Published : 31 Jul 2025, 09:57 PM
সংবিধানের বিদ্যমান চার মূলনীতি বাদ দেওয়ার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বৈঠক ‘বর্জন’ করেছে বাম ধারার চারটি দল।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ২০ মিনিটে বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে দলগুলোর নেতারা বলেছেন, জাতীয় সনদে তারা স্বাক্ষর করবেন কি না তা পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় রাজনীতির ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসে ঐকমত্য কমিশন।
রাতে বৈঠক থেকে বেরিয়ে আসেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহীন হোসেন প্রিন্স,
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান ফিরোজ, বাসদ মার্কসবাদীর সমন্বয়ক মাসুদ রানা।
পরে তারা সংবাদ সম্মেলনে এসে বৈঠক বর্জনের কারণ ব্যাখায় করে তারা বলেন, ঐকমত্য কমিশন সংবিধানের বিদ্যমান চার মূলনীতি বাদ দিয়ে নতুন মূলনীতি সংযোজনের প্রস্তাবে দিয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, এর পক্ষে তাদের সমর্থন না থাকলে ভিন্ন মত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিতে পারেন।
তাদের বলেন, চার মূলনীতি বহাল রেখে নতুন বিষয়গুলো সংযোজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমান বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’ রয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এর বদলে পাঁচটি মূলনীতি সুপারিশ করছে। সেগুলো হল–সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
বামপন্থী দলগুলো বিদ্যমান মূলনীতির সঙ্গে কমিশন প্রস্তাবিত নতুন মূলনীতি যোগ করার পক্ষে, কোনো কিছু বাদ দেওয়ার পক্ষে তারা নয়।
আর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া ‘আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’ রাখার কথা বলে আসছিল। তবে কমিশন এখন যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে তাদের আপত্তি নেই।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি বলেছে, কমিশনের প্রস্তাবের সঙ্গে তারা একমত।
তার আগে রোববার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের ঊনবিংশতম দিনে রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের এক পর্যায়ে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়।
সে দিন মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে বেরিয়ে এসে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “সংবিধানের মূলনীতির প্রশ্নে ঐকমত্য হওয়া সম্ভব না। কারণ এখানে বিভিন্ন আদর্শের মানুষ আছে। এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে যাবে, তারা সিদ্ধান্ত দেবে।
“মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত আমাদের এই সংবিধান অনেক অসম্পূর্ণতা আছে। সেজন্য আমরা আলোচনা করছি, যাতে সম্পূর্ণ করা যায়। কিন্তু মূলনীতির প্রশ্নে ছাড় দেওয়া সম্ভব না।”
বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরে প্রিন্স বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি প্রসঙ্গে এইভাবে লেখা যেতে পারে। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় পরিচালনার চার মূলনীতির সঙ্গে (৭২ এর সংবিধান অনুযায়ী- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র,গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা) সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি যুক্ত করা যেতে পারে।”
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, “আমরা শুরুতেই যখন এখানে রাষ্ট্রের মূলনীতির প্রশ্নটা আসে আমরা এর আগেও গত দুই দিনে সেখানে বলেছিলাম যে, সংবিধানের যে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন সে পরিবর্তনের পক্ষে আমরা না ঐক্যমত্য কমিশনকে সেইটা কেউ রায় দেয় নাই।
“আপনারা জেনে থাকবেন যে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বাইরে বক্তৃতা বিবৃতিতে টেলিভিশনে টকশোতে বিভিন্ন সেমিনারে আলোচনায় সেখানে বলেছে যে সংবিধানটা ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে। মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ। সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান এগুলোকে কবরে ছুড়ে দেওয়া হবে। এই ধরনের কথা বলছে।”
