Published : 10 Jun 2026, 06:25 PM
এক যুগ আগে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ‘হত্যার’ অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেসরকারি চ্যানেল একাত্তর টিভির সম্প্রচার লাইসেন্সসহ আনুষঙ্গিক নথিপত্র তলব করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোজাম্মেল হক বাবু ও একাত্তর টিভির সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা এ মামলার আসামি।
তদন্তের স্বার্থে নথি তলবের কথা তুলে ধরে গত সোমবার ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
তদন্ত সংস্থার সহ-সমন্বয়ক মুহম্মদ শহীদুল্যাহ্ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এই চিঠির বিষয়টি বুধবার সামনে আসে। মূল চিঠির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার এক পাতার একটি আবেদনপত্রও।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্ট ১৯৭৩’-এর ৩(২) ধারায় ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কর্তৃক ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনা করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতেহ্ মো. ইফতেখারুল আলম। ওই তদন্তের স্বার্থেই সরকার প্রদত্ত ৭১ টিভির লাইসেন্সের কপি এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক নথিপত্র চেয়ে তিনি আবেদন করেছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তার ওই আবেদনের প্রেক্ষিতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য টিভি চ্যানেলটির বারিধারা কার্যালয়ের সিইও বরাবর চিঠিটি পাঠিয়েছে তদন্ত সংস্থা। বিষয়টি ‘জাতীয় গুরুত্ব’ বিবেচনায় একাত্তর টিভি কর্তৃপক্ষের ঐকান্তিক ও সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

গেল ৮ জুন এ মামলায় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপাকে এক দিনের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদনে সাড়া দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১০ অগাস্ট দিন ধার্য করেছে আদালত।
শাপলা চত্বরের ওই ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চলতি বছরের ১৪ মে দীপু মনি, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এই মামলায় গ্রেপ্তার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক এবং সাবেক উপমহাপরিদর্শক মোল্যা নজরুল ইসলাম।
অন্য আসামিদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার ‘পলাতক’ আছেন।
শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে এখন পর্যন্ত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।”
এই ৫৮ জনের পরিচয় তারা শনাক্ত করতে পেরেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
নারী ও শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে ২০১০ সালে আত্মপ্রকাশ করা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে। ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ডাকা ওই সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা ও তাণ্ডব চলে। ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের শাপলা চত্বর থেকে সরানো হয়।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাতের অভিযানে ৬১ জন নিহত হয়। তবে তৎকালীন পুলিশের দাবি ছিল, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি এবং দিনভর সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ১১।
জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, লেখক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ইমরান এইচ সরকারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
এর আগে গত বছরের মে মাসে শাপলা চত্বরের ঘটনায় জলিল মণ্ডলসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলায় তিনি ২ নম্বর আসামি এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তাকে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফারজানা রূপাকে আটক করা হয়। একই বছরের ৮ অগাস্ট একাত্তর টিভি কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়।
অপরদিকে ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্তের কাছে গ্রেপ্তার হন মোজাম্মেল বাবু।