Published : 01 May 2026, 01:26 AM
চার দশক আগে যে কাজে হাত লাগিয়েছিলেন, সেই ট্যানারি শ্রমিক পরিচয়েই পেশাজীবনের শেষলগ্নে এসে দাঁড়িয়ে আছেন মো. নাসির।
৬০ বছরের জীবনে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার বাইরে আর কোনো কাজ শেখেননি তিনি। ফলে পেশা বদলের সময় কিংবা সক্ষমতা, কোনোটাই তার নেই।
জীবনভর একই কাজ করে এলেও তার প্রতিফলন নাসিরের পারিশ্রমিকে নেই। মাস শেষে ১৮-২০ হাজার টাকার বেশি তার পকেটে ঢোকে না।
এই টাকা দিয়ে নাসিরকে ঢাকায় থাকতে হয়। সংসারের খরচ পাঠাতে হয় বরগুনায় থাকা পরিবারের কাছেও।
চোখের দেখায় সুস্থ-সবল মনে হলেও নাসিরের শরীর অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। দুবার স্ট্রোক করেছিলেন। একটি দাঁতও অবশিষ্ট নেই।
চিকিৎসকরা বলেছেন, ভারী কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তার করা যাবে না। কিন্তু সংসার চালাতে গেলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই নাসিরের।
সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরীতে আসার আগে নাসিরের ৩০ বছর কেটেছে হাজারীবাগে।
সেখান থেকে ২০১৭ সালে ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের সময় নাসিরের মতো অনেকেই হেমায়েতপুরে চলে আসেন।

সাভারে চামড়া শিল্প এলাকায় ঢোকার আগেই নাকে তীব্র গন্ধ এসে লাগে। মূলত সড়কের দুপাশে থাকা কাঁচা চামড়ার আড়ত থেকে এই গন্ধ ছড়ায়। তবে মূল শিল্প নগরীর ভেতরটা অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন।
মে দিবসের দিন চারেক আগে সোমবার সন্ধ্যায় চামড়া শিল্প নগরীর একটি চায়ের দোকানে কথা হয় প্রৌঢ় শ্রমজীবী নাসিরের সঙ্গে।
১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গের ইতিহাসের কিছুই জানা নেই তার। ঐতিহাসিক এই আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের তাৎপর্যও বোঝেন না তিনি। নিজের জীবনের তাগিদে কাজ করতে হয় এটুকুই শুধু বোঝেন তিনি।
এই পেশায় আসার প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুরুতে পোশাক কারখানায় কিছু দিন কাজ করেছেন। কিন্তু ভালো না লাগায় ১৯৮৬ সাল থেকে ট্যানারিতে কাজ শুরু করেন তিনি।
তিনি বলেন, শুরুর দিকে তিনি বড় ট্যানারিতে কাজ করতেন; কিন্তু আয় কম। এ কারণে বিভিন্ন কারখানায় চুক্তিভিত্তিক ‘ছুটা’ বা খণ্ডকালীন কাজ করেন তিনি।
বর্তমান আয় জানতে চাইলে এই ট্যানারি শ্রমিক বলেন, সারাদিন কাজ করলে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পাওয়া যায়।
গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ-বাবাকেও দেখতে হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এই কয়টা টাকায় এখন আর কুলায় না, কিন্তু এই শরীর লইয়া অন্য কামও তো পাই না। সারাজীবন এই কাম করছি; এই কামই পারি।”
কর্মজীবনের পুরোটা একটা পেশায় ঢেলে শেষবেলায় শূন্য হাতে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকের তালিকায় নাসিরের মতো অনেকেই আছেন।
নাসিরের পাশে বসে থাকা আব্দুস সালাম, আনোয়ার ও মোহাম্মদ বিল্লাহর গল্পটাও একই রকম।
মোহাম্মদ বিল্লাহ বলেন, “ট্যানারিতে একজন শ্রমিকের স্থায়ী হতে ১২ থেকে ১৪ বছর লেগে যায়। বর্তমানে যে আয়, তা দিয়ে স্ত্রী ও চার সন্তানের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।”

