কান্না আর শোকে খালিদীকে শেষ বিদায় স্বজনদের
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করা বাসাটিতে শনিবার তিনি লন্ডন থেকে ফিরেছেন মরদেহবাহী গাড়িতে করে কফিনবন্দি হয়ে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসের বাসা থেকে গেল মাসের শেষ সপ্তাহে পাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন বিদেশে। বাসায় তাকে দেখাশোনা করা কর্মীদের বলে গিয়েছিলেন দুদেশ ঘুরে ফিরবেন চলতি মাসের শুরুতেই। তিনি ফিরেছেন, তবে একেবারে ভিন্ন রূপে।
দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বসবাস করা বাসায় তিনি লন্ডন থেকে ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে।
কালচে-লাল রঙা বাসাটির সামনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আসার অপেক্ষায় সকাল থেকেই জড়ো হয়েছিলেন পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী, স্বজন ও সহকর্মীরা। সবার অপেক্ষা তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে শেষবারের মত একনজর দেখা।
ভাইয়ের অপেক্ষায় তিন তলায় বাসার ভেতরে ছিলেন তার একমাত্র বোন। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল থেকে আসা স্বজনদেরও সেখানে দেখা গেল।
বসার ঘরের সোফাগুলো দেখা গেল সাদা চাদরে ঢাকা। টেবিলে রাখা দেশ-বিদেশের বেশ কিছু পত্রিকা। ঘরের দেওয়ালে টানানো তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রিয় পেইন্টিং, শৌখিন নানা জিনিপত্র দিয়ে ঘরটি সাজানো।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী যেভাবে যা রেখে গেছেন, ঠিক সেভাবেই রাখা আছে জানিয়ে তার বোন বলেন, “ভাইয়া, নিজের ঘরগুলো এমনভাবে গুছিয়ে রাখতেন। উনি যেই জিনিসটা যেভাবে রেখে গেছেন ঘরটা ঠিক সেভাবেই আছে।
“ভাইয়া শেষবারের মত উনার পছন্দের এই ঘরটিতে আসবেন। নিজের মত করে ১০ মিনিট তাকে এখানে রাখা হবে। তিনি তার এই ঘরের সঙ্গে শেষবারের মত সময় কাটাবেন। আমরা সবাই নিচে থাকব।”
সংবাদমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া খালিদীর এ স্বজন বলেন, “ভাইয়া একজন সর্বজনীন মানুষ। উনার যে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় যে স্বীকৃতি, তার জাতীয় অবদান যেমন ছিল, তেমনি আমাদের পারিবারিকভাবে ও আমাদের জীবনে উনার অবদান আসলে অনস্বীকার্য, উনি আমাদের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক উনি বজায় রাখতেন। উনি এতটা আন্তরিক ছিলেন, আমাদের অনেক ভালোবাসতেন।”
বেলা সাড়ে ১২টায় মরদেহবাহী গাড়ি এসে প্রবেশ করে বাড়ির নিচের আঙিনায়; সে সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
দুপুর পৌনে ১টায় কফিন তিনতলায় বসার ঘরে নেওয়া হয়। সেখানে পরিবারের স্বজনরাসহ উপস্থিত সবাই দোয়া করেন।
টাঙ্গাইল থেকে এসেছেন ইমরোজ খালিদীর খালাত বোন রাশা নাজিয়া জিশান।
তিনি বলেন, “ভাইয়া একজন সর্বজনীন মানুষ। উনার যে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় যে স্বীকৃতি, তার জাতীয় অবদান যেমন ছিল, তেমনি আমাদের পারিবারিকভাবে ও আমাদের জীবনে উনার অবদান আসলে অনস্বীকার্য, উনি আমাদের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক উনি বজায় রাখতেন। উনি এতটা আন্তরিক ছিলেন, আমাদের অনেক ভালোবাসতেন।”
স্মৃতিচারণ করে তার মামা সাইফুল হুদা তালহা বলেন, ১৯৬৭ সালের ৫ই জুন আমাদের টাঙ্গাইলের নিজ বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল খালেদীর।
“ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিল সে। আমার ভাগ্নেদের মধ্যে ও এমন একজন ছিল, যার নাম শুনলেই মনটা ভালো হয়ে যেত। ও অত্যন্ত ভদ্র ছিল, সবসময় আমাদের সম্মান দিয়ে কথা বলত।
“কাজের ব্যস্ততার কারণে পরে আর বেশি আমাদের বাড়িতে আর যাওয়া না হলেও যোগাযোগ ছিল। আল্লাহ ওকে যেমন সম্মানিত করেছিলেন, তেমনি এখন ওকে জান্নাতবাসী করুন—এটাই কামনা করি।”
পরিবারের আরেক স্বজন সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, “তৌফিক ইমরোজ খালিদী শুধু পরিবারের নন, বরং এক সর্বজনীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
“কাজের সূত্রে যারা তাকে দেখেছেন, তারা জানবেন বয়সে ছোট হলেও সবার প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও স্নেহশীল।”
২১ বছর ধরে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বাসায় কাজ করতেন নাজমা।
তিনি বললেন, “উনি অনেক ভালো ছিলেন, উনি এই বাসায় আসার ৩ মাস পর আমি এখানে কাজে আসি। উনি স্যার না, আমার জন্য বাবা। সন্তানের মত দেখেছে। দোয়া পড়ছি শুধু যেন জান্নাতবাসী হয়।”
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মরদেহ তার কর্মস্থলে পৌঁছায় শনিবার দুপুর ১২টায়। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে তার কফিন গ্রহণ করেন ভাতিজা তারাফ তাজিজ খালিদী ও ভাগনি-জামাই আকিফ আহমেদ।
সেখান থেকে সরাসরি তার মরদেহ নেওয়া হয় মহাখালীতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অফিস প্রাঙ্গণে। সেখানে প্রয়াতের সাবেক ও বর্তমান সহকর্মীরা তার প্রতি সম্মান জানান; তাকে বিদায় জানায় তার প্রিয় ‘নিউজরুম’।
ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, তার মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এরপর ৮ অক্টোবর জোহরের নামাজের পর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেইন মসজিদে খালিদীর জানাজা হয়। সেখানে সাবেক সহকর্মী এবং স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত তার মরদেহ রাখা হবে বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে। বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা সেখানে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। বেলা ৩টায় সেখানেই তার জানাজা হবে।
পরে বিকাল ৫টায় মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হবেন সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।
