০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: পরিচয় না থেকেও অনেক পরিচিত

বিবিসি থেকে অর্জিত বস্তুনিষ্ঠতার 'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা এক লড়াকু সম্পাদক—তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাহসী সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করে লিখেছেন সালেহ উদ্দিন আহমদ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: পরিচয় না থেকেও অনেক পরিচিত

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

সালেহ উদ্দিন আহমদ সালেহ উদ্দিন আহমদ

Published : 03 Oct 2026, 11:40 AM

Updated : 03 Oct 2026, 12:07 PM

কিছু মানুষকে জানতে পরিচয় থাকতে হয়, আর কিছু মানুষকে তাদের কাজের মাধ্যমেই জানা যায়। আমার কাছে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ঠিক তেমন একজন মানুষ; পরিচয় না থাকলেও তিনি আমার খুব পরিচিত। গত বছর যখন দেশে গিয়েছিলাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অফিসে গিয়েও তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আমার হয়নি, কারণ তিনি তখন অফিসে ছিলেন না।

তবে আমার মনে হতো, আমি তার খুব কাছের লোক এবং তিনিও আমার খুব কাছের। এমনটি মনে হওয়ার কারণ হলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে আমি প্রচুর লেখালেখি করেছি, কলাম লিখেছি—এখনো লিখি। যারা আমার লেখার সঙ্গে পরিচিত তারা জানেন, আমি কখনো রেখেঢেকে লেখালেখি করি না। কিন্তু আমার কথাগুলো প্রকাশ করতে বিডিনিউজ কখনো দ্বিধা করেনি।

অনেক লেখা নিয়ে আমি রাজীব নূরের সঙ্গে আলাপ করতাম—"দেখুন, এই লেখা আপনাদের জন্য কোনো বিপদ আনবে কিনা।" প্রতিবারই রাজীব আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তার এডিটর তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন; লেখায় যদি যুক্তি থাকে, লেখা যদি সত্যনির্ভর হয়, তাহলে সেটি প্রকাশে কোনো বাধা নেই। আমার অনেক লেখাতেই রাজীব নূরকে দেওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সেই স্বাধীনতাকে আমি পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছি।

একসময় আমার মনে হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ বোধহয় বাংলাদেশে ‘রিসেট’ হয়ে যাবে—একাত্তর নিয়ে এই দেশে আর কেউ লিখবে না, কোনো পত্রিকা একাত্তরের ইতিহাস পুনরুল্লেখ করবে না, একাত্তরের বীরদের কথাও কেউ স্মরণ করবে না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম আমার সেই ধারণাকে প্রথম থেকেই নাকচ করে দিল। আমার মনে হয়েছে, এই একটা ব্যাপারে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন আপসহীন। অনেক সংবাদমাধ্যম যখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একাত্তর নিয়ে কলম ও কলাম গুটিয়ে নিয়েছিল, তখনও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিভিন্ন বিভাগে অনেক সাহসী লেখকের স্বাধীনতা ও একাত্তরের পক্ষে প্রচুর লেখা প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানি মন্ত্রীদের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল, তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের এমন সখ্যের সমালোচনা করে আমার দুটি লেখা প্রচুর পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

আমরা লেখকেরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে এই প্রশ্রয় পেয়েছিলাম একটা কারণেই—তৌফিক ইমরোজ খালিদী একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কখনো দোদুল্যমানতায় ভোগেননি। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ; তবে একটা বিষয়ে পক্ষপাতিত্বের ব্যাপারে তিনি খোলাখুলি বলতেন—সেটা হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তিনি তিন খণ্ডে একাত্তরের ওপর সুবিশাল এক বই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে প্রকাশ করেন।

আমরা যারা একাত্তরে বিবিসির সংবাদ শুনে সাহসী সাংবাদিকতার মর্যাদা অনুধাবন করেছি, তাদের কাছে এখনো বিবিসি হলো সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। তৌফিক ইমরোজ খালিদী বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন বিবিসিতে। তিনি সংবাদ প্রকাশের অনেক কলাকৌশল শিখেছেন বিবিসি থেকে। এই বিদ্যাকে তিনি পাকাপোক্ত করেছেন অনলাইন সংবাদ প্রকাশনায় এবং ছড়িয়েছেন তার সহকর্মীদের মাঝে। আমরা আশা করব, তার অবর্তমানে তার সহকর্মীরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে অকুতোভয় সাংবাদিকতা অক্ষুণ্ণ রাখবেন এবং এই প্রকাশনাকে পরবর্তী উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সহকর্মীরা তাকে স্মরণ করেছেন একজন ‘আগাগোড়া সাহসী ও লড়াকু সাংবাদিক’ হিসেবে। একজন সম্পাদক ও সাংবাদিকের জন্য এটাই সম্ভবত সর্বোচ্চ সম্মান।

সালেহ উদ্দিন আহমদ: শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: salehpublic711@gmail.com