Published : 09 Apr 2026, 08:40 PM
চব্বিশের আন্দোলনের প্রথম দিকে নিহত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে উভয় পক্ষই তাদের অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরে উচ্চ আদালতে আপিলের কথা বলেছে।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষ বৃহস্পতিবার রায়ের পর পৃথক প্রতিক্রিয়ায় আপত্তি জানায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হয়ে ওঠা আবু সাঈদ হত্যা মামলায় এদিন দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন সাজা। অন্য আসামিদেরও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আবু সাঈদের পরিবারের সদস্য ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, রায়ে আরও অনেক আসামির সাজা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর সাক্ষ্যসহ সব কাগজপত্র পর্যালোচনা করে তারা আপিল করবেন।

আসামিপক্ষও রায়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন।
রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন আবু সাঈদের দুই ভাই আবু হোসেন ও রমজান আলী।
আবু হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “আজ যে দুইজন খুনি আছিল তাদেরকে মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনানো হইছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজন আছে তাদের শাস্তি কম হইছে।”
আপিল করবেন কি না- এমন প্রশ্নে বলেন, “আমরা এখনও রায়টা অতটা বুঝিনি। স্যারদের (প্রধান কৌঁসুলিকে ইঙ্গিত করে) সঙ্গে পরামর্শ ও পর্যবেক্ষণ করে ভালোভাবে বুঝে তারপরে আপিল করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। আগে নিজেরা বুঝি, তারপর আমরা আপিল করব।”
রায়ে সন্তুষ্ট কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, “না, আমাদের অসন্তুষ্টির জায়গা হচ্ছে, পুলিশের সদস্যরা গুলি করল, তাদের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে করেছে। কিন্তু যারা ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিল, তাদের কারও ফাঁসি হয় নাই। এ ক্ষেত্রে আমাদের অসন্তুষ্টি আছে। আমরা অবশ্যই এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।”
আবু সাঈদের বড় ভাই ও মামলার বাদী রমজান আলী বলেন, “এই মামলায় যদি ন্যায়বিচার পাই, তাহলে বাংলার মাটিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশের সব মানুষই মনে করে যে, আজ যে বিচার পেয়েছি, তা আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু পুলিশের যারা রংপুরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তাদের সাজা কম হয়েছে, এটা আমাদের মনে হয়।
“ছাত্রলীগের পোমেল বড়ুয়ার (বেরোবি ছাত্রলীগ সভাপতি) ফাঁসি হওয়া দরকার ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে পোমেল বডুয়ার বিচারে আমরা অসন্তুষ্ট।”
অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা বলেন।
তিনি এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং কারাবন্দি রেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলের পক্ষে লড়েছেন।
আজিজুর সাংবাদিকদের বলেন, “ট্রাইব্যুনাল আজ কেবল রায়ের মূল অংশ এবং কার্যকর অংশটুকু পড়ে শুনিয়েছেন। ফলে আসামিপক্ষ থেকে যে ২০টিরও বেশি আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়েছিল, ট্রাইব্যুনাল সেগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করেছেন তা পূর্ণাঙ্গ রায় না পাওয়া পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না।
“নিহত আবু সাঈদের জব্দ করা গেঞ্জিতে কোনো গুলির ছিদ্র ছিল না এবং মরদেহে গুলির কারণে সৃষ্ট কোনো ক্যাভিয়েশন (গর্ত) পাওয়া যায়নি। তাছাড়া মরদেহের কোনো এক্স-রে বা রেডিওস্কোপিক পরীক্ষাও করা হয়নি। ফলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি গুলির অস্তিত্ব। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, যে টুয়েলভ বোর শটগানের কার্তুজ দিয়ে গুলির কথা বলা হয়েছে, সেটিও জব্দ করা হয়নি।”
আসামিপক্ষের এই আইনজীবীর ভাষ্য, সরকারের ক্রয় কমিটির মাধ্যমে কেনা ওই কার্তুজের ‘টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন’ তলবের জন্য তারা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিলেন। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নির্দেশিকায় ওই কার্তুজ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কিনা (নন-হ্যাজার্ডাস), তা যাচাই করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সে নথি আনেননি, যা তাদের মতে পুরো বিষয়টিতে একটি সন্দেহের অবকাশ তৈরি করে।

