Published : 25 Mar 2026, 04:56 PM
জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত ‘এখনো হয়নি’ জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে বড় কোনো সংকটের শঙ্কা তিনি দেখছেন না।
তবে আতঙ্ক থেকে বেশি করে কিনে রাখার প্রবণতা বা ‘প্যানিক বায়িং’ যে সরকারকে চাপে ফেলছে, সে কথা স্বীকার করেছেন মন্ত্রী। আর এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
তারেক রহমানের সরকার এক মাসে কী কী করেছে, সেই খতিয়ান তুলে ধরতে বুধবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন জহির উদ্দিন স্বপন।মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়াতেও পড়েছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।
“দেশে এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে জ্বালানির যে মূল্য আছে, তার সঙ্গেও আমাদের মূল্যের বেশ ব্যবধান আছে।
“অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটা মন্ত্রিপরিষদ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা অন্তত দক্ষতার সঙ্গে এই সময়কার পরিস্থিতিকে একটা সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার মধ্যে এনেছেন। ফলে আমাদের এই মুহূর্তে কোনো সংকট নাই। আশা করি আমাদের সংকটের মোকাবেলা করতে হবে না।”
তবে মানুষের মধ্যে যে এক ধরনের আতঙ্ক আছে, সে কথা তুলে ধরে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “গণমাধ্যমের বিভিন্ন রকম সংবাদ যেহেতু ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে, সে কারণে একটা প্যানিক বায়িং শুরু হয়েছে। এই প্যানিক বায়িংটার কারণে সরকারকে একটা চাপের মধ্যে থাকতে হয়।
“আমাদের দেশের রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে যেহেতু একদল লোক এ ধরনের পরিস্থিতিকে পুঁজি করতে পারে, বা পুঁজি করতে চায়, সে কারণে এই প্যানিক বায়িং মানসিকতার বিরুদ্ধে আপনাদের মাধ্যমে একটা জনসচেতনতা তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।”
তথ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনারা (সাংবাদিকরা) যদি সহযোগিতা করেন, সেক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় এই আতঙ্কিত হয়ে ক্রয় করার যে একটা পরিস্থিতি, এখান থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি সবকিছু চলে, তাহলে আমরা আশাবাদী, আর কোনো সংকট আমাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে না।”
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আপনাদের গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে যে মানুষকে এটা বলার চেষ্টা করা যে প্যানিক বায়িং এবং স্টোরেজ যাতে তারা অতটা না করেন। আর হ্যাঁ, পাম্প পর্যায়ে হয়ত কেউ কেউ স্টোর করার চেষ্টা করছে, আমাদের সরকার সেগুলো একটু দেখার চিন্তা করছে।
“আমি পাম্প মালিকদের উদ্দেশে বলতে চাই, স্টোরেজ করার যদি প্রবণতা কারো থাকে, তারা মনে করছেন যে দাম যে কোনো মুহূর্তে বেড়ে যাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তেলের দাম বাড়ছে না। সুতরাং দাম যেহেতু বাড়ছে না, এই স্টোর করে রাখার প্রবণতা আসলে তাদের জন্য খুব বেশি সুবিধা হবে না।”
‘মব সংস্কৃতি’
এক-এগারোর আলোচিত সেনা কর্মকর্তা, সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মঙ্গলবার আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে একদল লোক তার ওপর ডিম ও ময়লা পানি নিক্ষেপ করে। সেই প্রসঙ্গ ধরে তথ্যমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে ‘মব সন্ত্রাস’ নিয়ে প্রশ্ন করেন একজন সাংবাদিক।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, “মব সম্পর্কে আমাদের সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য খুবই আলোচিত। সবাই আপনারা জানেন আমাদের পজিশনটা কী? তবে আমাদের সকলের মাথায় রাখতে হবে, আমরা যখন একটা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব নিয়েছি, তখন দীর্ঘদিনের একটা বেআইনি প্রেক্ষাপটের উপরে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে দায়িত্বটা পালন করতে হচ্ছে।
