গণঅভ্যুত্থান: টাকা-পয়সার লোভে ছেলেকে মৃত দেখিয়ে হাসিনাদের বিরুদ্ধে মামলা
মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দিয়েছে আদালত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শিশু জিহাদ নিহত হয়েছে—এমন অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের ১২৩ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছিলেন বাবা জহিরুল ইসলাম রাজু।
তবে তদন্তে পুলিশ জেনেছে, জিহাদ মারা যায়নি; ‘বাসস্থান-আর্থিক লোভে’ পড়ে মামলায় তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। একারণে মামলা থেকে শেখ হাসিনারা অব্যাহতি পেয়েছেন।
পুলিশ বলছে, তদন্তে গিয়ে ভুক্তভোগীকে জীবিত পাওয়া গেছে; ভিন্ন স্থানে ‘জখম হওয়ার’ ঘটনাকে কেরাণীগঞ্জে ‘হত্যা’সাজিয়ে দায়ের করা মামলায় ‘তথ্যগত ভুল’ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করে গত বছরের ১১ অগাস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। কেরাণীগঞ্জ মডেল থানার এসআই বদিয়ার রহমানের দাখিল করা প্রতিবেদন গ্রহণ করে গত বছরের ৩০ অক্টোবর আসামিদের অব্যাহতি দেন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না।
আদেশে বলা হয়, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র এবং ভুক্তভোগীর জবানবন্দি থেকে জানা যায়, হত্যা মামলা হলেও ভুক্তভোগী জীবিত রয়েছে। তিনি কেবল জখম হয়েছেন, যা নিজেই আদালতে স্বীকার করেছেন। এমন অবস্থায় কেরাণীগঞ্জ মডেল থানায় করা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হলো।
অব্যাহতি পাওয়া অপর আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল, কামরুল ইসলাম ও নসরুল হামিদ বিপু, কেরাণীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ার শাহীন আহমেদ, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ডিএমপির সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম।
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদিয়ার রহমান বলেন, “এই মামলায় দুটি ভুল হয়। এক হচ্ছে, জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে মামলা এবং বছিলার ঘটনায় কেরাণীগঞ্জে মামলা করা; যা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য তদন্ত শেষে সত্যতা না পেয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছি।”
তবে ঘটনার ‘প্রকৃতস্থল’ হাজারীবাগে ভুক্তভোগীর আহত হওয়ার অভিযোগ তুলে আবারও মামলা হয়েছে বলে জানান তিনি।
জহিরুল ইসলামের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, জুলাই আন্দোলনের শেষ দিন অর্থাৎ ৫ অগাস্ট কেরাণীগঞ্জ মডেল থানার ওয়াশপুর বছিলা ব্রিজের নিচে তার ছেলে জিহাদকে গুলি করা হয়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। জিহাদের শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় শরীর থেকে বুলেট বের করা সম্ভব হয়নি এবং অস্ত্রোপচার করা হয়নি। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা হলে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মারা যায় সে।
আদালতে মামলা দায়েরের পর তদন্তভার পায় কেরাণীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। এরপর সন্ধিগ্ধ আসামি আহসান হাবিব সাগর, হৃদয়, আব্দুল মতিন হাওলাদার, মেহের মোর্শেদ শাওন, কামরুল হাসান ওরফে কামু, হাজী আবু বক্কর সিদ্দিককে এ গ্রেপ্তার করে এ মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়।
তদন্ত শেষে তদন্তকর্তা বদিয়ার রহমান আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন।
এ প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার বর্ণনায় কেরাণীগঞ্জ মডেল থানার ওয়াশপুর বছিলা ব্রিজের উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে স্থানটি ঢাকার হাজারীবাগ থানার অন্তর্গত। তদন্তকালে জানা যায়, জিহাদের মামলায় দেখানো হয় ৫ অগাস্ট বছিলা ব্রিজের নিচে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, পরবর্তীতে কয়েকজন জহিরুলকে প্ররোচিত করেন। তিনি প্ররোচিত হয়ে বাসস্থানের পুনর্বাসন, নগদ টাকা পাওয়ার ‘লোভে’ জিহাদ আহত উল্লেখ করে আদালতে গিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। কিন্তু দুষ্টচক্রটি মামলার ভেতরে জিহাদকে মৃত দেখায়, জহিরুল জানতো না। তাকে জানানো হয় জিহাদকে আহত দেখিয়া মামলাটি দায়ের করা হয়।
বদিয়ার প্রতিবেদনে লিখেছেন, তদন্তকালে জানা যায়, জিহাদ প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুবরণ করে নাই। এছাড়া বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কয়েকজনের নাম-ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। তাছাড়া এজাহারে বর্ণিত সাক্ষীদের মধ্যে অনেকেই সাক্ষ্যদানে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।
তাছাড়া তদন্তকালে বাদী উপস্থাপিত ভুক্তভোগীর মৃত্যু সনদ যাচাইয়ে দেখা যায়, ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর জিহাদের মৃত্যু সংক্রান্ত কোনো সনদ দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে মামলার ঘটনা সংক্রান্ত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জহিরুলকে অনুসন্ধান করা হয়। একপর্যায়ে তাকে পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে জিহাদ জীবিত আছে বলে জানায়। গত বছরের ৯ জানুয়ারি ভুক্তভোগীও আহত হওয়ার কথা জানিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেয়।
তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় ‘তথ্যগত ভুল’ বর্ণনা করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক স্বার্থান্বেষী মহল সিন্ডিকেট করে এ ধরণের মামলা করেছে। সেগুলোতে পুলিশ তদন্ত করে ফাইনাল রিপোর্ট দিচ্ছে।“
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করলে অবশ্যই বাদীর শাস্তির বিধান আইনে আছে। যদিও আমাদের দেশে এর নজির খুব কম।”
এ বিষয়ে আসামি আব্দুল মতিন হাওলাদারের আইনজীবী ওবাইদুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের মিথ্যা মামলা খুবই দুঃখজনক। মামলা হওয়ার সময়ই তদন্ত করে আমলে নেওয়া উচিত ছিল। বাদীকে আইনের আওতায় আনা উচিত।
“মতিন হাওলাদার এই মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ১৫ মাসের বেশি কারাগারে আছে। অথচ মামলাটিতে কেউ জড়িত নেই বলে আদালত সবাইকে অব্যাহতি দিয়েছেন।”
এ বিষয় জানতে মামলার বাদী জহিরুল ইসলামের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
