা মোকাবেলার কথাও মনে পড়ছে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেনের।

তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এইটুকু সান্ত্বনা যে, এই প্রতিকূলতাও তৌফিক নীতিনিষ্ঠ থেকে দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করেছেন—কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা না করে, কোনো আপসকামিতার পথে না গিয়ে।

“এই সব মিলিয়ে, তৌফিক আমাদের এই যুগের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এক অনন্যসাধারণ চরিত্র। মানুষ হিসেবে নিশ্চয় কোনো দুর্বলতা সবারই থাকে, সফলতা-দুর্বলতা তারও ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে আমাদের বন্ধুমহলে তৌফিক এক অনন্যসাধারণ পেশাজীবী, অনন্যসাধারণ সম্পাদক।”

ব্যক্তিগত সফরে লন্ডন থাকা অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সেইন্ট বার্থোলমিউ’ হাসপাতালে নেওয়ার পর শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস (বাংলা), ডেইলি স্টার ও ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি।

২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেখানে তিনি সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করতেন।

বিবিসিতে তিনি বড় আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিতে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি ও উপস্থাপনা করতেন; ফিচার এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সাময়িকীও করতেন। পাশাপাশি বহুল আলোচিত 'ডিবেট' অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করতেন।

৫৯ বছর বয়সে তৌফিক খালিদীর ‘হঠাৎ বিদায়ে’ গভীরভাবে মর্মাহত হওয়ার কথা তুলে ধরে মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “এটিকে অকালমৃত্যুই বলব। বলা যায়, পেশাগত জীবনের সূর্য যখন মধ্যগগনে, মানে তার কাজের সময়, এ সময় হঠাৎ চলে গেলেন। অত্যন্ত দুঃখজনক।”

একই পেশায় থাকার সুবাদে প্রায় ৩০ বছর ধরে তৌফিক খালিদীর সঙ্গে পরিচয় থাকার কথা তুলে ধরে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “তার জীবনের মূল কাজ বা কৃতিত্ব বা অর্জন, এ সম্পর্কে তো তার অনুরাগী বা সমালোচক সবাই একমত যে, তিনি এ দেশে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের পথিকৃৎ। মানে, একজন মূল নির্মাতা।

“আগে তিনি ডেইলি স্টার বা বিবিসিতে চাকরি করেছেন, পেশাগতভাবে সাংবাদিকতার কাজ করেছেন। কিন্তু পরে জীবনের বড় সময়টি তিনি হচ্ছেন এই নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক, এই নতুন মিডিয়ার নির্মাতা।”

প্রতিষ্ঠান হিসাবে ‘বিডিনিউজ’-এর শুরুটা তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হাত ধরে শুরু না হলেও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম হিসাবে এর ‘পুনর্নির্মাণ’ তার হাত ধরে হওয়ার কথা স্মরণ করেন মোজাম্মেল হোসেন।

তিনি বলেন, “বিডিনিউজ শুরু করেছিল আমাদেরই আরেক বন্ধু, আলমগীর হোসেন। কিন্তু তিনি বেশিদূর এগোতে পারেননি। এরপরে তৌফিকের হাতে এসে এটি পুনর্নির্মিত হল এবং এর খোলনলচে বদলে গেল, এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হল, পেশাগত উৎকর্ষের ভিত্তি তৈরি হল, কর্মী তৈরি হল। এর সম্ভাবনা, সেটি মানুষ বুঝতে পারল।”

এরপর বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই বহু দশকের ছাপা সংবাদপত্রের সমান্তরালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘খুব অল্প সময়ে দাঁড়িয়ে’ যাওয়ার কথা বলেন মোজাম্মেল হোসেন।

“এই মাধ্যম আমরা জানি এটা পাঠ্য, এটা শ্রাব্য, এটা দৃশ্য এবং সেই সঙ্গে পাঠক-গ্রাহকরা এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, ইন্টারেক্ট করতে পারে। এই বিষয়টাকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে আমাদের তৌফিক এটি নির্মাণ করতে পেরেছে।”

