তৌফিক ইমরোজ খালিদী: শেষ হল পথিকৃতের পথচলা
তিনি বলেছিলেন, “অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। শেষ পর্যন্ত মাথা নত করিনি। আমার ধারণা, আমরা শেষ বিচারে বিজয়ী হয়েছি।”
“বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা আমরা করতে পেরেছি। চাইলেই এখন কেউ গল্প-গুজবভিত্তিক প্রতিবেদন করতে পারে না,” বলতেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার সূচনা হয়েছে তার হাত ধরে। কেবল সূত্রের নাম উল্লেখ করেই লেখা হবে সংবাদ—বাংলাদেশে সাংবাদিকতার এই শুদ্ধচর্চা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাকেই অগ্রণী মানেন সহকর্মীরা।
বাংলাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতায় এমন অনেক প্রথমের জন্ম দিয়ে চিরবিদায় নিলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
সূত্রের নাম উল্লেখ করেই সংবাদ লিখতে হবে, বাংলাদেশে এমন ধারা কঠোরভাবে চালু করার কথা গর্বের সঙ্গে বলতেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক।
চাপের কাছে মাথা নত করবেন না, এমন কথা প্রকাশ্যেই তিনি বলতেন। শুধু বলতেন না, শত চাপেও মাথা উঁচু করে থাকার সৎসাহস তিনি দেখিয়েছেন বারবার।
তিনি বলেছেন, “অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। শেষ পর্যন্ত মাথা নত করিনি। আমার ধারণা, আমরা শেষ বিচারে বিজয়ী হয়েছি।”
কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অর্জিত সেই ‘বিজয়’ নিয়ে মাথা উঁচু করে টিকে থাকার কথা বলতেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জীবনাবসানের পর তার এমন সাহসী মনোভাব এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পেছনে ভূমিকার কথা এসেছে সাংবাদিকতার সহকর্মী এবং পাঠক-দর্শকদের কথায়।
নৈর্ব্যক্তিকভাবে সংবাদ উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে নির্ভরযোগ্য সংবাদ উৎস হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অবস্থান ধরে রাখতে পারাকে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বড় অবদান হিসাবে তুলে ধরেছেন তার সাবেক সহকর্মী আফসান চৌধুরী।
বিবিসির পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেও তৌফিক খালিদীর সঙ্গে কাজ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক, কলাম লেখক এবং শিক্ষক আফসান চৌধুরী।
তিনি বলেন, দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনে অনেকের অনেক পরিবর্তন হলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এখনও ‘সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য’।
“আমি কোনো নিউজ এখনও, আজও এত বছর পরেও যদি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে না হয়, আমি অন্য জায়গায় এটা বিশ্বাস করতে পারি না।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করে আফসান চৌধুরী বলেন, “যে জিনিসটা ও করতে পেরেছিল অনেকটাই, সেটা হচ্ছে এই নৈর্ব্যক্তিকভাবে নিউজ করা- এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা অন্যরা পারে না। অন্যরা পার্টিসিপেন্ট হয়ে যায়, অংশীদার হয়ে যায় নিউজের ভালো-মন্দের মধ্যে। কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের নিউজ মেকিংটা সবসময় অবজেক্টিভ ছিল।
“এবং কলাম যারা লিখতো, সেটাতো অন্য কথা, আমিও লিখেছি, আরও অসংখ্য মানুষ লিখেছে এবং আমাদের যে হিট ভিউ হত, চিন্তা করা যায় না। তখনকার দিন আজ থেকে পনের বছর আগে। কিন্তু আমি যেটা মনে করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিউজকে কোনোদিন অবজেক্টিভিটির বাইরে যেতে দেয়নি তৌফিক।”
আফসান চৌধুরী বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, আমি প্রতিদিন প্রথম এইটা পড়ি। এইটা যে কত বড় একটা অর্জন চিন্তা করা যায় না। একসময় হয়ত এটা এককভাবে অনলাইন মিডিয়া হিসেবে ছিল এবং সেই কারণে এটা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, যে আধুনিক এই ডিজিটাল মিডিয়া এইটা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর প্রথম করেছে এবং সফলভাবে করেছে।”
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সময় থেকে শুরু করে বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত যোগাযোগ হওয়ার কথা তিনি স্মরণ করেন।
