Published : 27 Oct 2023, 12:04 AM
ঢাকার সিদ্দিকবাজারে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি পানির গাড়ি, একটি লেডার রওনা হয় ৫টা ১৩ মিনিটে। ওই দুটি গাড়ির সামনে ছিল ফায়ার সার্ভিসের একটি পিকআপ।
সেখান থেকে হাইকোর্ট, মৎস্যভবন, কাকরাইল চার্চ, মগবাজার ফ্লাইওভার পার হয়ে তেজগাঁও আসতেই ফায়ার সার্ভিসের এ গাড়ি বহরের সময় লাগে ঠিক ৩০ মিনিট।
তেজগাঁও থেকে মহাখালী পর্যন্ত ওই বহরের সঙ্গে গিয়ে দেখা গেছে, এইটুকু পথ পাড়ি দিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোকে সড়কে কতটা বাধা পেরুতে হয়েছে; যানজট ঠেলে এগোতে হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকার মহাখালীতে বহুতল ভবন খাজা টাওয়ারে আগুনের খবর পেয়ে তা নেভাতে সঙ্গে সঙ্গেই রওনা দেয় ফায়ার সার্ভিসের ওই দলটি। উঁচুতে ওঠার মই ও যন্ত্রপাতি নিয়ে সিদ্দিকবাজার থেকে ঘটনাস্থলে আসতে সময় লেগে যায় সোয়া এক ঘণ্টা। যদিও এরই মধ্যে আশপাশের স্টেশন থেকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে কাজ শুরু করে।
এদিন পাঁচটার দিকে লাগা এ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। ভবনের ভেতর থেকে অনেক রাত পর্যন্ত ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
আগুন লাগার পরপরই আতঙ্কে নয় তলার বারান্দা দিয়ে নামতে দিয়ে উপর থেকে পড়ে এক নারী নিহত হয়েছেন। তিনি রেইস অনলাইন লিমিটেডের কর্মী। পরে মারা যান আরও দুইজন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। ফায়ার সার্ভিস পুরোদমে কাজ শুরুর পর উপর থেকে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে।
যানজটে জায়গা ছাড়েনি কেউ
সিদ্দিকবাজার স্টেশন থেকে মহাখালীর খাজা টাওয়ারের দূরত্ব ৭ দশমিক ৩ কিলোমিটার। সড়কে প্রচণ্ড যানজট ঠেলে ঘটনাস্থলে আসে ওই গাড়ির বহর। বহরের পেছনে পেছনে আসতে দেখা যায় সড়কে চলাচলকারী অন্যান্য যানবাহনও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ আগুন লাগার খবর পায় ৪টা ৫৯ মিনিটে। সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলের আশপাশের ফায়ার স্টেশনগুলোর দমকল ইউনিট ঘটনাস্থলে রওনা হয় বলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে রাতে জানানো হয়। একই সঙ্গে সিদ্দিকবাজার থেকেও গাড়ি পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়।
আর সিদ্দিকবাজার থেকে রওনা দিয়ে উঁচুতে ওঠার লেডারবাহী গাড়ির এ বহর রওনা হয় বেলা ৫ টা ১৩ মিনিটে। সড়কে জট ঠেলে সেটি ৫টা ৪৫ মিনিটে তেজগাঁও বিজি প্রেসের সামনের সড়কে পৌঁছে। সেখানে দীর্ঘ যানজটে আটকে যায় গাড়িগুলো। ক্রমাগত সাইরেন বাজালেও সামনে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। কারণ সামনে তেজগাঁও-বিজয় সরণি ফ্লাইওভারের সিগন্যাল পর্যন্ত গাড়ির জট।

পিকআপ, লেডার ও পানির গাড়ি থেকে দমকল কর্মীরা একটু পরপর নেমে ছুটে যাচ্ছেন সামনে। সামনের যানবাহন সরিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো যাওয়ার রাস্তা করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সামনের কোনো গাড়িই ডানে-বামে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এক পর্যায়ে একজন দমকলকর্মী লাভ রোড সিগন্যালে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন। সামনের রাস্তা কিছুটা ফাঁকা হলে সিগন্যাল ছাড়ে। অন্য যানবাহনের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোও ওই সিগন্যাল পার হয়ে আসে।
তিব্বত পার হয়ে ৫টা ৫৮ মিনিটে নাবিস্কোর সামনে এসে ফের যানজটে পড়ে এসব গাড়ি।
এসময় কোনো যানবাহন ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে সরে গিয়ে জায়গা করে দিচ্ছিল না। বরং ওই গাড়ির সামনে ফাঁকা পেলে ছোট অন্য যানবাহন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সামনে চলে আসছিল।
নাবিস্কো থেকে মহাখালী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত সড়কের একপাশে দুরপাল্লার বাস রাখা হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় দুই লেইন জুড়ে রাখা এসব বাস। এছাড়া সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে মহাখালীর ওই আগুনে আমতলী থেকে গুলশানের সড়কে যান চলাচল ছিল বন্ধ। এর প্রভাবে আশপাশের সব এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো চলতে আরও সমস্যায় পড়ে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছুতে কত সময় লাগতে পারে জানতে চাইলে লেডারে থাকা ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী বলেন, যানজটে পড়েই অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।
“তেজগাঁও ফ্লাইওভারেও জ্যামে পড়েছিলাম। সিদ্দিকবাজার স্টেশন থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত আসতেই আধাঘন্টা লেগে গেছে। এই জ্যাম ঠেলেই বেশিরভাগ সময় যেতে হয়। আগে পৌঁছাইতে পারলে আগুন নেভানো যায় তাড়াতাড়ি।”
মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের সামনে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাও অন্য যানবাহন সরিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোকে আগে যেতে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, মাইক্রোবাসের চালকা একটু সুযোগ পেলেই রাস্তা আটকে দিচ্ছিল; ফাঁকা জায়গা দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সামনে চলে আসছিল।
সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে মহাখালীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালের সামনে আসে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি তিনটি। আইসিডিডিআরবির সামনে আসে ৬টা ২২ মিনিটে।
মহাখালী রেলক্রসিং সিগন্যালে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা রাস্তা ফাঁকা করে দিচ্ছিলেন। এরই ফাঁকে বলাকা পরিবহনের একটি বাস ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সামনে চলে আসে।
ওই চালকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “খেয়াল করি নাই পেছনে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। আগুন লাগছে কই? আসলে রাস্তায় এত গাড়ি পিছনে কেডা আছে দেখাও যায় না।”
মহাখালী থেকে বনানীর দিকে যেতে সড়কে যানজট থাকায় বনানী থেকে তেজগাঁওমুখী যানবাহন আমতলী সিগন্যালে আটকে দেয় পুলিশ। রাস্তার এক পাশে ফাঁকা হয়ে গেলে মহাখালী কাঁচাবাজারের সামনে থেকে আমতলী হয়ে ঘটনাস্থল পর্যন্ত উল্টোপথে আসে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির বহর।
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সেখানে পৌঁছে এই গাড়ির বহর। সেখানে আগেই পৌঁছে যাওয়া অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয় ওই ইউনিটগুলো।
সাড়ে ৪ ঘণ্টায়ও নিয়ন্ত্রণে আসেনি খাজা টাওয়ারের আগুন