Published : 08 Apr 2026, 11:51 PM
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সর্বোচ্চ আদালতের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল।
পূর্ণাঙ্গ এ রায় প্রকাশিত হওয়ার পরদিন বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের ব্যাখ্যার প্রশ্ন জড়িত থাকায় এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাবে রাষ্ট্রপক্ষ।
আপিল চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে হাই কোর্টের রায় কার্যকর হবে না বলেও তুলে ধরেন তিনি।

অপরদিকে এ মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালতকে সহায়তাকারী) ড. শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, রায় প্রকাশের পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে রহিত করা হলে আইনি শূন্যতা তৈরি হবে, যা নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি ও আদালত অবমাননার শঙ্কা তৈরি করতে পারে।
মঙ্গলবার বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাই কোর্ট বেঞ্চ ১৮৫ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে।
রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী বাতিল করে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে রায়ের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অধ্যাদেশ মেনে পৃথক সচিবালয়ও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলোর বিষয় গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি এ অধ্যাদেশ রহিত (বাতিল) করার সুপারিশ করেছে।
এ খবরের কয়েকদিনের মধ্যে হাই কোর্টের রায় আসায় এ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
হাই কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বুধবার সাংবাদিকদের সামনে আসেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং এ বিষয়ে করা রিটের অ্যামিকাস কিউরি শরীফ ভূঁইয়া।

রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “হাই কোর্ট নিজেই কিন্তু এই রায় যে চূড়ান্ত, এটা মনে করেছেন বলে মনে হয়নি। কারণ আমাদের সংবিধানের ১০৩ এর ২(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মামলা নিষ্পত্তির পরও যদি সাংবিধানিক কোনো প্রশ্ন জড়িত থাকে, সেক্ষেত্রে হাই কোর্ট একটা সার্টিফিকেট দেন। এই রায়ের ১৮৪ পৃষ্ঠায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন সার্টিফিকেট চাওয়া হয়েছিল এবং আদালত তা দিয়েছেন।"
আপিল দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "যেহেতু সার্টিফিকেট এটা হাই কোর্ট ডিভিশন দিয়েছে, আমরা এটা সরাসরি আপিল হিসেবে দায়ের করব। চূড়ান্ত বিবেচনায় এই সাংবিধানিক প্রশ্নটি দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সিদ্ধান্ত হবে।"
রায়ের বর্তমান কার্যকারিতা প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, "যেহেতু বিষয়টি আপিলের চূড়ান্ত বিবেচনায় নিষ্পত্তি হবে, আমাদের অভিমত হচ্ছে—এই রায়ের কার্যকারিতাটা এখন থেকেই আসছে না। এটা চূড়ান্ত বিবেচনার পরে কার্যকারিতা আসবে বলে আমি মনে করি।”
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার এ বিষয়কে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব বিষয় হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা এখন যে আপিলটি শুনানি করব, সেটাও কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট করবে। সুতরাং সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্ব বিষয় বিবেচনা করবে এবং সিদ্ধান্ত দিবেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, কোনোভাবেই যেন এমন কোনো প্রশ্ন তৈরি না হয় যে, সুপ্রিম কোর্ট তার নিজস্ব ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে কেউ সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।”
অধ্যাদেশটি রহিত করা হলে কোনো আইনি শূন্যতা বা বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হবে কি না- এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “আমি শূন্যতা হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। এযাবতকালে সচিবালয়ে যে সমস্ত পোস্টিং হয়েছেন, তারা তো সবাই জুডিশিয়াল অফিসার হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। আমি মনে করি না যে বিচার বিভাগের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে। এটি গণতান্ত্রিক সরকার এবং তাদের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রতি কমিটমেন্ট আছে।"
আইনজীবীদের হতাশার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি এটা ফিল করি না। আইনজীবী হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের কাজ হচ্ছে রাষ্ট্রের পক্ষে আইনি সেবা দেওয়া। এটি আমাকে মানতে হবে। অধ্যাদেশ যখন জারি হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয় যে তখন এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা ওই অধ্যাদেশের মধ্যে প্রতিফলিত হয়নি।"
অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার এ রায়কে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন হাই কোর্টে এ মামলায় আদালতকে সহায়তাকারী (অ্যামিকাস কিউরি) শরীফ ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে। অধস্তন আদালতের উপর যদি সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হয়, তাহলে স্বতন্ত্র সচিবালয়টাই সেই ব্যবস্থা।"
তবে অধ্যাদেশ রহিতকরণের উদ্যোগে হতাশা ও শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “রায় রহিতকরণ ব্যাপার নিয়ে আমরা বেশ খানিকটা হতাশ। প্রথমত, এটা কিন্তু বিএনপিরও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল যে অধস্তন আদালতকে স্বাধীন করা হবে। যেহেতু আদালতের একটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে এবং এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের কোনো স্থগিতাদেশ নেই, তাই হাই কোর্টের রায় সবার জন্যই বাধ্যতামূলক।
“স্বতন্ত্র সচিবালয়টা যদি কার্যকর না থাকে, অথবা নির্দেশনার বিপরীতে গিয়ে নিম্ন আদালতের কর্তৃত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকে, তাহলে দুটো জিনিসই এই রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক হবে এবং এতে আদালত অবমাননার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।"
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শরীফ ভূঁইয়া বলেন, “রায়ে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতির বিষয়টি এসেছে। আমরা আদালতের নজরে এনেছিলাম যে ‘জুলাই সনদ’, যেটা সব রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছে, সেখানে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের উপর দেওয়ার ব্যাপারে সবার কমিটমেন্ট করেছে। এই ব্যাপারে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল না।"

অধ্যাদেশ বাতিল হলে সৃষ্ট পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে এই আইনজীবী বলেন, “আদালত আইন প্রণয়নের নির্দেশনা দেননি, বলেছেন স্বতন্ত্র সচিবালয় করতে। অধ্যাদেশটা চলে গেলে বর্তমানে কার্যকর সচিবালয়ের আইনি ভিত্তি সরে যাবে। এই শূন্যতা পূরণে নতুন আইন বা যেকোনো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্ট্রাকচার তৈরি করতে হবে। মোট কথা, এই সচিবালয়টা থাকতে হবে।"
তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের মেয়াদ দুই মাসও হয়নি। এর মধ্যে নির্বাহী, বিচার এবং আইন বিভাগের মধ্যে একটা টানাপোড়েনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। মাজদার হোসেন মামলার চেয়েও ১১৬ অনুচ্ছেদের এই মামলা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি, আপিল বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যাবে, যাতে করে এই দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়।"
বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ অগাস্ট আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ সাতজন একটি রিট করেন।
রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিল আদালত।
হাই কোর্টের মঙ্গলবারের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপরই ন্যস্ত ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী ও পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। হাই কোর্ট এসব সংশোধনী বাতিল করে ১৯৭২ সালের মূল অনুচ্ছেদটি পুনর্বহাল করেছে এবং ২০১৭ সালের বিধিমালাকে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেছে।
এর আগে সংক্ষিপ্ত রায়ের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করে এবং ডিসেম্বরে সচিবালয়ের উদ্বোধন করে জনবল নিয়োগ দেয়।
তবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বর্তমানে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
এক বিল ৩ বার উত্থাপন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ বিল নিয়ে তালগোল
অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে, পৃথক সচিবালয় ৩ মাস