মুশতাক হোসেন বলেন, “তৌফিক অনলাইন সাংবাদিকতাকে একটি মানসম্মত ও প্রতিশ্রুতিশীল জায়গায় নিয়ে গেছেন। প্রায় বন্ধ হতে যাওয়া বিডিনিউজকে তিল তিল করে গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক মানের একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে রূপান্তর করেছিলেন।
“দ্রুত বা চটকদার খবর না দিয়ে কিছুটা দেরিতে হলেও শতভাগ যাচাই করা সত্য খবর প্রকাশ করাই ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মূল নীতি, যাতে কোনো খবর ভুল প্রমাণিত হয়ে তা প্রত্যাহার করতে না হয়। এমনকি টেলিভিশনের অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে তৌফিক সেদিকে পা বাড়াননি।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সহকর্মীরা এই শোক কাটিয়ে উঠে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ধারা বজায় রাখবেন এবং তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদানের কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবেন–সেই প্রত্যাশার কথাও বললেন মুশতাক হোসেন।
সাংবাদিকতার জন্য এক জীবন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়ার সময়ই জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (নিপোর্ট) গবেষক এবং পরে সেইভ দ্য চিলড্রেনের একটি গবেষণা প্রকল্পে টিম লিডার হিসাবে কাজ করেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
১৯৮৯ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতায় আসা তৌফিক ইমরোজ খালিদী এই পেশায় ছিলেন জীবনের শেষ অবধি।
সানডে এক্সপ্রেসে প্রায় দুই বছরের মত কাজ করে তিনি ১৯৯১ সালে এস এম আলী সম্পাদিত ডেইলি স্টার পত্রিকায় যোগ দেন কূটনৈতিক প্রতিবেদক হিসাবে।
সেখানে ১৯৯৩ সালের মার্চ পর্যন্ত কাজের পর একই বছরের অক্টোবরে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসাবে কাজ শুরু করেন।
ওই পদে ১৯৯৫ সালের মার্চ পর্যন্ত কাজের সময়ে কূটনীতি, রাজনীতি, জাতীয় সংসদ কাভার করার পাশাপাশি তেল-গ্যাসের নেগোসিয়েশন, অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও বাণিজ্য চুক্তিতে দুর্নীতির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন তৌফিক খালিদী।
পঁচানব্বইয়ের মার্চে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্বের পাশাপাশি উপ সম্পাদকীয় লেখা শুরু করেন তিনি। সেখানে কাজ করেন ১৯৯৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
সাংবাদিকতা থেকে পাঁচ মাসের বিরতি নিয়ে নদী ভাঙন নিয়ে কাজ করা একটি নেতৃস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় আর্থ-সামাজিক ও যোগাযোগ পরামর্শক হিসাবে যুক্ত হন খালিদী।
ওই সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্যানেলে প্রতিবেদনে সহ-লেখক হিসাবে ছিলেন তিনি। বিশ্ব ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নের যমুনা সেতু প্রকল্পের কারণে কয়েক লাখ মানুষের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির কথা তুলে ধরা হয়েছিল ওই প্রতিবেদনে।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্যারিস ভিত্তিক ইউরোপ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসাবে ‘ইউরোপ’ নামের ত্রৈমাসিক জার্নালের মাধ্যমে আবার সাংবাদিকতায় ফেরেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। সেখানে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন।
১৯৯৭ সালের অগাস্টে তিনি ডেইলি স্টার পত্রিকায় ফেরেন বাণিজ্য ও অর্থনীতি ডেস্কের প্রধান হিসাবে। ১৯৯৮ সালের জুলাই পর্যন্ত পত্রিকার পুরো অর্থ-বাণিজ্য বিষয়ক খবর ও বিশ্লেষণের সমন্বয় ছিল তার দায়িত্বে।
১৯৯৮ সালের অগাস্টে ডেইলি স্টারের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওই পদে থাকার সময়ে দৈনন্দিন খবরের পরিকল্পনা, সম্পাদনা এবং সমন্বয়ে কাজ করেন তিনি।
এর মধ্যে ১৯৯৯ সালের মার্চে ডেইলি স্টার পত্রিকার ‘উইকেন্ড এডিশন’-এর বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ২০০০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ সংস্করণটির পরিকল্পনা ও সম্পাদনার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে সাম্প্রতিক ঘটনার উপর বড় সাক্ষাৎকারের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে।