তার মতে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা পরাজিত হয়েছিল, তারা তাদের সেই পরাজয়ের যে গ্লানি এখনো ভুলতে পারেনি। তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে।
মুক্তিযুদ্ধ আকাশ থেকে পড়েনি মন্তব্য করেন ফিরোজ বলেন, গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা জাতীয়তাবাদ প্রত্যেকটা শব্দের কিন্তু আলাদা আলাদা অর্থ আছে তাৎপর্য আছে। পাকিস্তান শাসনামলে ২৩ বছরের যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামের পরতে পরতে সেগুলোর মানে উচ্চারিত হয়েছে। তার ফলেই রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হয়েছিল।
তিনি বলেন, “বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি সেটা বহাল রেখে তার সাথে সাম্য মানবিক মর্যাদা সামাজিক সুবিচার ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি এটা যুক্ত করলে আমাদের কোন আপত্তি নাই।”
সংবিধানের বিদ্যমান চার মূলনীতি বাদ দিয়ে নতুন মূলনীতি সংযোজনের এ দায় দায়িত্ব বাসদসহ বামপন্থিরা নিতে চাননি তুলে ধরে বাসদ নেতা বলেন, “আমরা এই সভা বর্জন করেছি। এইটা যদি বহাল রাখে এই যে জুলাই সনদ সেই সনদে আমরা স্বাক্ষর করতে পারবো কিনা সেটা আমাদের থেকে ভেবে দেখতে হবে। আমরা দলীয় ফোরামে সেটা আলোচনা করব। অসম্ভব হয়ে গেছে। এইটা রাখার পরে আমরা সনদে সেখানে স্বাক্ষর করতে পারবো না।”
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মোস্তাক হোসেন বলেন, “কমিশনে প্রথম থেকেই বলে আসছি যখন এই প্রস্তাবটা আনা হয় এই ধরনের যে বিষয়গুলো আমাদের ঐক্যকে নষ্ট করতে পারে।
“আমি ডিনামাইট হিসেবে উল্লেখ করেছি যে, ডিনামাইট এড়িয়ে আমাদের সামনে যাওয়া উচিত। আমরা যদি এখানে পা দিই আমাদের ঐক্য বিনষ্ট হবে।”
সুকৌশলে রাষ্ট্রীয় বিদ্যমান চার মূলনীতি ঐকমত্য কমিশন তাদের দিয়েই বাতিল করতে চায় দাবি করে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে যদি জনগণ না চায়, সে বিষয়ে আমরা হয়তো আমাদের বক্তব্য দিয়ে রাজনীতি করব, আন্দোলন করব, সংগ্রাম করব, অবরোধ করব, হরতাল করব।”
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহীন হোসেন প্রিন্স বলেন, “আমরা বলেছিলাম এটাকে আলোচনার বাইরে রাখেন, আলোচনার বাইরে রাখেন নাই। আমরা পরিষ্কার করে বলেছিলাম, আমাদের সংবিধানের পার্টে ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্প্রীতি সাম্য মানবিক মর্যাদা সুবিচার অবশ্যই থাকবে, কিন্তু বলতে হবে রাষ্ট্রীয় চার মূল, কারণ এটা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত।”
চার মূলনীতি বাদ দিতে নানা অঙ্কের ঘোর প্যাচ হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি দাবি করেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত বয়ান ‘বাদ দিয়ে অন্য বয়ান দেওয়ার চেষ্টা করেছে’।
বাসদ-মার্কবাদীর সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, “মূলনীতি বাতিলের ক্ষেত্রে যদি আমাদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তো সেটা আমরা মানতে পারব না।”
‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে মুশতাক হোসেন বলেন, “সেই প্রেক্ষিতে আমরা কিন্তু বর্জন করছি। নোট অব ডিসেন্ট দিয়া এই মৌলিক বিষয়ে এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়?” ঐকমত্য কমিশন মূলনীতি পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনা থেকে বাদ দেবে বলে তিনি আশা করেন।
“বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি বাদ দিয়ে অন্য কিছু এখানে প্রতিস্থাপন করা, মুক্তিযুদ্ধের যে প্রকৃত চেতনা এবং একাত্তরের যে যুদ্ধ, শহীদদের প্রতি সেটা অবমাননা, সেটাকে আড়াল করতে চায়।”
এ প্রশ্নে প্রিন্স বলেন, “আমরা প্রথম দিন থেকে বলেছি, নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে এ ধরনের কোনো মৌলিক বিষয় আমরা থাকবো না। এই জন্য বর্জন করে এসেছি।”