১৯৮৬ সালে নাসির যখন ট্যানারি শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন মাসে পারিশ্রমিক পেতেন ৪০০ টাকা। এখন মাসে তার যেটা আয়, সেটা এই পেশার শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরির সমান।
ট্যানারি শ্রমিকদের সবশেষ বেতন বাড়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরে। ওই সময় বিভাগীয় শহর ও ঢাকার সাভার এলাকায় অবস্থিত ট্যানারির জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হয় ১৮ হাজার ১ টাকা। অন্যান্য স্থানের ক্ষেত্রে ধরা হয় ১৭ হাজার ৪৮ টাকা।
তবে মজুরি বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে ট্যানারি শ্রমিকদের।
ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ানের দাবিতে গত বছরের শুরুতে আন্দোলনে নামেন ঢাকার সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর বিভিন্ন ট্যানারিতে কর্মরত শ্রমিকরা।
‘কানাডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিসার্চ অন ওয়ার্ক অ্যান্ড হেলথে’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চামড়া খাতে প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষ কাজ করেন। এর মধ্যে ৮৫ হাজার কর্মী আছেন ট্যানারিতে।
এসব ট্যানারি শ্রমিকের শুধু বেতন নয়, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
তাদের ভাষ্য, বেশির ভাগ কারখানায় শ্রম আইন বাস্তবায়ন হয় না। অনেক শ্রমিক নিয়োগপত্র কিংবা ছবিসহ পরিচয়পত্র পান না। স্থায়ী শ্রমিকের কাজ করলেও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় অস্থায়ী শ্রমিকের।
মধ্যস্বত্বভোগী কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ করানো, শ্রমিক ছাঁটাই এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভিযোগও আছে শ্রমিকদের।
একটা ট্যানারিতে মূলত কাঁচা চামড়াকে ‘পাকা’ চামড়ায় রূপান্তর করা হয়। এই কাজের অংশ হিসেবে প্রথম চামড়া পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে হয়। নাসিরদের মতো শ্রমিকরা মূলত এই প্রাথমিক কাজগুলো করে থাকেন।
এসব কাজ করতে তাদেরকে প্রতিনিয়ত নানা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে হয়।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ট্যানারিতে চামড়া মজুদের জন্য একাধিক গর্ত থাকে। প্রায় চার মিটারের একেকটি গর্ত মূলত একেকটি ট্যাংক। এখানে কাঁচা চামড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রাসায়নিকের দ্রবণও জমা থাকে।
শ্রমিকরা বলেন, কাঁচা চামড়া সেই গর্ত থেকে তুলে বাইরে নিতে হয়। দস্তানা, বুট পরা থাকলেও এই কাজ করার সময় রাসয়নিক মিশ্রিত পানির ঝাপটা তাদের শরীরে লাগে। এতে চামড়া পুড়ে যাওয়া, লাল ফুসকুড়ি কিংবা চুলকানির মতো নানা শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে নিজের দুই হাত দেখিয়ে নাসির বলেন, “এক সময় দুই হাতে দগদগে ঘা হয়ে যেত। ওপরের চামড়া বিবর্ণ হয়ে গেছে।
"চোখের সামনেই দেখলাম কত লোক ক্যান্সারে ভুগল। কতজন এসিডে পুড়ল।"
নাসির বলেন, কাজের সময় মালিকপক্ষ মাস্ক, গ্লাভস বা সুরক্ষা চশমা দিলেও কাজের গতি কমার আশঙ্কায় অনেকে তা ব্যবহার করতে চান না।

কিছুদিন আগে হারুন নামে এক ট্যানারি শ্রমিক এসিডের সংস্পর্শে আহত হন। তিনিও নাসিরের মতো ‘ছুটা’ কাজ করতেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সপ্তাহ খানেক আগে তার মৃত্যু হয়।
ট্যানারি শ্রমিকদের কাজের ধরন সম্পর্কে লেদার ইঞ্জিনিয়ার সনেট সরকার বলেন, তাদেরকে কাঁচা চামড়া পরিষ্কার করা, পশম অপসারণ, রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে চামড়া ‘ট্যানিং’ ও রং করা— মূলত এসব কাজ করতে হয়।
তিনি বলেন, এই কাজে তাদেরকে সোডিয়াম সালফাইড, চুন, অ্যামোনিয়াম সল্ট ও ক্রোমিয়ামের মতো রাসয়নিকের সংস্পর্শে আসতে হয়।
এছাড়া বাফিং মেশিন, শেভিং মেশিন, আনহেয়ারিং মেশিন, ফ্লেশিং মেশিন, রোটারি ড্রাম, মিক্সার ড্রাম, ভ্যাকুম মেশিন, স্প্লিটিং মেশিন, ভাইব্রেটর মেশিনসহ নানা যন্ত্রপাতির ব্যবহারও আছে।
গেল বছর ন্যাচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ট্যানারি শ্রমিকরা বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা এবং সীমিত সুরক্ষা ব্যবস্থার কারণে ক্রমাগত স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।
‘বাংলাদেশের ট্যানারি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী অনুসন্ধান’ শিরোনামে সাভারের ৪০০ শ্রমিকের ওপর গবেষণাটি হয়।