২০০০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে যোগ দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০০৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সেখানে তিনি সংবাদ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করতেন।
বিবিসিতে তিনি বড় আন্তর্জাতিক ঘটনাবলিতে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি ও উপস্থাপনা করতেন; ফিচার এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সাময়িকীও করতেন। পাশাপাশি বহুল আলোচিত 'ডিবেট' অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করতেন তিনি।
২০০৫ সাল জুলাই থেকে এক বছর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও পরামর্শক হিসাবে কাজ করেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
সাংবাদিকতাই যে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর ধ্যানজ্ঞান ছিল, সে কথা বলেন তার সহপাঠীরাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে তার সহপাঠী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদম একই ক্লাসে আমরা পড়তাম, আমার ক্লাসমেট এবং সে অত্যন্ত ট্যালেন্টেড ছিল। সেই ট্যালেন্টটা তার আগেই, ছাত্রজীবনেই বোঝা যেত। এরকম ট্যালেন্ট ছিল… আমার মনে হয়েছে যে সে কোথাও একটা সময় যাবে, খুব ভালো একটা জায়গায়।
“আমরা খুব ভালো ব্যাচমেট ছিলাম। ইংরেজিতে পড়াশোনার সময় ও পড়াশোনাটা পরীক্ষাটা দিত ঠিকঠাক মত। অনেক সময় দেখা যেত, একসাথে আলোচনা করে পরীক্ষা দিতাম, পড়াশোনা করতাম। তাকে পড়াশোনা করতে বলতাম, যে তুমি বইটা নিয়ে বসো। অনেক সময় বলতাম।”
তৌফিক ইমরোজ খালিদী যখন বিবিসি ছেড়ে দেশে ফিরে বিডিনিউজের হাল ধরলেন, তখন তার সঙ্গে কী কথা হয়েছিল, তাও স্মরণ করেন সরকারের জ্যেষ্ঠ আমলা মাহবুবা ফারজানা।
“তখন আমি বলতাম, তুমি যে তুমি আসলা বিবিসি থেকে, এখন কি করবা? তোমারতো একটা জায়গায় যাওয়া উচিত। তো বলে, ‘আমি জানি না কী করব’। তো যাই হোক, সে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যখন করল, তখন আমার খুব ভালো লেগেছে। সে একটা জায়গায় গেল। মানে আমার খুব তখন ভালো লাগত।”
তথ্য সচিব হওয়ার পরে যোগাযোগটা বাড়ার কথা তুলে ধরে মাহবুবা ফারজানা বলেন, “আমি (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের) প্রত্যেক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যাই, সে আমাকে অত্যন্ত সম্মান করত। বন্ধু হিসেবে খুব ভালো একটা বন্ধু ছিল। একটা বন্ধু হারালাম এবং আসলে খুব ট্যালেন্টেড সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব হারালাম।”
অনেক প্রথমের পুরোধা
২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নবযাত্রা শুরু করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, সূচনা হয় বাংলাদেশের ইন্টারনেট-ভিত্তিক সাংবাদিকতার।
তবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল এর এক বছর আগে ২০০৫ সালে। তখন অবশ্য অন্যান্য বার্তা সংস্থার মত ‘বিডিনিউজ’ সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য খবর সরবরাহ করত। দেশের অন্য সংবাদ সংস্থাগুলো টেলিপ্রিন্টারে খবর সরবরাহ করলেও বিডিনিউজ কাজটি শুরু করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।
২০০৬ সালে বার্তা সংস্থাটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বদলের পর এটি খোল-নলচে বদলে যায়। সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ সংবাদমাধ্যমকে দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানিতে রূপ দেয়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার নতুন যুগের ওই সূচনার স্মৃতিচারণ করে গবেষক-সাংবাদিক আফসান চৌধুরী বলেন, “তৌফিকের বড় যেটা অর্জন, এর আগে যারা ছিল, তারা কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে ওভাবে সামাল দিতে পারেনি।