আসামিদের আংশিক খালাসের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, “এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় পাঁচটি চার্জের সম্মুখীন হয়েছিলেন, যার মধ্যে চারটি থেকেই তারা খালাস পেয়েছেন। কেবল একটি চার্জে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আনোয়ার পারভেজ আপেল বাকি চার্জগুলো থেকে খালাস পেয়ে কেবল একটি চার্জে হাজতবাসকালীন মেয়াদের সাজা পেয়েছেন।”
অধিকাংশ অভিযোগে খালাস পাওয়ার বিষয়টিকে তিনি আসামিপক্ষের যুক্তির আংশিক বিজয় বলে মনে করছেন।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির জন্য বৃহস্পতিবারই আবেদন করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আপিল বিভাগ থেকে তারা ন্যায়বিচার ও আসামিদের সম্পূর্ণ খালাস পাবেন।
এদিন ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের কাকা পীযুষ কুমার রায় উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, “এই রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং এতে সন্তুষ্ট না; কিন্তু মর্মাহত। আমরা দেখলাম যে পুলিশরা সরাসরি (আবু সাঈদের) বুকেই গুলি করতেছে। এটা খুব খারাপ। আমরা সাপোর্ট করছি তা কিন্তু না।
“কী বলব, পরিবারের সব কান্না করছে। তো কিছুই বলতে পারি না, খালি কান্নাকাটিই করি। খালি সান্ত্বনাই দেই।”

রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি চলার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের আইনজীবী স্বাক্ষর নিয়েছেন। কাগজপত্র তুলে এরপর আপিল করা হবে।
সুজনের ভগ্নিপতি অজয় রায় বলেন, প্রকৃত দোষী হলে শাস্তি পাওয়াই উচিত। সে (সুজন) যদি দোষী হয়, শাস্তি পাবে।
তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “ঘটনাস্থলে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। যে গুলি করছে¬–ওর (সুজন) বন্দুক থেকে তা গেছে, না অন্য কারও কাছ থেকে (গেছে)- এটাই প্রমাণের মূল বিষয়।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, “এই ঘটনার মধ্যে সুপেরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি, এইড অ্যান্ড অ্যাবেটমেন্ট, জয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ এবং সেপারেট রেসপন্সিবিলিটি ছিল। এই সমস্ত অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল প্রকাশ্যে আদালতে রায়ের ঘোষণায় উল্লেখ করেছেন। এই মামলায় সর্বমোট ২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
“মামলায় সর্বমোট ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছিল এবং আজকে ৩০ জনকেই দণ্ডিত করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম চার্জ আনা হয়েছিল। তিনজনের বিরুদ্ধে একাধিক চার্জ প্রমাণিত হয়েছে। অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি কাউন্টে চার্জ হলে হয়ত একটিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে এবং অন্যগুলো থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।”
সাজার বিভাজনের বিষয়ে তিনি বলেন, এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্রের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আরিফুজ্জামান জীবন, রবিউল ইসলাম নয়ন ও বিভূতিভূষণ মাধবকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য কাউন্টে তাদের অতিরিক্ত আরও ১০ বছরের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ১০ বছরের সাজা পেয়েছেন হাসিবুর রহমান বাচ্চু, মনিরুজ্জামান বেল্টু, মশিউর রহমান, আসাদুজ্জামান মন্ডল ও পাবেল বড়ুয়া।

পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্তদের তালিকায় আছেন- মারুফ হোসেন টিটু, শাহানুর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, রাফিউল হাসান রাসেল, ইমরান চৌধুরী আকাশ ওরফে দিশা, মাসুদুল হাসান মাসুদ, মাহবুবুর রহমান বাবু, ড. সারওয়ার হোসেন চন্দন এবং শরিফুল ইসলাম।
এছাড়া হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, মনিরুজ্জামান পলাশ, মাহফুজুর রহমান শামীম, ফজলে রাব্বি, আক্তার হোসেন, সেজান মাহমুদ ওরফে আরিফ, ধনঞ্জয় ওরফে টগর, বাবুল হোসেন, নুরনবী মন্ডল, নুর আলম মিয়া এবং একেএম আমির হোসেন ওরফে আমুর প্রত্যেকের তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে।
বক্তব্যের শেষে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী ও ছাত্রলীগ কর্মী আনোয়ার পারভেজ আপেলের ক্ষেত্রে তার হাজতবাসের সময়কালটাকেই দণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন