Published : 11 Aug 2025, 10:12 PM
অনিয়ম হলে প্রয়োজনে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখার বিধান যুক্ত করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন।
একই সঙ্গে হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে ভোটের পরও প্রার্থীতা বাতিলের বিধান করাসহ একগুচ্ছ সংশোধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনারদের এ বৈঠকে।
সোমবারের এ সভায় হওয়া অন্যান্য সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে- কোনো আসনে একক প্রার্থী হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়াতে ‘না’ ভোট চালু করা, ভোট
সমান হলে লটারির বদলে আবার নির্বাচনের বিধান করা, প্রার্থীর ব্যয় তদারকির ব্যবস্থা করা।
বৈঠকে আরপিও নিয়ে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করার এসব সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা সাংবাদিকদের বলেছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
এদিন সকালে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে নবম কমিশন সভার মুলতবি বৈঠক হয়। কমিশন সভায় চার নির্বাচন কমিশনার ও ইসি সচিব উপস্থিত ছিলেন। পরে সন্ধ্যায় ইসির সিদ্ধান্ত তুলে ধরতে সাংবাদিকদের সামনে আসেন কমিশনার আবুল ফজল।
আরপিও একগুচ্ছ এসব সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করে আগামী সপ্তাহে সরকারের অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা বলেন তিনি।
আরপিও সংশোধন প্রস্তাবের অধিকাংশই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই করা হয়েছে বলে তুলে ধরেন তিনি।

যত সংশোধনের প্রস্তাব ইসির
>> আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনী যুক্ত (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীসহ কোস্টগার্ডকে রাখা হয়েছে।
>> ইভিএম সংক্রান্ত যাবতীয় প্রভিশন বিলুপ্ত করা হয়েছে।
>> নির্বাচন কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের অবহেলাজনিত যে শাস্তিগুলো আছে সেগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এটা তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে ইসিকে জানাতে হবে।
>>‘না’ ভোটের বিধান করা হয়েছে শুধু একক প্রার্থীর আসনে। ‘না’ ভোটের বিধানটা হবে যদি কোথাও একজন প্রার্থী হয়; বিনা ভোটে নির্বাচিত হবে না। সার্বিকভাবে ‘না’ ভোট নয়।
>> নির্বাচন কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক এবং সংবাদকর্মীদের কেন্দ্রে প্রবেশের বিধান যুক্ত করা হয়েছে আরপিওতে।
>> ফলাফল স্থগিত ও বাতিল নিয়ে যে বিধানগুলো ছিল যেখানে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল বা ফলাফল বাতিল করার যে সক্ষমতা সেটাকে সীমিত করা হয়েছিল। সেটা আবার পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ (অনিয়ম হলে) নির্বাচন কমিশন অবস্থা বুঝে নির্বাচন স্থগিত করা এক বা একাধিক বা সমস্ত আসনের একইভাবে ফলাফল এক বা একাধিক বা সমস্ত আসনের ফলাফল বাতিল করতে পারবে।
>> আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি কার্যকরের বিধান সেটা সন্নিবেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ আরপিওতে এটার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
>> সংবাদমাধ্যম কর্মীরা ভোট গণনার সময় উপস্থিত থাকতে পারবে। তবে শর্ত - গণনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা থাকতে চাইবেন তাদেরকে পুরাটা সময়ব্যাপী থাকতে হবে। মাঝপথে বের হয়ে যাওয়া যাবে না।
>> সমভোট প্রাপ্তদের জন্য আগে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ঘোষণার বিধান বাদ দিয়ে পুননির্বাচনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। যদি সমান হয়ে যায় তাহলে লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের যে বিধান ছিল কমিশন সেটা থেকে সরে এসে বলছে এক্ষেত্রে পুনঃনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
>> বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
>> প্রার্থীদের এ ব্যয়ের অডিটের ব্যাপারটাকে আরো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং আরেকটু একনিষ্ঠভাবে দেখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যেগুলো ব্যত্যয় মনে করা হবে সেগুলোকেই অডিট করবে।
>> ইতোপূর্বে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি পর্যায় থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত এবং প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ৫০ লাখ পর্যন্ত অনুদান বা ডোনেশন নিতে পারত। এটাকে উভয়ক্ষেত্রে লাখ টাকা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই লেনদেন হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়কর রিটার্নে এটা দেখাতে হবে।
>> নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত থাকেন বিশেষ করে পুলিশ এবং প্রশাসনের যাদের বদলি তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ১৫ দিন পর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে করতে হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের ডিআইজিদের অন্তর্ভুক্তি ছিল না, সেটা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
>> কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই ইত্যাদি ব্যবহার করে যেকোন ধরনের মিথ্যাচার বা অপবাদ ছড়ানো ইত্যাদি ব্যাপারে প্রার্থী দল সংস্থা মিডিয়া সংস্থা সবার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান করা হয়েছে।
>> কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দরখাস্ত যদি নাকচ হয় তাহলে ১৫ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেই নির্বাচন কমিশন তাদেরকে পত্র দিবে। অতীতে শুধুমাত্র নাকচ করে চিঠি দেওয়া হতো এবং এই চিঠিটা আদালতে তারা উপস্থাপন করতে পারতেন এবং আদালতে এই কারণগুলো যথাযথভাবে প্রদর্শিত না হওয়ার কারণে অনেকে আবার নিবন্ধন ফেরত পেতেন। ইসি সিদ্ধান্ত নিয়েছে-এতে প্রতিটি কারণ যথাযথভাবে উল্লেখ করা হবে।

>> কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম স্থগিত হলে বা নিষিদ্ধ হলে, নিবন্ধন স্থগিত করার বিষয়টি অস্পষ্ট ছিল। এটা স্পষ্ট করে আরপিওতে যোগ করা হয়েছে।
>> হলফনামায় যদি মিথ্যা তথ্য দেয় তাহলে সেটার ব্যাপারে তদন্ত করে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আরো সুনির্দিষ্টভাবে আরপিওতে সন্নিবেশ করা হয়েছে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও (৫ বছর মেয়াদে) এই সময়কালে যদি হলফনামায় কোনো ধরনের অত্যুক্তি, বিচ্যুতি, মিথ্যা তথ্য যদি হয় তাহলে তদন্ত করে ’রিকল’ করে প্রয়োজনে তার প্রার্থীতা বাতিল করা হবে এবং নির্বাচিত এমপি হলেও আইনের আওতায় আসতে পারেন। এবং তার পদ চলে যেতে পারে। তবে এই পাঁচ বছরের পরে তা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে থাকবে না।
আরও কয়েকটি সিদ্ধান্ত
>> একটি বিষয় যেটা আচরণবিধিতে যোগ হবে দল এবং প্রার্থী প্রার্থীদের সেটা হচ্ছে নারীর প্রতি সম্মান নিশ্চিতের লক্ষ্যে যথাযথ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
>> সংবাদকর্মীদের (পোস্টাল ব্যালটে) ভোট বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, আগামী সপ্তাহে মতামত নিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে বসবে।
>> নিবন্ধনে আগ্রহী ২২ দলের মাঠ পর্যায়ের অফিস-কমিটি যাচাইয়ের তদন্তের সিদ্ধান্ত।
>> ৮২টি আসনের বিষয়ে দাবি-আপত্তি আবেদন পেয়েছে নির্বাচন কমিশন, যা নিয়ে শুনানি করবে ইসি।
>> নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে ইসি। ১৮ অগাস্ট এ প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করে উপস্থাপন করা হবে।
ইসির কর্মপরিকল্পনা
আগামী নির্বাচনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধে কর্মকৌশল নির্ধারণের কাজ করছে ইসি।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল বলেন, “আমরা চাই না, আমাদের ব্যান্ডউইথ কমে যাক বা যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে দিই বা কোনো প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করি। তাহলে আমাদের হাতে কী উপায় আছে?”
এক্ষেত্রে কৌশল হিসেবে ভালো তথ্য দিয়ে খারাপ তথ্যকে কোনঠাসা বা প্রতিস্থাপন করার কর্মপরিকল্পনা করার কথা বলেন তিনি।

তার ভাষ্য, “যেটাকে চিহ্নিত করতে পারব না, আইনের আওতায় আনতে পারব না- তাকে জবাবদিহির আওতায় আনব কীভাবে? তাহলে উপায় হচ্ছে দুটো একটা হচ্ছে কমপ্লিট শাটডাউন অথবা এগুলোকে ওভারপাওয়ার করে দিয়ে ভালো তথ্য দিয়ে এবং সেখানে আপনাদের সহায়তা আমাদের ভীষণভাবে প্রয়োজন। আমরাও স্ট্র্যাটেজি ওয়ার্কআউট করছি আপনাদেরকে নিয়েও আমরা একটা কর্মশালা করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
”আমরা আশা করি এটার মাধ্যমে এই প্রবণতাটাকে ঠেকাতে পারব। মিথ্যাচারকে সত্য কথা দিয়ে আশা করি আমরা প্রতিস্থাপন করতে পারব।”
‘ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিমত নেই’
আরপিও সংশোধনের বিষয়ে ইসির দিক থেকে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটি। তবে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব এলে যেকোনো সময় যুক্ত করা যাবে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল।
এক প্রার্থীর তিন আসনের পরিবর্তে দুটি আসনে ভোট এবং প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে সংশোধনী আনতে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি ইসি।
সেই সঙ্গে ইসির জবাবদিহি নিশ্চিতে সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশের বিষয়ে ইসিরও আপত্তি ছিল; সেসব প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়নি সোমবারের বৈঠকে।
এক প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল বলেন, “আমরা মনে করেছি, এগুলোর সাথে আর ঐকমত্যের কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই, আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ঐকমত্য কমিশনে এর বাইরেও কিন্তু আরপিও রিলেটেড কিছু কিছু প্রভিশন আসতে পারে এবং সংশোধনীর প্রয়োজন হতে পারে। এটা মাথায় রাখতে হবে।”
আরপিও সংশোধনের সময়কালের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি এই সপ্তাহের মধ্যে আমরা এটার খসড়া চূড়ান্ত করে ফেলব; আগামী সপ্তাহে যাতে এটা পাঠিয়ে দিতে পারি।”
ঐকমত্য কমিশন থেকে সিদ্ধান্ত এলে তা নিয়ে ইসির কোনো দ্বিমত থাকবে না বলেও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ব্যাপার আছে সেগুলো আলাদাভাবে যখন আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা জানতে পারব, তখন আমাদেরকে যদি সেভাবে অনুরোধ করা হয় আমরা তখন সেই সংশোধনী উপস্থাপন করব। সেগুলোর বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নাই।”
'না' ভোট ফিরছে একক প্রার্থীর আসনে: ইসি
আরপিও সংস্কারে ইসির কর্তৃত্ব কতটা বাড়বে?
নির্বাচনি আচরণবিধি নিয়ে আরও যেসব প্রস্তাব পেল ইসি
পুরো আসনের ভোট বাতিলের ক্ষমতা চায় ইসি
আরপিও: সংস্কার সুপারিশ নিয়ে কিসে ঐকমত্য, নজর ইসির