Published : 17 Jul 2026, 05:48 PM
চলতি মৌসুমে উত্তরের জেলাগুলোতে আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায় ২৩ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে; যা মৌসুমের শুরু হিসাবের তুলনায় কম।
কৃষি বিভাগ বলছে, টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে উত্তরের বেশিরভাগ জেলার নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে কিছু এলাকা থেকে পানি নামলেও অনেক কৃষিজমি এখনো তলিয়ে আছে। এতে ধীরগতিতে হচ্ছে আমনের চারা রোপণ।
অপরদিকে এ অঞ্চলে ৫৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধান চাষ করা হয়েছে; যা মধ্য অগাস্ট থেকে ঘরে তুলবেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলছেন, প্রথম দিকে কিছুটা বিলম্ব হলেও অগাস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমনের চারা রোপণ করা যায়। এ ছাড়া গতবারের চেয়ে এবার আমন ধানের চাষ ও উৎপাদন বাড়বে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের উপ-পরিচালকের কার্যালয় থেকে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদীর পানি ফুলে ফেঁপে ওঠার কারণে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় কৃষকরা এখনো চারা রোপণ শুরু করতে পারেনি। আবার কোনো কোনো এলাকায় আমনের চারা রোপণ করা হলেও তা বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

চলতি আমন মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ছয় লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারী জেলায় এক লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর, রংপুরে এক লাখ ৬১ হাজার ৯৫০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৮৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর, গাইবান্ধায় এক লাখ ৩৩ হাজার ৩০ হেক্টর ও কুড়িগ্রামে এক লাখ ২১ হাজার ৬০০ হেক্টর।
এই পরিমাণ জমিতে ৩০ লাখ সাত হাজার ৫৪২ টন ধান (চাল হিসাবে ২০ লাখ পাঁচ হাজার ২৮ টন) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ লাখ ২৪ হাজার ৫২০ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল (এইচওয়াইভি) জাত, ৮৬ হাজার ২০ হেক্টরে হাইব্রিড এবং ১১ হাজার ১০ হেক্টরে স্থানীয় জাতের আমন চাষের পরিকল্পনা রয়েছে কৃষি বিভাগের।
২০২৫ সাল এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আমন চাষ করা হয় ছয় লাখ ২০ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে। চালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ টন। সেই হিসাবে গত বছরের চেয়ে এবার ৯০০ হেক্টর জমিতে বেশি আমন চাষ করা হবে। এ ছাড়া গত বছরের চেয়ে ৮৭ হাজার ৩৫৬ টন চাল বেশি উৎপাদন হবে।
কৃষি বিভাগ বলছে, বুধবার বিকাল পর্যন্ত নীলফামারীতে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর, লালমনিরহাটে ছয় হাজার ৩২০ হেক্টর ও রংপুরে ৯০০ হেক্টর জমিতে আমনের চারা রোপণ করা হয়েছে। ফসলি জমিগুলো বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা আমনের চারা রোপণে মাঠেই নামতে পারেনি।
ডিমলা উপজেলার বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক শফিউদ্দিন বলেন, দুদিন থেকে আবাদি জমি থেকে বৃষ্টির পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। পানি নামলেই আমনের চারা রোপণ শুরু করা হবে।

বাইশপুকুর গ্রামের অপর প্রান্তে লালমনিরহাটের দোয়ানী এলাকার ষাটোর্ধ্ব কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আমরা মাঠে চারা রোপণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
“কিন্তু এবার তিস্তা উজানের ঢলে ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে জমিগুলো তলিয়ে গেছে। ফলে হাল চাষ করা যাচ্ছে না।”
আগামী এক সপ্তাহ বৃষ্টির পরিমাণ কমে গেলে আমনের চারা রোপণ সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা সংলগ্ন রংপুরের গঙ্গাচড়ার কচুয়া এলাকার ৪২ বছর বয়সি কৃষক সন্তোষ চন্দ্র সেন বলেন, “গত বছর এই সময়ে বৃষ্টির অভাবে আমনের চারা রোপণ করতে পারিনি। ফলে শ্যালোমেশিন দিয়ে পানি তুলে চাষ করতে হয়েছে। এবার এত বৃষ্টির পানি যে জমিতে হাল চাষ ও চারা রোপণ করাই যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “আগামী দুই-তিন দিনে বৃষ্টি না হলে ও রোদ্র পাওয়া গেলে জমির পানি নেমে যাবে, তখন আমরা হাল চাষ করে চারা রোপণ করতে পারব।”
নীলফামারী সদরের গোড়গ্রাম হাজিপাড়া গ্রামের ৫৫ বছর বয়সি কৃষক লিয়াকত আলী বলেন, এলাকার উঁচু জমিতে চারা রোপণ চলছে। তবে নিচু জমিতে বৃষ্টির পানি ভরাট থাকায় চারা রোপণে দেরি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, আমনের আগেই উত্তরের পাঁচ জেলায় জুন মাসে ৫৯ হাজার ১৯৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চারা রোপণ করা হয়। এ ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৯ হাজার ১৬১ টন চাল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নানা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

সেইসঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ সম্প্রসারণ, সারের সুষম ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে উন্নতমানের আমন বীজ ও সার বিতরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বোরো ধান কাটার পর আমন ধানের চারা রোপণের মধ্যবর্তী সময় জমির বেশিরভাগ সময় পতিত থাকে। এ সময় কম সেচের পানি ব্যবহার করে স্বল্পমেয়াদি সম্পূরক ফসল হিসেবে আউশ ধানের চাষ বাড়ানো হচ্ছে।

আমন চাষ নিয়ে কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে এ অঞ্চলে অধিকাংশ জমি তলিয়ে আছে। এজন্য আমনের চারা রোপণে দেরি হচ্ছে। তবে অগাস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমনের চারা রোপণ করা যায়।
এ ছাড়া আউশ ধান কাটার পর সেই জমিতেও কৃষকদের আমনের চারা রোপণের পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।