গবেষণায় বলা হয়, ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ শ্রমিক নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্বাস্থ্যঝুকি বিষয়ে শ্রমিকদের ধারণা কম থাকার তথ্যও উঠে আসে গবেষণায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, এগুলোর ব্যবহার সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে প্রতিটি ট্যানারিতে স্বাস্থ্য কমিটি আছে। তারা শ্রমিকদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘রাসায়নিক ছাড়া তো চামড়া প্রক্রিয়াজাত হবে না; এটা লাগবেই। শুধু প্রটোকল না মানার কারণে সম্প্রতি একটি কারখানা একজন শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হন। সেটি এড়ানো সম্ভব ছিল।”
স্বাস্থ্য নির্দেশনা মানার ব্যাপারে শ্রমিকদের মধ্যে অনীহা থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘সবাইকে বিশেষ পোশাক, চশমা বা টুপি পরতে বলা হয়। সবই দেওয়া হয় কারখানার পক্ষ থেকে। কিন্তু সবাই তা শোনে না, মানে না।’’
নিয়ম না মানার পেছনে শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের গাফলতি আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দুই পক্ষকেই সচেতন হতে হবে, নিয়মে কড়াকড়ি করতে হবে। এখনো অনেক ট্যানারি আছে, যারা শ্রমিকদের সবকিছু দেয় না, দিতে চায় না। আমরা মিটিংয়ে সেগুলো বলি।’’
শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও রাসায়নিক ব্যবহারের দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে অবহিত করতে মালিকদের পাশাপাশি কিছু এনজিও কাজ করছে বলে জানান তিনি।
রাসায়নিক ব্যবহারে বেশির ভাগ কারখানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলে বলে মনে করেন বিটিএ প্রেসিডেন্ট শাহীন আহমেদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "দু-একটি ছাড়া বাকি কারখানা রাসায়নিক ব্যবহারে নিয়ম-কানুন মেনে চলে।
“ট্যানারিতে রাসায়নিক ছাড়া কাজ সম্ভব নয়, সমস্যা তো থাকবে। যারা পারবেন, তারা কাজ করবেন, যাদের বেশি সমস্যা, তিনি কাজ করবেন না। আমরা ক্ষতির বিষয়টি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার কাজ করছি।"

ট্যানারি শ্রমিকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে কাজ করার পরেও তাদের স্থায়ী করা হয় না। যেসব সুবিধার কথা বলা থাকে, সেগুলো কাগজে-কলমেই থেকে যায়।
এসব বঞ্চনার বিষয়ে বাংলাদেশ শ্রম গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, "স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের কোনো বিধান নেই। ৯০ থেকে ১৮০ দিন কাজ করালে শ্রমিককে স্থায়ী করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মালিকরা ছাঁটাই করার আতঙ্কে রেখে তাদের শোষণ করেন।"
ট্যানারি শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা ছুটি-ছাটাও কম পান। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের অর্থও ঠিকঠাক পান না।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সায়কা কবির জিতি বলেন, “ছুটির দিনে কাজ করালে শ্রমিককে দ্বিগুণ মজুরি কিংবা বিকল্প ছুটি দিতে হবে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, "শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষকে নিজ দায়িত্বে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।"
আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ বলেন, “চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে যেসব রাসায়নিক ব্যবহার হয়, সেগুলোর সংস্পর্শে এলে শ্রমিকদের ফাঙ্গাল, ব্যাকটেরিয়াল ও ভাইরাল সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া কাঁচা চামড়ায় থাকা জীবাণু থেকেও সংক্রমণ হতে পারে।”
“কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশুর চামড়া থেকে অ্যানথ্রাক্সের মতো রোগও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
তিনি বলেন, “ট্যানারিতে কাজের সময় রাসায়নিকের ধোঁয়া (ফিউম) ও ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা চোখ, মুখ ও শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে।”
ক্রোমিয়ামসহ কিছু রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলেও সতর্ক করে দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
“ভালো মানের গ্লাভস, মাস্ক ও চোখের সুরক্ষার জন্য গগলস ব্যবহার করলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে,” বলেন বেনজির আহমেদ।