Published : 28 Apr 2016, 01:24 PM
একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক এ ঘটনাকে দেখছেন মানবাধিকারের ‘চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, ভোটার হয়ে থাকলে তাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতেই হবে; শেকল কোনো সমস্যা নয়।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভোটের চর্চায় প্রতিবন্ধীদের জন্য পদ্ধতিগত ক্রুটির বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে বলেছে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা একটি এনজিও।
গত শনিবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের আফজাল উদ্দিন হাই স্কুল কেন্দ্রে শিকল পায়ে ভোট দেন ‘মানসিক প্রতিবন্ধী’ হানিফা (৩৮)।
স্বজনরা বলছেন, প্রায় তিন বছর ধরে দুই পায়ে শিকল বাঁধা হানিফার। শেকল খুলে দিলেই তিনি ‘আক্রমণ করেন’। ভোট দেওয়ার ‘বায়না ধরায়’ হানিফাকে ওইভাবেই কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
কিন্তু ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) পরিচালক মো. আবদুল আলীম মনে করছেন, পায়ে শিকল দিয়ে এ প্রতিবন্ধীকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পরিপন্থি’ কাজ হয়েছে।
ভোট পর্যবেক্ষণ, ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং নির্বাচনী বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার কাজে রয়েছে এই গ্রুপ। দুই ডজন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংগঠন এই মোর্চায় রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তা ফারুখ আহমেদ বলেন, শিকল পরা অবস্থায় ভোট দিতে আইনে কোনো বাধা নেই। আর কোনো ভোটারকে কেউ ‘পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ’ বললেও কাজ হবে না; যদি না আদালত তাকে ‘অপ্রকৃতিস্থ’ ঘোষণা করে।
“ভোটার হয়ে থাকলে তার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উনিও (হানিফা) এ জন্যে ভোট দিতে পেরেছেন। তাকে উপযুক্ত লোকজন সহায়তা করেছেন ভোট দিতে।”
এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে এই নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, সাজাপ্রাপ্ত না হলে জেলখানায় থেকেও প্রার্থী হওয়া যায়। কারা কর্তৃপক্ষ কোনো প্রার্থী বা ভোটারের ভোট দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিলে তাতে বাধা থাকে না।
এ বিষয়ে ইডব্লিউজি পরিচালক আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রতিবন্ধীদের ভোটাধিকার রয়েছে। কিন্তু এভাবে শিকল পরা অবস্থায় একজন মানসিক প্রতিবন্ধীকে ভোট দিতে কেন্দ্রে আনা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানসিক প্রতিবন্ধী বিবেচনায় পায়ে শিকল পরিয়ে কাউকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।”
কীভাবে ওই প্রতিবন্ধী ভোটারকে শেকল পায়ে কেন্দ্রে আনা হলো- তা খতিয়ে দেখে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
“ইসির উচিৎ হবে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা। প্রতিবন্ধীদের মানবাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে যথাযথ সহায়তামূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে,” বলেন আলীম।
হানিফা কালীগঞ্জের জামিরবাড়ি গ্রামের মফিজুল ইসলামের ছেলে।
তার ছোট ভাই রেজাউল জানান, বছর তিনেক আগে কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নের জামিরবাড়ি গ্রামের হানিফার স্ত্রী সংসার ছেড়ে চলে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন হানিফা।
“চিকিৎসার ব্যবস্থা নিলেও অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় বাধ্য হয়ে তার পা দুটো শিকলে বেঁধে রাখতে হচ্ছে।”
অবশ্য ভোট দেওয়ার পর আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন হানিফা। তিনি বলেছিলেন, “ভাইয়ের সহযোগিতায় ভোট দিলাম। খুব ভালো লাগছে।”
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপ সচিব সামসুল আলম জানান, ভোটারযোগ্য নাগরিকরা তালিকাভুক্ত হলে ভোট দিতে পারবেন। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে অপ্রকৃতিস্থ হলে এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা সাপেক্ষে তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
“কে শিকল পরে এলো, নাকি পরলো না- তা বিবেচনার বিষয় নয়। ভোটার হলেই ভোট দিতে পারবেন,” বলেন তিনি।
আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিক ১৮ বছর বয়সী হলে ভোটার হতে পারবেন। যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হলে এবং আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাবে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও ভোটার রেজিস্ট্রেশন কর্মকর্তা ফারুখ আহমেদ বলেন, “কালীগঞ্জের ওই প্রতিবন্ধী ভোটার যদি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে থাকেন, তাহলে এ বিষয়ে আদালতের ঘোষণা নিয়ে আসতে হবে। কেবল সেক্ষেত্রেই তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে। তা না হলে ওই ভোটারকে স্বজনরা নিয়ে এলে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে আমাদের।”
সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক নোমান খান বলেছেন, “দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা অনেক। কেউ ভাবতে পারেন, এরা ভোট না দিলে কী হয়? অনেক দেশেইতো শতকরা ৩০-৩৫ ভাগের বেশি মানুষ ভোট দেয় না, তাতে কী হয়।
“প্রশ্নটা এখানেই। কেউ স্ব-ইচ্ছায় ভোট না দিতে পারেন, কিন্তু পদ্ধতির ক্রুটির কারণে কাউকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করা যায় না।”
‘বাংলাদেশের নির্বাচনে প্রতিবন্ধীদের অভিগম্যতা’ সংক্রান্ত এক গবেষণার বরাত দিয়ে ইডব্লিউজি বলেছে, বাংলাদেশে ১৮ বছর বা এর চেয়ে বেশি বয়সীদের মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা এক কোটি ২১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯১ জন, যার মধ্যে অন্তত ১৭ লাখ তিন হাজার ১৮২ জন বিদ্যমান ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
ইডব্লিউজি পরিচালক আলীম জানান, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে শতকরা ৬ ভাগের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ কোনো নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এদের মধ্যে শতকরা ২২ ভাগ ভোট কেন্দ্রে যেতে পরিবার থেকে কোনো রকম সহযোগিতা পাননি।
এছাড়া দূরত্ব বেশি হওয়ার কারণে শতকরা ১৮ ভাগ এবং পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ার কারণে ১৪ ভাগ প্রতিবন্ধী ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেননি।