Published : 10 Jun 2026, 03:10 PM
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া গোলাপি আভার মহিষ ‘ডনাল্ড ট্রাম্পকে’ চিড়িয়াখানায় নেওয়ার পর থেকে তার ‘জীর্ণ দশা ও রুগ্ণ হয়ে যাওয়ার’ কথা ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
একসময় খামারির আদর-যত্নে পালিত হওয়া প্রাণীটি চিড়িয়াখানায় অযত্ন-অবহেলা আর খাবারের কষ্টে থাকার কথাও বলছেন কেউ কেউ।
যদিও জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সেসব নাকচ করে বলছেন, মহিষটিকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার ও অন্যান্য ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তার ‘যত্ন-আত্মীর ঘাটতি নেই’।
দশ মাস ধরে নারায়ণগঞ্জের রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালিত-পালিত হয়েছে রাজশাহী সিটি হাট থেকে কেনা বিরল অ্যালবিনো প্রজাতির এ মহিষটি। চুলের ধরণ ও মুখের অবয়ব মিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো দেখতে হওয়ায় মহিষটির নাম রাখা হয়েছিল ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’।
‘ডনাল্ড ট্রাম্পকে’ কোরবানির জন্য কোরবানির ঈদের দুদিন আগে ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ক্রেতার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। গোলাপি আভার শরীরে নীল মখমলের আলখাল্লা জড়িয়ে, ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে, রঙিন ধোঁয়া উড়িয়ে এবং লাল গালিচায় হাঁটিয়ে বিদায় দেওয়া হয় মহিষটিকে।

প্রাণীটির ভিডিও ও ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পরে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর কোরবানির ঈদের আগের দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে মহিষটি প্রাণে রক্ষা পায়। সেটিকে পরে নেওয়া হয় জাতীয় চিড়িয়াখানায়।
ঈদের ছুটিতে চিড়িয়াখানায় বাঘ-সিংহের আকর্ষণকেও হার মানায় ‘এল-০৭’ নম্বর ব্লকে রাখা মহিষটি। সেটিকে একনজর দেখতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, মহিষটির জন্য আরামদায়ক পরিবেশ দেওয়া হয়েছে। থাকার জন্য প্রায় ৪০ ফুট প্রস্থ ও ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি গাছপালা ঘেরা শেড তৈরি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখা যায়, মহিষটিকে গোসল করানো হচ্ছে। দুই পাশে চলছে দুটি স্ট্যান্ড ফ্যান। সামনে দেওয়া হয়েছে খাবারের গামলা। মশা থেকে রেহাই পেতে রয়েছে মশারি।
চিড়িখানার কর্মী আজগর আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মহিষটা এখন ভালো আছে। মাঝে গরমে একটু সমস্যা হয়েছে, এখন ফ্যান লাগানো হয়েছে। আর সর্বক্ষণ ওর সঙ্গে কেউ না কেউ থাকছে।”
চিড়িয়াখানার পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাদা মহিষটির শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, তার ‘বেশিরভাগই অবাস্তব’।
“চিড়িয়াখানার নিয়ম অনুযায়ী মহিষটিকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়। তার স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভালো এবং প্রাণীটি সুস্থ আছে।”
পরিচালক বলেন, “মেলানিনের পরিমাণ কম থাকায় এটি সূর্যের তাপ ও অতিবেগুনি রশ্মির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। আবার ঘর্মগ্রন্থির কার্যকারিতাও তুলনামূলক কম হওয়ায় শরীর থেকে তাপ বের করার সক্ষমতা কম থাকে।
“এ কারণে তাকে তুলনামূলক শীতল পরিবেশে রাখার চেষ্টা করছি। দিনে কয়েকবার গোসল করানো হচ্ছে, দুটি ফ্যান দিয়ে সার্বক্ষণিক বাতাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাদের তাপ সরাসরি নিচে নেমে আসা ঠেকাতে ইনসুলেশনও দেওয়া হয়েছে।”
মহিষটির খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রয়োজনীয় খাদ্যতালিকা পুষ্টিবিদের পরামর্শে নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে সে প্রতিদিন প্রায় ২৫ কেজি কাঁচা ঘাস, পাঁচ কেজি খড় এবং ৫ পাঁচ কেজি দানাদার খাবার খাচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করছে।”

মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরে পরিচালক বলেন, “চিড়িয়াখানা শুধু প্রদর্শনীর স্থান নয়, এটি শিক্ষা ও গবেষণারও কেন্দ্র। অন্যান্য প্রাণীর মতই সাদা মহিষটিকেও এখানে রাখা হয়েছে। জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রাণীটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এর জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে।
“আমরা দেখতে চাই সাদা মহিষের মধ্যে এমন কোনো জিনগত বৈশিষ্ট্য আছে কি না, যা দেশের মহিষ উন্নয়ন কর্মসূচি বা উৎপাদন ব্যবস্থায় কাজে লাগতে পারে। এর কোনো অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে কি না, সেটিও গবেষণার মাধ্যমে জানার চেষ্টা করা হবে।”
শুরুর দিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে মহিষটিকে দেখার যে প্রবল আগ্রহ ছিল, এখন আর তেমনটি নেই। দর্শনার্থীর ভিড় কমলেও তাদের আনাগোনা এখনো আছে।
মঙ্গলবার সন্তানকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা জায়েদ আনসারি বলেন, “আগে একবার এসে দেখে গিয়েছিলাম ট্রাম্পকে। আজ (মঙ্গলবার) সময় পাইনি। আসলে এত বড় এরিয়া যে, সব ঘুরে কূলকিনারা করা যায় না।”
চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসা মিরপুরের এনায়েত কায়সার বলেন, “বাসার কাছেই চিড়িয়াখানা, তাই মেয়ে আবদার করলেই নিয়ে আসতে পারি। ঈদের দিন থেকে যতবার এসেছে, একবারের জন্যে হলেও সে এই মহিষটাকে দেখবেই।”
আরো পড়ুন-