Image

মোজাম্মেল হোসেন।

‘নিরপেক্ষ নই, বস্তুনিষ্ঠ’

“বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা আমরা করতে পেরেছি। চাইলেই এখন কেউ গল্প-গুজবভিত্তিক প্রতিবেদন করতে পারে না,” বলতেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার সূচনা হয়েছে তার হাত ধরে। কেবল সূত্রের নাম উল্লেখ করেই লেখা হবে সংবাদ—বাংলাদেশে সাংবাদিকতার এই শুদ্ধচর্চা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাকেই অগ্রণী মানেন সহকর্মীরা।

তথ্যের ‘নির্ভেজাল’ উপস্থাপনের মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চর্চাকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পেশাগত জীবনের ‘বিশেষ দিক’ হিসাবে বর্ণনা করেন মোজাম্মেল হোসেন।

তিনি বলেন, “আমি তার সম্পর্কে একটা বিশেষ দিক বলতে চাই, লোকে বলে না যে, সংবাদমাধ্যমের হওয়া উচিত নিরপেক্ষ। আমি নিজেও অনেক সময় বলি যে নিরপেক্ষ না, প্রকৃত শব্দটা হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠ, অবজেক্টিভ।

“মানে খবর হবে সত্য, সঠিক, নির্ভেজাল। খবরের তথ্যে কোনো ভেজাল দেওয়া যাবে না। এই যে সাংবাদিকতার মূল নীতি—এর প্রতি একেবারে মেরুদণ্ড সোজা করে সারাজীবন দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের ব্যাকরণটা তিনি ঠিকমত অনুসরণ করতেন, ধরেছিলেন।

“কিন্তু আবার ওই যে নিরপেক্ষ না, তিনি কিন্তু নিজেই বলেছেন যে–আমার কোনো অঙ্গীকার নাই তা নয়; আমার অঙ্গীকার মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং এই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, যত স্বপ্ন, যত চেতনা, যত আদর্শ—তার প্রতি তো আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। সেই হিসেবে আবার নিরপেক্ষ নই।”

মোজাম্মেল হোসেন বিশ্বাস করেন, বস্তুনিষ্ঠ থেকেও নিজের অঙ্গীকারে দৃঢ় থাকা একজন সাংবাদিকের পক্ষে সম্ভব, তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন তেমনই একজন।

“সাংবাদিকের রাজনৈতিক মতামত থাকবে না তা কিন্তু না, সব মানুষেরই থাকবে। কিন্তু সেটি তার সাংবাদিকতার মূল কাজে, অর্থাৎ তথ্যের নির্ভেজাল উপস্থাপন, সে জায়গায় হাত দেওয়া যাবে না। তাহলে তো দুটো কাজই সার্থকভাবে করা হল। এবং এই বিষয়টায় বিভিন্ন সরকারের সময়, বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্যেও তৌফিক দেখিয়েছেন। এটি আমাদের কাছে একটি বড় পাওয়া।

“এবং এই সময় চলে যাওয়া আমাদের জন্য অনেক দুঃখজনক, অনেক ক্ষতির কারণ, শূন্যতার সৃষ্টি হওয়ার কারণ।”

Image

তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

‘তার কাজের পরিবেশ অব্যাহতভাবে মসৃণ ছিল না’

বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান সম্পাদক হিসাবে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দুই দশক পূর্ণ হয়েছে এ বছরই। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নতুন পথচলার ২০ বছর পূর্তির আয়োজন হওয়ার কথা ছিল ২৩ অক্টোবর। সেই প্রস্তুতির মধ্যেই জীবনমৃত্যুর ভেদরেখা পেরিয়ে গেলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

সম্পাদক হিসাবে তার কাজের পরিবেশ যে ‘অব্যাহতভাবে মসৃণ ছিল না’, তার উদাহরণ টানতে গিয়ে দুদকের করা এক মামলায় তার পাঁচ বছরের আইনি লড়াইয়ের কথা স্মরণ করেন মোজাম্মেল হোসেন।