“তৌফিক এসে সেটা করেছিল, প্রচুর মানুষকে সে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল এবং ওই সময় যখন আমি জয়েন করেছিলাম, তখন বহু পরিকল্পনা হচ্ছিল। তখন মানুষকে ডিজিটাল মিডিয়া বোঝানো যেত না। তৌফিক ও আমি গিয়ে বোঝাতাম এবং ক্রমে খুব সফল হয়ে গেছিল।”
২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর শুধু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নয়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংবাদপত্রেরও যাত্রা শুরুর দিন, বাংলাদেশে কোনো বার্তাকক্ষের ২৪ ঘণ্টা সচল থাকারও সূচনা লগ্ন।
সেই শুরুর কথা স্মরণ করে প্রতিষ্ঠানের ষোড়শ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন প্রধান সম্পাদক খালিদী বলেছিলেন, “আমরা জেগে থাকি প্রায় ২৪ ঘণ্টাই, সবসময়ই। আমরা কখনোই ঘুমাই না।
“এখন কেউ কেউ আছে হয়ত… তবে আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন আমরা দেশের একমাত্র নিউজরুম ছিলাম, যা কখনোই ঘুমাত না।”
‘সবার আগে নির্ভুল খবর’–এই মন্ত্র দিয়ে সংবাদ পরিবেশন শুরুর পর দ্রুতই পাঠকের মনোযোগ কাড়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এখনও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ফেইসবুক পাতায় প্রায় কোটি অনুসারী পাঠকের সেই আস্থারই পরিচয় দেয়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে এরপর শিশুদের জন্য প্রথম বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট ‘কিডজ’ আনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ইউনিসেফের সঙ্গে মিলে শিশু সাংবাদিকদের প্রথম ওয়েবসাইট ‘হ্যালো’ও আসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের হাত ধরে।
চালু হয় মোবাইল ফোনে ব্রেকিং নিউজ সেবা, যা ছিল দেশে প্রথম। মোবাইলে এসএমএসে যে বাংলায় খবর দেওয়া যায়, তাও দেখিয়ে দেয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
দীর্ঘ পথচলায় চড়াই-উতরাই পেরোনোর কথা স্মরণ করে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছিলেন, “আমরা সবসময় ভালো থাকি না, মাঝেমাঝে খুব ভালো থাকি, কখনও কখনও খুব যন্ত্রণায় থাকি, কষ্টে থাকি। তারপরও আমরা ভেসে থাকার চেষ্টা করি, বেঁচে থাকার চেষ্টা করি, জেগে থাকার চেষ্টা করি।”
সহকর্মী আর পাঠকদের সঙ্গে নিয়ে বন্ধুর পথে এগিয়ে চলার কথা ২০২২ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তুলে ধরেছিলেন তৌফিক খালিদী।
তিনি বলেছিলেন, “এখনও টিকে আছি, বেঁচে আছি, ভেসে আছি, সেটাই যথেষ্ট। আমি কৃতজ্ঞ সবার প্রতি। আমার সহকর্মীদের প্রতি, আমাদের লক্ষ লক্ষ পাঠকদের প্রতি, শুভানুধ্যায়ী যারা আছেন, যারা আমাদেরকে সমর্থন করেন, সাহায্য করেন, আমাদেরকে রক্ষা করেন, বিভিন্ন রকম ঝামেলা থেকে, বিপদে-আপদে। সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ডিজিটাল মিডিয়ায় অবদানের জন্যও সমাদৃত ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত সাউথ-টু-সাউথ মিডিয়া ডায়ালগে এশিয়া-প্যাসিফিক, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ‘১৪ জন শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল মিডিয়া উদ্ভাবক’-এর একজন হিসেবে তিনি স্বীকৃতি পান।
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে বাংলাদেশ সরকারের তরফে দেওয়া হয় বিশেষ সম্মাননা।
২০১০, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে তিনি জার্মানির বনে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে অংশ নেন। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত 'বাংলাদেশ রাইজিং' শীর্ষক কনফারেন্সে তিনি প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
২০১৬ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি সভাপতিত্ব করেন এবং ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি দেশের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন ও পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির (২০১২ ও ২০১৫) মনোনীত সদস্য ছিলেন।
এছাড়া ২০০৮ সালে বার্তা সংস্থাগুলোর নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি এবং ২০০৭ সালে ঢাকার নদী রক্ষার জন্য গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।
‘আমরা মাথা নত করিনি’