“আশা করি, দীর্ঘদিনের যে জঞ্জাল, দীর্ঘদিনের যে অপস্মৃতি আমাদের অনেকের মাথার মধ্যে কাজ করছে, সেখান থেকে আমরা খুব দ্রুতই আইনের জায়গায় ফিরে আসতে পারব। আমাদের সরকার মব সংস্কৃতিকে দমন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।”
‘অপতথ্য’
সোশাল মিডিয়ায় গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, “নতুন ফেনোমেনার কথা বলি, যেটা আমার কাছে খুবই অ্যালার্মিং মনে হয়। আমি বিশ্বাস করি আপনারা গ্রহণ করবেন। প্রতিষ্ঠিত পরিচিত কোনো একটা নিউজ মিডিয়ার মত করে একটা লোগো তৈরি করে একটা ভিন্ন নাম দিয়ে কতগুলো নিউজ দেওয়া হয়, যা একেবারে স্যাটায়ার… এটা মারাত্মক মিস ইনফরমেশন ছড়াচ্ছে।”
“আমি আশা করি, আপনারা আমাদের সাথে একমত হবেন, কেউ স্যাটায়ার করতেই পারে, কিন্তু সেই স্যাটায়ার কোনো প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ার লুকের মত হবে না। আমার কাছে এটা একটা অপরাধ বলে মনে হয়।”
সরকার এ বিষয়ে কাজ করতে চায় জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, “আমরা খুব দ্রুত এটাকে একটা স্ট্রাকচারের মধ্যে নিয়ে আসব। কারণ আমি অনেককে দেখেছি এগুলোকে রেফার করে কথা বলছেন, শেয়ার করছেন সচেতন মানুষ।”
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং তথ্য অধিদপ্তরর ও সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে জনসাধারণের সম্পৃক্ততা জোরদার করতে একটি প্রকল্প নেওয়ার কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। এ প্রকল্পের নাম হবে ‘নিউ মিডিয়ার সর্বোত্তম ব্যবহার ও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান’।
“আমরা একটা নীতিমালা এবং আইনের অধীনে ইফরমেশনকে ডিল করতে চাই। ডিল করা বলতে আমরা খুব মারাত্মক খারাপ কিছু করছি তা না। মানুষকে সচেতন করা। আমরা মানুষকে এটা বোঝাতে চাই যে এটা অন্যায় এবং এটা অপরাধ।”
দশম ওয়েজ বোর্ড কবে?
সাংবাদিকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঠিক করতে দশম ওয়েজ বোর্ড কবে হবে, সেই প্রশ্ন রাখা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, “ওয়েজ বোর্ড আমরা ঠিক করি না, এটা শ্রম মন্ত্রণালয় করে। আমরা এটা ফাইনালাইজ করি না। আমরা শুধু পরামর্শ দিতে পারি, যদি তারা পরামর্শ চান।”
‘ফ্যাসিবাদের দোসররা’ বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আছে, তাদের অপসারণ করা হবে কিনা-এমন প্রশ্ন করেন একজন সাংবাদিক।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আপনি বলেছেন যে বিভিন্ন স্থানে দোসররা আছেন। অবশ্যই সেগুলো হচ্ছে। একজন সাংবাদিক অলরেডি বললেন, নয়টি মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদ শূন্য । এটা থেকে আপনি বুঝতে পারছেন …।”
বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের আধুনিকয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এখানে শুধু যে টেকনোলজিক্যালি, সেটা না। আমাদের কর্মকর্তা এবং ট্রেনিং, সবকিছুই এর আওতায় থাকবে।”
গণমাধ্যমের নানা সমস্যা সমাধানে করণীয় ঠিক করতে গণমাধ্যমের সাথে সংলাপ করার পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেন।
তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানাও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।