তৌফিক খালিদী সেই ‘প্রতিকূলতা দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা’ করেছেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এবং এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তার শেষ জীবনের একটি সংগ্রাম, একটি কষ্ট–তা নিয়ে তার প্রতি সমালোচনাও আছে। এবং সেটা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যাপার।

“আমরা এটা জানি, কোনো একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ পাচ্ছেন, এটি ঘোষণা দেওয়ার পর তার ক্ষেত্রে একটা বিপর্যয় ঘটে। এর কিন্তু সব কিছু আমরা জানি না। তবে তিনি কিন্তু এটা মোকাবিলা করেছেন। এবং এই মোকাবিলার ক্ষেত্রে তিনি কোথাও আপস করেন নাই, কাউকে খুশি করতেও চেষ্টা করেন নাই; অর্থাৎ এই জায়গাতেও তিনি খুব নীতিনিষ্ঠ থেকেছেন।”

ওই মামলার প্রেক্ষাপটে ‘শুধু সাংবাদিকতাই তো করেছিলাম!’ শিরোনামে যে লেখা তৌফিক ইমরোজ খালিদী লিখেছিলেন, সেটা একজন সাংবাদিকের রচনা হিসেবে একটা ‘মাস্টারপিস’ হিসাবে বর্ণনা করেন মোজাম্মেল হোসেন। তিনি বলেন, “কারণ সেইখানে তিনি তার নীতিগত আত্মপক্ষ সমর্থন অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন।

“এবং পাঁচ বছরের বেশি সময় পরে, অনেক দুর্ভোগ পোহানোর পরে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু আমরা হয়ত পেছনের সব কথা জানি না, কিন্তু এটুকু তো জানি যে দুদকের মামলা দুদককেতো প্রমাণ করতে হবে, কিন্তু পাঁচ বছর তাকে দুর্ভোগে ফেলা হল, আর মামলা শেষ হয়ে গেল, দুদক সেটি প্রমাণ করতে পারল না।”

দুদকের মামলায় অনেক সময় হয়রানির চরিত্র থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “মানে, ‘তুমি তোমার সম্পত্তির হিসাব দাও, তোমার ব্যাংকের হিসাব দাও, তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকবে, তুমি কী খেয়ে বাঁচবা, কি নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাবা আমরা জানি না, তোমাকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে—এগুলো হচ্ছে এক ধরনের হয়রানি।

“তো এই হয়রানির শেষে যখন এটি নিষ্পত্তি হল না, প্রমাণ হল না, মামলাটা শেষ পর্যন্ত থাকল না, তার তো কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, কোনো সান্ত্বনা নেই।”

Image

সাবির মুস্তাফা

‘আমিই সেরা–এ ছিল তার আত্মবিশ্বাস’

নানা কারণে কারও কারও সঙ্গে সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নানা সময়ে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কথা উঠে এসেছে তার সাবেক সহকর্মীদের কথায়। কেউ কেউ সময়াবর্তে দূরত্ব ঘোচার কথাও বলেছেন।

ডেইলি স্টার, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস এবং বিবিসি বাংলায় তার সহকর্মী সাবির মুস্তাফা বলেছেন, নিজের কাজে সবসময় ‘উচ্চমান রক্ষা’ করতে চাওয়া এবং ‘আমি অধিকাংশের চেয়ে ভালো’, এমন স্বভাবজাত আত্মবিশ্বাস প্রকাশের কারণে সহকর্মীদের অনেকে তাকে ‘অহঙ্কারী’ হিসাবে দেখতেন।

নব্বইয়ের দশকে ডেইলি স্টারে একসঙ্গে কাজ করার সময়ের স্মৃতিচারণ করে বিবিসির বাংলা বিভাগের সাবেক এই প্রধান বলেন, “তৌফিকের সাথে আমি প্রথম কাজ করি ডেইলি স্টারে। তিনি ছিলেন একজন রিপোর্টার এবং আমি ছিলাম অ্যাসিস্টেন্ট এডিটর। আমি তাকে দেখেছিলাম একজন ডেডিকেটেড রিপোর্টার হিসেবে। মানে রিপোর্টার যেমন হওয়া উচিত আর কি।

