Published : 25 Apr 2026, 12:46 AM
বাসভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১১ পয়সা বাড়ানোর সরকারি ঘোষণার পরদিন ঢাকার নগর পরিবহনগুলোর চালক-হেল্পাররা অপেক্ষায় আছেন ভাড়ার নতুন তালিকার।
তবে কেউ কেউ তার আগেই সরকারি ঘোষণাকে পুঁজি করে ‘মন মতো’ বাড়তি ভাড়া নির্ধারণ করেছেন; সম্ভব হলে আদায়ও করছেন।
কিছু পরিবহনের বাসে দূরত্বভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি দাবি করতে দেখা গেছে। যাত্রীদের কেউ-কেউ আপত্তি তুললে ‘ঝামেলা এড়াতে’ আগের ভাড়াই আদায় করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর বৃহস্পতিবার বাসের ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা আসে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বেড়ে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা।
অন্যদিকে, দূরপাল্লার পথে বাসভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা হয়েছে।
আর ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ বা ডিটিসিএ এলাকায় (ঢাকার আশপাশে) প্রতি কিলোমিটার বাস ভাড়া ২.৩২ টাকা থেকে বেড়ে ২.৪৩ টাকা হয়েছে।
এই হিসাবে নগর পরিবহনের ভাড়া ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দূরপাল্লার বাস ভাড়া ৫ দশমিক ১ শতাংশ বাড়ল।
শুক্রবার ঢাকার বিভিন্ন রুটের বাস চালকের সহযোগীরা বলেছেন, দুই-এক দিনের মধ্যে নতুন তালিকা হাতে পেলে নতুন ভাড়া কার্যকর হবে।
এদিন ঢাকার গাবতলী-যাত্রাবাড়ী রুটে চলাচলকারী ‘গাবতলী লিংক’ পরিবহনের একটি বাসে চালকের সহকারী মো. সাঈদ বললেন, তিনি দূরত্বভেদে ৫ থেকে ১০ টাকা ভাড়া বাড়তি চাচ্ছেন।
গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত এতদিন ৩০ টাকা ভাড়া আদায় করা হলেও আজ তিনি ৪০ টাকা দাবি করছেন।
তিনি বলেন, “জোরাজুরি নাই, সরকার ভাড়া বাড়াইছে আমরা ৫-১০ টেকা বেশি চাইতেছি। সবাইতো আর দিতেছে না। কাছাকাছি যারা যায়, তারা আগের মতো ১০ টেকাই দিতেছে। একটু দূরে গেলে ৫ টেকা বেশি চাইতেছি।”
নতুন তালিকা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দুয়েক দিনের মইধ্যেই পাইয়া যামু। এহন আন্দাজ কইরা কারো কারো কাছে চাইতেছি। কেউ দিতেছে, কেউ দেয় না। অনেকে চার্ট দেখতে চায়, নতুন চার্ট দিলে সবাই দিতে বাধ্য।”

একই পরিবহনের যাত্রী আরাফাত শ্যামলী থেকে পল্টন যাওয়ার জন্য উঠেছেন। তিনি বললেন, অন্য সময় ২০-২৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো, আজ তার কাছ থেকে ৩০ টাকা নিয়েছে।
তিনি বলেন, “সরকার ভাড়া বাড়াইছে কিলোমিটারে ১১ পয়সা, এখন মুখস্ত ৫ টাকা বেশি দাবি করে বসে আছে। দেখা যাবে মোট ভাড়ায় বাড়বে ১ টাকা বা তার কম, কিন্তু তারা দিনশেষে ওই ৫ টাকাই বাড়তি নিবে। এই দেশে এমনই চলে আসছে।
“এটা নিয়ে কিছু বলতে গেলেই দেখা যাবে এখন ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে। এসব কেউ দেখার নাই, আমাদেরও কিছু বলার নাই।”
ঢাকার সদরঘাট থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা রুটে চলাচল করা ‘আজমেরী গ্লোরি’ পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী জাহিদ বলেন, তারা ধারণা করছেন তাদের পুরো রুটে মোট ১০ টাকা ভাড়া বাড়তে পারে। সে হিসাবে এতদিন সদরঘাট থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত ১৩৬ টাকার ভাড়া বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৪৬ টাকায়।
এতদিন কত টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকারতো নির্ধারণ কইরা দেয় এক হিসাবে, কিন্তু অনেকেই ওই টাকা দিতে চায় না। গাড়িতে ওঠার আগেই অনেকে দামাদামি কইরা ওঠে। আমরা দেখা গেছে ১০০ টাকাও নেই, আবার কারো কাছে দেড়শ টাকাও নেই।”
নতুন ভাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা চার্ট পাই নাই, মনে হয় পুরা ভাড়ার মধ্যে ১০ টাকা বাড়তে পারে।”
তার এই ১০ টাকা ভাড়া বাড়ানোর কথা শুনে ওই বাসের যাত্রী আবু সায়েম পাল্টা জিজ্ঞাসা করেন, “কিলোমিটারে বাড়ছে ১১ পয়সা, তোমার পুরা রুটে ১০ টাকা ক্যামনে বাড়ে?”
তখন ওই পরিবহন শ্রমিকের ভাষ্য, “এহনতো বাড়াই নাই, আগের ভাড়াই নিতাছি। চার্ট আইলেই দেখা যাইবো কতো বাড়ে।”
মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী রুটে চলাচলকারী শিকড় পরিবহনে আগের ভাড়া আদায় করতেই দেখা গেছে। ওই পরিবহনের একজন বলেন, তারা সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে নেন না। নতুন ভাড়া অনুযায়ী তালিকা পাওয়ার পরই সেটি কার্যকর হবে।
পল্টন থেকে মিরপুর, সাভার, উত্তরাসহ বেশকয়েকটি রুটের বাসচালক-হেল্পাররা বলেছেন, নতুন তালিকা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। প্রায় সবারই ধারণা, নতুন তালিকায় ভাড়া বাড়তে পারে ৫-১০ টাকার মতো।
২০২২ সালের অগাস্টে ডিজেলের দাম ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল সরকার। ভাড়া বাড়ানোর ২৫ দিনের মাথায় ২৯ অগাস্ট তা আবার কমানো হয়েছিল; তখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৫ টাকা কমিয়ে ১০৯ টাকা করা হয়।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের ভাড়া ৫ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সরকার। কিন্তু কোথাও সেটি কার্যকর করেননি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা।
এর দুই বছর পর ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম আরও ৩ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১০৬ টাকা। দাম কমানোর পর সেদিন পরিবহনের ভাড়া ৩ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও সেটিও কার্যকর হয়নি।
এর আগে ২০১৬ সালে বাসভাড়া ৩ পয়সা এবং ২০১১ সালেও ২ পয়সা কমানো হয়েছিল। কিন্তু পরিবহনমালিকেরা সেটি মানেননি। সরকারের তরফেও সেটি কার্যকর করতে দেখা যায়নি।