Published : 24 Sep 2025, 09:03 PM
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কারের বিষয়ে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ ‘আশু করণীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য নেই কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেছেন, “সরকারের কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। যতটুকু জানি, আইন সংস্কারের জন্য আইন মন্ত্রণালয় একজন কনসালটেন্ট নিয়োগ দিচ্ছে, যার সহায়তায় সরকার আইন সংস্কারের কাজ শুরু করবে।”
বুধবার টিআইবি ও দুদকের মধ্যে পাঁচ বছরের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ বিষয়ে কথা বলেন টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি, খুব দ্রুতই এটি এগিয়ে যাবে। কিন্তু যেসব সুপারিশ সরকারি সিদ্ধান্তে বাস্তবায়নযোগ্য এবং পরবর্তীতে দুদক বাস্তবায়ন করতে পারবে, সেগুলোতে কী পরিমাণ অগ্রগতি হয়েছে—সে সম্পর্কে আমরা এখনও কিছু জানি না। এটি আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
“আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে তারা এসব সুপারিশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যায় এবং দুদকের উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে, তা যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করে।”
গত বছরের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের হাল ধরা অন্তর্বর্তী সরকার দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
এর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে ৩ অক্টোবর গঠিত হয় নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রসাশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন। ৬ অক্টোবর গঠিত হয় সংবিধান সংস্কার কমিশন।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে আট সদস্যের দুদক সংস্কার কমিশন ১৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেয়।
প্রতিবেদনে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সংবিধানের অঙ্গীকার, দুর্নীতি বিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করা হয়।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ গত ২৬ মে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের ‘সবগুলো সুপারিশের পক্ষেই’ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
“এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় ও আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের সুপারিশের বিষয়ে সব দল একমত পোষণ করেছে।”
দুদকের ‘স্বাধীনতা, কার্যকরিতা ও গতিশীলতার পাশাপাশি এর স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তাবিত সব সুপারিশ সম্পর্কে’ প্রায় সব দলই ‘সম্পূর্ণ একমত’ হয়েছে বলেও সেদিন তিনি জানান।
আলী রীয়াজ সেদিন বলেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদককে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। দুয়েকটি দল বিষয়টি নিয়ে নির্বাচিত সংসদে আলোচনা হতে পারে বলে মত দিয়েছে।
একজন সাংবাদিক বলেন, “ঐক্যমত কমিশনের মেয়াদ ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, দুদক সংস্কার কতটুকু এগিয়েছে? এছাড়া, দুদক সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন তথ্য জানানো হয়নি। আপনারা কতটুকু সুপারিশ বাস্তবায়নযোগ্য মনে করছেন?”
জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আমরা যে প্রতিবেদনটি সরকারের কাছে জমা দিয়েছি, সেটির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, আমাদের প্রতিবেদনের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সুপারিশ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা ‘আশুকরণীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি। অর্থাৎ, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অধ্যাদেশ জারি করে আইন সংশোধন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান—বিশেষত দুদকের উদ্যোগে—এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এটি পুরোপুরি সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
“দ্বিতীয়ত, কিছু সুপারিশ রয়েছে, যেগুলো সংখ্যায় কম হলেও রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত প্রয়োজন। এগুলো নিয়ে কমিশনে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছি।”
তিনি বলেন, “সুখবর হলো, দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবগুলোতেই সব রাজনৈতিক দল ঐক্যমত প্রকাশ করেছে, অর্থাৎ এগুলো বাস্তবায়নের জন্য তারা প্রস্তুত। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এগুলো বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে কিছু রাজনৈতিক দল—বিশেষ করে বড় দলগুলো, যারা নিজেদের ক্ষমতায় আসবে বা ইতোমধ্যে এসেছে বলে মনে করছে—তারা কিছু ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে।
“এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, এবং ঐক্যমত কমিশনের পক্ষ থেকে একটি যৌথ অবস্থানে পৌঁছানোর আশা করছি। সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, দুদক সংস্কারের পথে বড় কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।”
তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়ে গেছে মন্তব্য করে দুদক সংস্কর কমিশনের প্রধান বলেন, “প্রথমত, দুদকের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং দ্বিতীয়ত, দুদকের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকার বিষয়টি। এছাড়া আমরা সুপারিশ করেছিলাম, সংবিধানে একটি ধারা যুক্ত করার, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারকে দুর্নীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। এই দুই-তিনটি বিষয় ছাড়া বাকি সুপারিশগুলোর ক্ষেত্রে ঐক্যমত কমিশনের উপর নির্ভরশীলতার প্রয়োজন নেই।”
প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় নেই। এ সময়ে দুদকের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের কাছে।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়িত হলে দুদক আসলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও রাখা হয় তার সামনে।
জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের সুপারিশগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত। আপনারা দেখবেন, এখানে ৪৭টি সুপারিশ রয়েছে। এগুলো যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
“আমরা এ বিষয়ে আশাবাদী এবং বিশ্বাস করি, দুদক সংস্কার কমিশন তার লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হবে। টিআইবির একজন কর্মী হিসেবে এবং সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আমি মনে করি, এটি অবশ্যই সম্ভব।”
তবে এর বাস্তবায়ন দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “প্রথমত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতেও একই ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে হবে।
“আমরা যতই কাগজে-কলমে আইন প্রণয়ন করি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করি না কেন, যদি রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা ও তার চর্চা সহজতর না হয়, তবে আমাদের দুদক সংস্কার কমিশনের যে স্বপ্ন, তা বাস্তবায়িত হবে বলে প্রত্যাশা করা কঠিন।”