“খবর বের করার, সোর্স ডেভেলাপ করার এবং সোর্স মেইনটেইন করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার মধ্যে, যে গুণাবলীগুলো একজন রিপোর্টারের জন্য অ্যাসেনশিয়াল।”

শুরু থেকেই তৌফিক খালিদীর লেখার ধরন ‘খুব ভালো’ ছিল জানিয়ে সাবির মুস্তাফা বলেন, “তিনি ইংরেজিতে খুব ভালো রিপোর্ট লিখতে পারতেন। নিজের সম্পর্কে তার একটা আত্মবিশ্বাস ছিল যে হি ইজ বেটার দ্যান মোস্ট।

“এই আত্মবিশ্বাসটাকে অনেকে অহংকার হিসেবে দেখত। যারা আসলেই জানে যে, তারা উনার চেয়ে ভালো না, তারা আসলে তাকে ঈর্ষা করত। তো এই একটা কথা আমি ফেইসবুকে দেখছি আজকাল যে, ‘উনি নিজেকে একটু বেশি মনে করতেন’। বেশি মনে করতেন কারণ তার অ্যাবিলিটি সম্পর্কে তার আত্মবিশ্বাস ছিল। এবং তার একটা স্ট্যান্ডার্ড ছিল।”

তিন প্রতিষ্ঠানে একইসঙ্গে কাজ করার কথা তুলে ধরে সাবির মুস্তাফা বলেন, “প্রতিটা ক্ষেত্রে আমি দেখেছি যে তিনি কাজের প্রতিটা ক্ষেত্রে হাই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করার চেষ্টা করতেন। ভাষার দিক থেকে, নিউজের স্ট্রাকচারের দিক থেকে, ইনফরমেশনের দিক থেকে, ইনফরমেশনের অ্যাকিউরেসির দিক থেকে… সব দিক থেকে খুবই হাই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতেন।

“ফলে অন্যরা যখন এই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে না, তখন তিনি ন্যাচারালি খুশি হতেন না। তিনি সেই স্ট্যান্ডার্ডটা সবার কাছ থেকেই এক্সপেক্ট করতেন। সেজন্যই অনেকে তাকে মিসরিড করত যে তিনি অহংকারী।”

সাবির মুস্তাফা বলেন, “তিনি অহংকারী নন। তিনি একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতেন, তিনি চাইতেন যে অন্যরা যারা তার কলিগ আছেন, তারাও সবাই সেই স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করুক।”

তৌফিক খালিদীর উচ্চমান রক্ষার এমন মনোভাবের কারণেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর তার হাতে এত সফল হয়েছিল বলে মনে করেন সাবির মুস্তাফা।

তিনি বলেন, “তিনি ওখানে একটা কোয়ালিটি, একটা হাই স্ট্যান্ডার্ড জার্নালিজম ইন্ট্রোডিউস করতে পেরেছেন। ভাষার ব্যবহারের দিক থেকে এবং নিউজের যে অ্যাসেনশিয়াল অ্যাকিউরেসির বিষয়গুলো আছে, সেদিক থেকে তিনি কখনো বিলো স্ট্যান্ডার্ড কাজ এক্সেপ্ট করতেন না।

“যেটা ছিল তার প্লাস পয়েন্ট এবং সে কারণেই অনেকে তাকে একটু খারাপ চোখে দেখত। এসব কারণে অনেকে মনে করত, তিনি অহংকারী, আসলে এটা তো অহংকারের ব্যাপার না এটা স্ট্যান্ডার্ডের ব্যাপার। আপনার নিজের যদি স্ট্যান্ডার্ড না থাকে, আপনার প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড থাকবে কী করে?”

