Published : 30 Jun 2026, 10:38 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটে জিতলেও ‘ঋণ খেলাপি হওয়ায়’ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে সর্বোচ্চ আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে বিএনপি প্রার্থী আসলাম আর চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচিত এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
এখন ওই আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি সেখানে নতুন করে নির্বাচন হবে–আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে তা স্পষ্ট হয়নি।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করে।
আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে নির্বাচন কমিশন।
আসলাম চৌধুরীর পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও রোকন উদ্দিন মো. ফারুক।
ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন ও যায়েদ বিন আমজাদ।
এছাড়া ব্যাংক এশিয়ার পক্ষে আইনজীবী কামাল উল আলম এবং যমুনা ব্যাংকের পক্ষে এ এস এম শাহরিয়ার কবির শুনানি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। রায়ের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায়টি না দেখে এর পরিণতি সম্পর্কে মন্তব্য করা ‘উচিত হবে না’।
“আমার দীর্ঘ দিনের আইন পেশার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, জনগণ তাদের মতামত এবং ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। যিনি প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, একটি আইনি প্রক্রিয়ার কারণে জনগণের মতামতটা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হয়নি। আমি প্রত্যাশা করি, জনগণ তাদের মতামত আবার প্রকাশ করার সুযোগ পাবে।”
তাহলে ওই আসনে উপনির্বাচন হবে কি না প্রশ্ন করলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "হতে পারে।”
নতুন করে নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরী আবার অংশ নিতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠলে তার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই। একজন ব্যক্তির একটা নির্দিষ্ট সময়ের অযোগ্যতা তো আর সারা জীবন থাকবে না। মূল ইস্যুটা ছিল যে, নির্বাচনের মনোনয়নপত্র জমা দানের দিনে তার স্ট্যাটাস কী (ঋণ খেলাপি) ছিল। এইটা হচ্ছে মেইন ইস্যু।
"পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠে যোগ্য হন, তাহলে তার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা থাকার কথা না।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
কিন্তু তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী এবং যমুনা ব্যাংক।
শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ওই আপিল খারিজ করে দিলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।
নির্বাচন কমিশনের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে তখন হাই কোর্টে আলাদা রিট আবেদন করে অভিযোগকারী দুই পক্ষ। গত ২৭ জানুয়ারি হাই কোর্ট শুনানি শেষে রিট আবেদন দুটিও খারিজ করে দেয়। ফলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে।
হাই কোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন জামায়তের প্রার্থী আনোয়ার। গত ৩ ফেব্রুয়ারি তার আপিলের আবেদন মঞ্জুর করে প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ।
আদেশে বলা হয়, আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করা হলেও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী অংশ নিতে পারবেন। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আসনের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না।
অনিশ্চয়তা নিয়ে ভোট করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিককে ৫৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দেন বিএনপির আসলাম চৌধুরী। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ওই আসনের ফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখে। ফলে আসলাম চৌধুরীর শপথ নেওয়াও আটকে থাকে।
সে কারণে ফলাফল প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন আসলাম। অন্যদিকে আনোয়ার সিদ্দিক গত ৩১ মার্চ আপিল আবেদন করেন। ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংকও আলাদা আবেদন করে।
এর ধারাবাহিকতায় আপিল বিভাগে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। ১৫ জুন অ্যামিকাস কিউরি বা আদালত বন্ধু হিসেবে আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীর মতামত শোনে সর্বোচ্চ আদালত।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মঙ্গলবার যে রায় দিল, তাতে আসলাম চৌধুরীর সংসদে যাওয়ার পথ এযাত্রা বন্ধ হয়ে গেল।
রায়ের পর আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী শিশির মনির বলেন, “আপিল মঞ্জুর করার মানে হল আসলাম চৌধুরী অযোগ্য হয়ে গেছেন এবং তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। ঋণখেলাপি হিসেবে তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে, অর্থাৎ তিনি এই নির্বাচনে যোগ্য ক্যান্ডিডেট ছিলেন না।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন ভুলে গিয়েছিল যে ঋণের জামিনদারেরও ঋণগ্রহীতার মত একই দায়দায়িত্ব থাকে, যা আপিল বিভাগ সিদ্ধান্তে দিয়েছে।”
কেন আসলামের প্রার্থিতা বাতিল হল, সেই ব্যাখ্যায় শিশির মনির বলেন, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন।
“আসলাম চৌধুরী ওই দিন ঋণখেলাপি ছিলেন বিধায় শুরু থেকেই তিনি অযোগ্য ছিলেন।”
এই রায়কে একটি ‘মাইলফলক’ ও ‘জ্বাজল্যমান উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন জামায়াতের প্রার্থীর আইনজীবী।
তিনি বলেন, “ঋণখেলাপিদের ওপর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ঋণখেলাপি যে দলেরই হোক না কেন, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ এবং আরপিও অনুযায়ী তিনি নির্বাচন করতে বা নির্বাচিত সদস্য থাকার অযোগ্য। ভবিষ্যতে আইন মেনে চলার বিষয়ে এটি সতর্ক করবে।”
আসলামের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর চট্টগ্রাম-৪ আসনের ক্ষেত্রে এখন কী ঘটবে জানতে চাইলে শিশির মনির বলেন, “প্রচলিত নিয়মে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে পরের জন নির্বাচিত ঘোষিত হয়। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে এবং নির্বাচন কমিশন তা নিষ্পত্তি করবে।”
তিনি বলেন, ইলেকশন ট্রাইব্যুনাল সাধারণত গেজেট প্রকাশের ৪৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু এই মামলায় আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তে গেজেট প্রকাশই স্থগিত ছিল। ফলে পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ‘ভালো সমাধান’।
ফলাফল স্থগিত থাকা প্রসঙ্গে এ আইনজীবী বলেন, “পূর্ণাঙ্গ রায়ের আলোকে ফল প্রকাশিত হবে বলেই এতদিন ফল প্রকাশ স্থগিত ছিল, এখন নির্বাচন কমিশন কীভাবে গেজেট করবে তা পূর্ণাঙ্গ রায় না আসা পর্যন্ত অজানা।”
এমপি না থাকায় এলাকার মানুষের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট ঠিক করবে প্রার্থীর যোগ্যতা আছে কি নেই, জনগণের সুবিধা-অসুবিধা নয়। প্রকৃত অর্থে কেউ ঋণখেলাপি কি না, সেটাই সুপ্রিম কোর্টের দেখার বিষয় এবং সে অনুযায়ী কনসিকোয়েন্স বা পরিণতি হবে। পরবর্তীতে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
“সরকার বা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়ন নির্ধারিত হবে, কিন্তু একজন খেলাপিকে যোগ্য ঘোষণা করা যাবে না।”