Published : 09 Jun 2026, 08:44 PM
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ নিয়ে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নোটিসের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের জনাব মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সুতরাং সবকিছুতে ইসলামের ওপর হাত দেবেন না, দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা মোহাম্মদ শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ অনুযায়ী নোটিস দেন।
নোটিসে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া এবং ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি জানান জামায়াতে ইসলামীর আমির।
এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামী ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা দাবি করেনি; তারা ব্যাংকটিকে ন্যায়নীতির পথে ফেরানোর কথা বলেছে।
“ওই ন্যায়নীতির পথে ফেরত আসার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
তিনি বলেন, “আমরা জামায়াতে ইসলামীর দুঃখ বুঝব না।”
এ সময় কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতা উদ্ধৃত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “ওই আছে না, ‘চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন…বুঝিতে পারে? কী যাতনা বিষে…।”
ইসলামী ব্যাংকে চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে ‘গ্রাহক ফোরাম’ নামে ব্যানারে একদল লোক মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের কার্যালয়ের সামনে কয়েকদিন বিক্ষোভ করে।

শেয়ার মালিকানা প্রকাশের দাবি
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারগুলো ‘ডাকাতি করে কিনে নেওয়া হয়েছে’ বলে বিরোধী দলের উপনেতার বক্তব্যের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ইবনে সিনার (হাসপাতাল) দুই পারসেন্ট শেয়ার ছিল, ব্লক মার্কেটে তারা তিন গুণ দামে শেয়ার বিক্রি করেছে। এটা তো রেকর্ড, পাবলিক লিস্টেড কোম্পানির শেয়ার ব্লক মার্কেটে তিন গুণ দামে বিক্রি করা হয়েছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের নোটিসে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “সেই বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে এই মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
কারা কত শতাংশ শেয়ারের মালিক, তা প্রকাশ করারও দাবি জানান তিনি। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরকে অনুরোধ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শেয়ারহোল্ডাররা তারা কীভাবে খরিদ করেছেন সেটা ভিন্ন বিতর্ক, সেটা দুদকের তদন্ত হতে পারে, মামলা হতে পারে। কিন্তু শেয়ারহোল্ডাররা শেয়াহোল্ডারই।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার কথা
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ব্যাংক কোম্পানি আইনে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করেই ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৪৯ ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে জনস্বার্থ, আমানতকারীদের স্বার্থ এবং ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষায় নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে চেয়ারম্যান থেকে পরিচালনা পর্ষদ পর্যন্ত অপসারণ এবং পর্ষদ বাতিলের ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারে, বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, “আগে আইন পরিবর্তন করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তন করে তারপর আপনারা এই আলোচনায় আসেন। অন্যথায় রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব ক্ষমতা বলে দেশের স্বার্থে, ব্যাংককে রক্ষা করার স্বার্থে কার্যক্রম চালু করবে।”
‘অর্থ পাচারের তদন্ত হওয়া উচিত’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংক ঘিরে অর্থপাচার, ঋণ বিতরণ ও শেয়ার মালিকানার অভিযোগ তদন্ত হওয়া উচিত।
“সমস্ত অর্থপাচারের তদন্ত করা হোক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে করা হোক। যারা বাংলাদেশের টাকা, মানুষের টাকা পাচার করেছে বিদেশে, সকলের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হোক।”
তার মতে, শুধু অভিযোগ করে থেমে গেলে হবে না; তদন্ত করে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প-আরডিএসের অর্থ বিতরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আরডিএস ইসলামী ব্যাংকের একটি ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প। এই প্রকল্পে ৫ হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়, যেখানে নারী গ্রাহকের সংখ্যা বেশি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, ভোটের আগে অনেক নারীকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে এবং আরও টাকা পাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আরডিএস প্রকল্পে আগে ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ৫ অগাস্ট ২০২৪-এর পর নির্বাচনের আগে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর কোনো হদিস নেই।
ইসলামী ব্যাংক থেকে বড় ঋণ বিতরণ নিয়েও সংসদে কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ৫ অগাস্টের পর নাবিল গ্রুপকে ৭০০ কোটি টাকা এলসির বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পরে মালামাল বিক্রি করে ব্যাংকে টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তার ব্যাংক দায় হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। তার বিরুদ্ধে তদন্ত কেন হচ্ছে না?”
এ ছাড়া লানতাবুর গ্রুপকে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা-সিএসআরের অর্থ ব্যবহারের বিষয়েও তদন্তের কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরিচ্যুতি তদন্তের দাবি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকে ‘তকবীর দিয়ে ব্যাংক দখল করার পর’ ৯ হাজার কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের সবাই একটি রাজনৈতিক মতাবলম্বী। তাদের ৫০ শতাংশকে স্থায়ী করা হয়েছে, বাকিদেরও স্থায়ী করার প্রক্রিয়া চলছে।
আরও ১৩ হাজার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “অন্যায্যভাবে যাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের সবাইকে চাকরি ফেরত দেওয়ার জন্য একটা তদন্ত পরিচালনা করা হোক। আর যাদেরকে রাজনৈতিক বিবেচনায় চাকরি দেওয়া হয়েছে, তাদের কয়টা সঠিক নিয়োগ হয়ে গেছে, সে বিষয়েও তদন্ত করা হোক।”
নতুন চেয়ারম্যান নিয়ে অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ‘প্রমাণিত হয়নি’।
“এই অফিসার, এই চেয়ারম্যান যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি, কোনো তদন্ত নাই। যদি নতুনভাবে অভিযোগ আসে, সেটা তদন্ত হবে।”
তিনি বলেন, অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত ওই ব্যক্তি নির্দোষ ধরে নেওয়ার নীতির সুবিধা পাবেন।