সাবির মুস্তাফা বলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যদি একটা ‘হাই স্ট্যান্ডার্ড জার্নালিজম’ না করতে পারতে ওই সময়, তাহলে এত জনপ্রিয় হত না। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে মানুষ বিশ্বাস করত প্রতিবেদনের মানের কারণে।

“কোয়ালিটি না থাকলে মানুষ আপনাকে ট্রাস্ট করবে না। এটা যে দেশেই হোক, যে ভাষাতেই হোক, আপনাকে কোয়ালিটি আউটপুট দিতেই হবে মানুষের আস্থা পাওয়ার জন্য। এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আন্ডার তৌফিক ডিড দ্যাট।”

তিনি বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে পরে যা কিছু ঝামেলা হয়েছে, সেগুলো হয়েছে অন্য কারণে, এর কোয়ালিটির কারণে না। সেটা হয়েছে পলিটিক্যাল কারণে, আওয়ামী আমলে হয়েছে, পরবর্তীতেও হয়েছে। কিন্তু সেটা ডিফারেন্ট।”

Image

শাকিল আনোয়ার

‘ভেরি কম্পিটেন্ট’

সাংবাদিক হিসাবে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ‘খুবই যোগ্য এবং খুবই আত্মবিশ্বাসী’ একজন হিসেবে দেখার কথা বলেছেন বিবিসি ও ডেইলি স্টারে তার সাবেক সহকর্মী শাকিল আনোয়ার।

সাবেক সহকর্মীর স্মৃতিচারণ করে এ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “হি ওয়াজ আ ভেরি কম্পিটেন্ট জার্নালিস্ট, অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ভেরি কম্পিটেন্ট।

“খুবই কনফিডেন্ট, কনফিডেন্ট। সে যা করত বা যা বুঝত, সে সম্পর্কে তার পুরো কনফিডেন্স আমি দেখেছি।”

শাকিল আনোয়ার ১৯৯৮ সালে বিবিসিতে যাওয়ার দুবছর পর সেখানে যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০৫ সালে বিবিসি ছেড়ে আসার পর ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের দায়িত্ব নেন তিনি।

শাকিল আনোয়ার বলেন, ডেইলি স্টার কাজ করার সময় থেকে চিনলেও তাদের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না।

“কিন্তু এখানে (বিবিসি) আসার পরে হি বিকেম কলিগস, হি বিকেম কাইন্ড অফ ফ্রেন্ড। পারিবারিকভাবে যোগাযোগ ছিল। ওর বাসায় যেতাম, ও আমার বাসায় আসত রেগুলারলি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে ‘খুবই সজ্জন’ মানুষ হিসেবে দেখেছেন শাকিল আনোয়ার। তিনি বলেন, “বন্ধু হিসেবে খুবই ভালো ছিল। মানে বন্ধুদের জন্য যে কোনো কিছু করতে সে প্রস্তুত ছিল, এরকম।”

তবে নিজের কাজের বিষয়ে খুবই ‘কনফিডেন্ট’ থাকায় সকল সহকর্মীদের সঙ্গে তৌফিক ইমরোজ খালিদী একইরকম সম্পর্ক না থাকার বিষয়টিও তিনি স্মরণ করেন।

শাকিল আনোয়ার বলেন, “তার একটা কারণ হচ্ছে যে তার ভেতরে একটা মানে ইয়ে ছিল যে, যেহেতু হি ওয়াজ ভেরি কনফিডেন্ট, কনফিডেন্ট অ্যাবাউট হোয়াট হি ইজ ডুইং। এবং এক ধরনের ওই যে যেটা বলে আরকি, যে ‘অন্য কেউ কিছু জানে না, আমি জানি ভালো। এবং আমি যেটা জানি সেটা সবচেয়ে ভালো।’ সেই কারণে অনেকের সাথে মাঝেমধ্যে ফ্রিকশন হত।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিবিসি ছাড়া নিয়েও সহকর্মীদের মধ্যে জল্পনা থাকার কথা তুলে ধরেন শাকিল আনোয়ার। তিনি বলেন, “এটা নিয়ে আমাদের ভেতরে আলোচনা ছিল যে, কেন সে (বিবিসি ছেড়ে) চলে গেল।

“একটা হতে পারে যে সে দেখছিল, এটা তার জন্য খুবই ছোট জায়গা। হয়ত সে আরো বড় কিছু করতে চেয়েছিল। কারণ বিবিসি বাংলার যে কাজটা ছিল, সেটা খুব বিশাল কিছু না, আমরা বাংলাদেশকে ওইভাবে কাভার করতাম না। অনেক কিছু করতাম। তারপরে সে হয়ত একটা লিডারশিপ চাচ্ছিল। সে নিজেই কিছু করবে, এই তাড়না হয়ত ছিল।”

একমাত্র সন্তানকে ‘মিস’ করাটাও তৌফিক খালিদীর বিবিসি ছাড়ার একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেন শাকিল আনোয়ার।

“তখন তো ওর বয়স খুবই কম ছিল। প্রায়ই বলত, হি ওয়াজ মিসিং হিজ সান। তো সেটা একটা ব্যক্তিগত কারণ থাকতে পারে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হাত ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য ‘বিগ সাকসেস’ হিসেবে বর্ণনা করেন শাকিল আনোয়ার।

বাংলাদেশের নিউজ পোর্টালের ইতিহাস যদি লেখা হয়, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম অবশ্যই একটি ‘উদাহরণ’ হিসেবে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।

শাকিল আনোয়ার বলেন, “সাকসেসফুললি চলেছে এতদিন ধরে। এতদিন ধরে চলেছে মাঝখানে অনেক ঝামেলা হওয়া সত্ত্বেও। কিন্তু তারপরেও এটা যে সাকসেসফুললি রান করছে এবং এস্টাবলিশড একটা ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম হয়েছে, এটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার।

“তাই আমি মনে করি যে এটা অনেক বড় সাফল্য। এই সাকসেসটা এবং এই ট্রান্সফরমেশনটা তার হাত দিয়েই হয়েছে।”

Image

মাহফুজ আনাম

‘উজ্জ্বল একজন’

তৌফিক ইমরোজ খালিদী ১৯৯১ সালে এস এম আলী সম্পাদিত ডেইলি স্টারে কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। কাজ করেন প্রায় দুই বছর।

এরপর ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসসহ অন্যত্র কাজ করে ১৯৯৭ সালে আবার যখন ডেইলি স্টারে ফেরেন, তখন সম্পাদক ছিলেন মাহফুজ আনাম। এস এম আলীর মৃত্যুর পর ১৯৯৩ সালে ওই দায়িত্ব নেন তিনি।

২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তৌফিক খালিদী ডেইলি স্টারে কাজ করেছেন যুগ্ম বার্তা সম্পাদক এবং বাণিজ্য ও অর্থনীতি ডেস্কের প্রধানসহ বিভিন্ন পদে।

সাবেক সহকর্মীর স্মৃতিচারণ করে মাহফুজ আনাম বলেন, “তৌফিকের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় ডেইলি স্টারে। আমরা যখন শুরু করি, তখন সেও প্রথমের দিকে ছিল। ওই সময়কার স্মৃতি স্পষ্ট মনে আছে আমার।

“হি ওয়াজ ভেরি ব্রাইট। ইয়াং জার্নালিস্ট, ভেরি ব্রাইট এবং বেশ সেন্স অফ হিউমার ছিল। কিন্তু ও খুব স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করত। নিজের অনেক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ডেইলি স্টারে ছিল প্রথম দিকে। তারপরে সে ডেইলি স্টার ছেড়ে দেয়।”

২০০৬ সালে এসে তৌফিক খালিদীর নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সূচনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি সবসময় দূরে থেকে দেখতাম যে একটা ইয়াং ম্যান, সে একটা নিউজ এজেন্সি স্থাপন করল এবং সেটা এতদিন চালাল।

“সো, আই হ্যাভ এ লট অব রেসপেক্ট ফর হিম; এন্ড হিজ অ্যাবিলিটি অ্যাজ আ জার্নালিস্ট, তারপরে অ্যাজ আ ম্যানেজার–সে একটা সংস্থাকে চালাল।”

তৌফিক খালিদীর আকস্মিক চলে যাওয়ায় শোক প্রকাশ করে মাহফুজ আনাম বলেন, “এই ধরনের আকস্মিক চলে যাওয়াতে আমি সত্যি সত্যি খুব দুঃখিত এবং আমি মনে করি আমাদের জার্নালিজম জগতে বিশেষ করে ইংলিশ জার্নালিজম জগতে আমাদের একটা অপূরণীয় ক্ষতি হল।”

Image

অরুণ দেবনাথ

‘ব্রেকিং স্টোরি দিয়ে রোমাঞ্চ অনুভব করতেন তিনি’

২০০৬ সালে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম হিসাবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন ডেইলি স্টারের উপ-সম্পাদক অরুণ দেবনাথ। তখন তিনি ছিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একজন বার্তা সম্পাদক।

অরুণ দেবনাথ বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদী, আমাদের প্রিয় তৌফিক ভাই, যিনি আমাদের এখনকার চেনা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে শেকড় থেকে ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম হিসাবে গড়ে তুলেছেন।

“তিনি সত্যিকারের ২৪/৭, নির্ঘুম সংবাদ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেইসব দিনে দ্রুতগতির টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতাম আমরা। ব্রেকিং স্টোরি দেওয়ার রোমাঞ্চ তিনি উপভোগ করতেন—এ এক পরমানন্দ, যা একজন প্রকৃত সাংবাদিকই কেবল জানেন।”

খালিদীর দৃঢ় নেতৃত্বে একদল খুবই তরুণ সাংবাদিকের নতুন মেজাজের এই বার্তাকক্ষ পরিচালনার মত যোগ্য হয়ে ওঠার কথা স্মরণ করেন অরুণ দেবনাথ।

“প্রাথমিক সেই দিনগুলো ছিল দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক আর্থিক কষ্টের সময়। সম্পদ ছিল খুবই সীমিত, কিন্তু আমরা ঝড় মোকাবেলা করেছিলাম একসঙ্গে। আমরা যা তৈরি করতে যাচ্ছি, তার প্রতি অভিন্ন বিশ্বাস চালিত করেছিল আমাদের।

“আমাদের জন্য এক দৃঢ় অবলম্বন হয়ে উঠেছিল তার অবিচল সংকল্প; তিনি প্রমাণ করেছিলেন, প্রবল উদ্দীপনা ও অদম্য মনোবল থাকলে, চরম প্রতিকূল সময়েও বার্তাকক্ষকে সচল রাখা সম্ভব।”

অরুণ দেবনাথ বলেন, “বার্তাকক্ষকে হস্তক্ষেপমুক্ত রেখেছিলেন তৌফিক ভাই; নানা বিষয়ে আমাদের প্রায়ই বিতর্ক ও ভিন্নমত হলেও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির ক্ষেত্রে আমরা সবসময়ই এক ছিলাম।

“তার সঙ্গে অগুনতি স্মৃতি আছে আমার। এর মধ্যে বার্তাকক্ষে গভীর রাতের সব আলোচনা পরিণত হয়েছে সবচেয়ে লালিত স্মৃতিতে।”

তিনি বলেন, “আমার প্রতি যে আস্থা তৌফিক ভাই রেখেছিলেন, তার জন্য আমি তার প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ থাকব সবসময়; প্রথমে বার্তা সম্পাদক এবং পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে ইংরেজি নিউজ সার্ভিসের প্রধান হিসাবে। তার চলে যাওয়া আমার মধ্যে গভীর শূন্যতা রেখে গেছে, যা হয়ত কখনোই পূরণ হবে না।”

Image

সানাউল্লাহ লাবলু

‘কেউ বলুক, এটা সত্য নয়’

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সানাউল্লাহ লাবলু। এক সময়ে দুজনের নিয়মিত আড্ডা থেকে শুরু করে মাঝখানে তৈরি হওয়া দূরত্ব এবং সবশেষে হঠাৎ সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি।

এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “বেইলি রোডে আহমেদুল আমীন ভাইয়ের অফিসে আড্ডা দিতে যেতাম 'সংবাদ' -এর আমীর খসরু আর আমি। আমীন ভাই ব্যবসায়ী। উনি ছিলেন পেট্রোকেমিক্যাল সেক্টরে নিউজের আমাদের দারুণ একজন সোর্স আর সিনিয়র বন্ধু।