‘নির্ভুল সাংবাদিকতার’ যে পথচলার জন্য পাঠকের প্রশংসায় ভাসে তৌফিক ইমরোজ খালিদী সম্পাদিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, সেই যাত্রা সব সময় মসৃণ ছিল না।
এক ব্যবসায়ীর মামলা ও বিচার নিয়ে প্রকাশিত পুরোনো খবর সরাতে রাজি না হওয়ার কারণে ডজন ডজন মামলার মুখে পড়েও মাথা নোয়ায়নি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
প্রভাবশালী একটি মহল রুষ্ট হয়েছিল, তাই প্রধান সম্পাদক খালিদীকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় পাঁচ বছর ধরে হয়রানি করা হয়।
চব্বিশের অগাস্টে বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার হয়।
একজন সেনাপ্রধানের ভাইয়ের সবার জানা পরিচয় সংবাদ প্রতিবেদনে লেখায় ২০১৮ সালে অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয় কয়েক ঘণ্টা।
পরে আরেক চক্রের ইন্ধনে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যে ২০২৩ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ওয়েবসাইট এক মাস বন্ধ থাকে।
তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বন্ধ হয়ে যায়নি, পুরনো গৌরব নিয়েই ফিরে এসেছে নতুন উদ্যমে।
সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতার লড়াইয়ের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে যাওয়ার কথা স্মরণ করে ২০২৪ সালে অষ্টাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছিলেন, “সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বোধহয় উল্লেখযোগ্য একটা লড়াই আমরা করেছি। মাথানত করবার মত অবস্থা আমরা হতে দেইনি; আমরা মাথা নত করিনি।
“আগামী দিনগুলোতেও আমরা টিকে থাকব মাথা উঁচু করেই। আমাদেরকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।”
‘রাজনীতিক-দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা’ পেছনে লাগলেও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম মাথা উঁচু করে চলার কথা তুলে ধরে প্রধান সম্পাদক বলেন, “চেষ্টা হয়েছে, চরম অন্যায় করা হয়েছে, মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে। দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীরা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন, রাজনৈতিক নেতারা আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন।
“ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছেন, আমাদের ক্ষতি করবার চেষ্টা করেছেন। অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছেন। সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছে, হয়রানি করেছে। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করা হয়েছে। কিন্তু আমরা সবাই মিলে লড়াইটা চালিয়ে গেছি।”
প্রতিষ্ঠানের ১৮ বছর পূর্তির সময় নতুন নেতৃত্বের হাতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণের ভাবনার কথা বলেছিলেন প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদী।
“আমাদের ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, টানা ১০ বছর বাংলাদেশের সবচেয়ে পঠিত সংবাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে আমি ছিলাম। তখন পর্যন্ত আমরা কোনো রকম বিতর্ক ছাড়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদমাধ্যম ছিলাম।
“আমি বলেছিলাম, আমার সরে দাঁড়ানো উচিত। গত আট বছরে সেই পরিবেশ আমরা তৈরি করতে পারিনি, আমি পারিনি।”
তৌফিক খালিদী বলেন, “তরুণদের হাতে আমি দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলাম। আমি আশা করব, খুব দ্রুত তরুণ কেউ দায়িত্ব নেবে। আমাদের অনেক সহকর্মী আছেন, যারা অত্যন্ত যোগ্য, অত্যন্ত দক্ষ, কর্মঠ।
“তারা জীবন উৎসর্গ করেছেন ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, তারা নেতৃত্ব দিতে পারবে। আর তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।… আমি বিশ্বাস করি, এখন যারা তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, তারা আগামী ১৮ বছর এটা পরিচালনা করবে। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।”
সেই ইচ্ছাপূরণ দেখার আগেই ৫৯ বছরে হঠাৎ এপারের যাত্রা সাঙ্গ করলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