“সেখানেই আশির দশকের শেষ দিকে এক তরুণের সঙ্গে দেখা। আমীন ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী। প্রথম দেখায় আমি ওর কথাবার্তা ও আচরণে মুগ্ধ।”

সেই তৌফিক খালিদীর 'সানডে এক্সপ্রেস' পত্রিকায় কাজের কথা তুলে ধরে সানাউল্লাহ লাবলু বলেছেন, “সেই থেকে ওর সঙ্গে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা, বন্ধুত্ব। আমাদের আড্ডা কখনও কখনও আমীন ভাইয়ের অফিস থেকে ইস্কাটনে উনার ভাইয়ের বাসায় মধ্যরাত অবধি চলত।

“আমাদের যোগাযোগ, মাঝে মধ্যে আড্ডা; সব কিছুর মধ্যমণি ছিলেন আমীন ভাই। উনার পাশের বাড়িতে ছিল ক্র্যাক প্লাটুনের শহীদুল্লাহ খান বাদল ভাইয়ের ব্যবসায়িক অফিস। হ্যারিস ভাই, চুল্লু ভাই, হাবিবুল আলম ভাই ওখানে আড্ডায় যোগ দিতেন অনেক সময়। এর মধ্যে কেটে গেছে অনেক বছর। আমীর খসরু, তৌফিক আর আমি বিভিন্ন মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছি।”

২০০৬ সালের অক্টোবরের পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে তৌফিক খালিদীর থিতু হওয়ার মধ্যে ২০০৭ সালে সানাউল্লাহ লাবলু প্রথম আলো ছেড়ে যোগ দিলেন সমকালে।

দৈনিক সমকালে ওই সময় তিন মাসের বেশি টিকতে না পারার কথা তুলে ধরে ধরে সানাউল্লাহ লাবলু বলেন, “তৌফিক তখন আমাকে বিডিনিউজে যোগ দেওয়ার কথা বলল। ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে ও অফিস ঘুরে দেখাল। আমারও আপত্তি ছিল না।

“ঠিক একই সময় 'এবিসি রেডিও' করার অফার এল। একটা নতুন কিছু। এফএম রেডিওর কিছুই জানি না, বুঝি না। তবু চ্যালেঞ্জটা নিতে চাইলাম। সম্ভবত তখন থেকেই তৌফিকের সঙ্গে আমার দূরত্বের শুরু। আরও কিছু আছে। সেসব কথা না হয় থাক।”

দুই বছর আগে এক সাক্ষাতেই সেই দূরত্ব মুছে যাওয়ার কথা তুলে ধরেছেন সর্বশেষ নেক্সাস টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা এই সাংবাদিক।

লাবলু বলেন, “বন্ধুর বাসায় দাওয়াত খেয়ে আমি আর ছবি লিফট থেকে নামতেই তৌফিকের বিস্ময়, 'লাবলু ভাই!' বলল, ওই ভবনেই সে থাকে।

“কিন্তু তারচেয়ে বড় বিস্ময় আজ (০২ অক্টোবর, ২০২৬) দিয়ে গেল তৌফিক। এভাবে কেউ চলে যায়! খবরটা প্রথম পাওয়ার পর থেকে স্তব্ধ হয়ে গেছি। খালি ফেইসবুক স্ক্রল করছি। কেউ বলুক, এটা সত্য নয়। বিদায় ছোট ভাই, বন্ধু।”

Image

কামাল আহমেদ

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে স্মৃতিচারণ করে বিবিসিতে তার সহকর্মী কামাল আহমেদ বলেছেন, “স্মৃতি তো অনেক কিছুই রয়েছে; সেগুলো এখন আর বলি না। বলতে পারি- ডেফিনিটলি বাংলাদেশ হ্যাজ লস্ট আ ভেরি গুড জার্নালিস্ট, অলসো এন এডিটর।

“অনলাইনের জার্নালিজমকে একটা মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল, নতুন উচ্চতায় । তার শূন্যতা দেশে এ অনলাইন মিডিয়ার ক্ষেত্রে অনেকদিন ধরে অনুভূত হবে।”