Published : 12 Jun 2026, 04:31 PM
চার দিন পরই একটি টেস্ট। এই সিরিজে এরপর টেস্ট আছে আরও একটি। প্রস্তুতিতেই এখন ব্যস্ত থাকার কথা কেন উইলিয়ামসনের। কিন্তু এসব প্রস্তুতি বা মাঠের লড়াই, জয়-হারের সমীকরণ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সব অধ্যায়েরই সমাপ্তি টেনে দিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের মাঝপথেই অবসরের ঘোষণা দিলেন নিউ জিল্যান্ডের সর্বকালের সফলতম ব্যাটসম্যান।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর খেলবেন না উইলিয়ামসন। ৩৫ বছর বয়সী কিংবদন্তির অবসরের ঘোষণা কার্যকর এখন থেকেই। সিরিজের বাকি দুই টেস্টের জন্য বদলি ক্রিকেটারের নাম শিগগিরই ঘোষণা করবে নিউ জিল্যান্ড।
নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বেশ আগেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন উইলিয়ামসন। গত নভেম্বরে অবসর নিয়েছেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে। অন্য দুই সংস্করণেও খুব নিয়মিত ছিলেন না বেশ কিছু দিন ধরে। বোর্ডের সঙ্গে ‘ক্যাজুয়াল’ চুক্তির আওতায় ম্যাচ খেলছিলেন বেছে বেছে। তার পরও এই অবসরের ঘোষণা অনেকটাই চমকপ্রদ ও অপ্রত্যাশিত।
অবসর ভাবনা নিয়ে গত ডিসেম্বরে তিনি বলেছিলেন, ‘সিরিজ বাই সিরিজ' চিন্তা করে এগোবেন। তবে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের একটি চক্র যেহেতু শেষ হবে আগামী বছর এবং বছরের শেষ নাগাদ আছে ওয়ানডে বিশ্বকাপ, অন্তত ততদিন খেলা চালিয়ে যাবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি নিজে শুনে ফেলেছেন বেলা শেষের ডাক।
ইংলিশদের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে লর্ডসে আউট হন তিনি ০ ও ১৮ রানে। নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের বিবৃতিতে উইলিয়ামসন বললেন, নিজের সঙ্গে জোর করে খেলা চালিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়নি তার।
“বেশ কিছুদিন ধরেই এটা নিয়ে ভাবছিলাম। কিন্তু গত কয়েকদিনে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে সঠিক সময় এখনই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতি তীব্র তাড়না ও ক্ষুধা আমার সবসময়ই ছিল এবং এটায় আমি গর্ব খুঁজে নেই যে, নিউ জিল্যান্ডের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে নিজের সর্বস্ব দিয়েছি। এর চেয়ে কম কিছু নিয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়াটা ঠিক হতো না এবং নিজের চাওয়ায় সরে দাঁড়াতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।”
“এই দলের গতিপথ নিয়ে আশাবাদী হয়েই বিদায় নিচ্ছি। প্রচুর প্রতিভা আছে এখানে এবং বিশেষ কিছু করার একটা সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। টা এমন একটা দল, যেটিকে আমি ভালোবাসি এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে এর অংশ হতে পেরে নিজেকে অবিশ্বাস্যরকমের ভাগ্যবান মনে করি। সবসময়ই আমার হৃদয়ের কাছাকাছি থাকবে এই দল।”
এই দলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা প্রায় ১৬ বছরের। তবে নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটে পরিচিতি পেতে শুরু করেন তিনি আরও অনেক আগেই। ১৪ বছর বয়স থেকেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তার নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে দেশের হয়ে খেলেন তিনি। পরের বছরই দেশের হয়ে মাঠে নামেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।
ওয়ানডেতে প্রথম দুই ম্যাচেই শূন্য রানে বিদায় নেন তিনি। তবে চতুর্থ ম্যাচেই শতরানের দেখা পেয়ে যান বাংলাদেশের বিপক্ষে মিরপুরে। ২০ বছর ৬৭ দিন বয়সের সেই ইনিংসটি এখনও নিউ জিল্যান্ডের ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরির রেকর্ড।
ওই বাংলাদেশ সফরে পরের মাসেই ভারত সফরে পেয়ে যান টেস্ট ক্যাপ। টেস্ট অভিষেক রাঙান আহমেদাবাদে দারুণ এক সেঞ্চুরি করে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ক্রমে হয়ে ওঠেন কিউই ব্যাটিংয়ের স্তম্ভ। একসময় নিজেকে তুলে নেন বিশ্বসেরাদের উচ্চতায়। ভিরাট কোহলি, স্টিভেন স্মিথ, জো রুটের সঙ্গে তাকে জুড়ে নিয়েও ওই প্রজন্মের 'ফ্যাভুলাস ফোর' বলা হতো তাদের।
একসময় নিউ জিল্যান্ডের অধিনায়কত্বও পান এবং সেখানেও নিজেকে নিয়ে যান দেশের ইতিসে অনন্য উচ্চতায়। তার নেতৃত্বে ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলে স্রেফ বাউন্ডারির সংখ্যায় ট্রফি পায়নি দল। তার অধিনায়কত্বেই প্রথম আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হয় কিউইরা, প্রথমবার আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ের শীষেও ওঠে। নিউ জিল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসেরই সেরা সাফল্য মনে করা হয় সেটিকে।
এছাড়াও তার নেতৃত্বে ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রানার্স আপ হয়েছে দল, সেমি-ফাইনালে খেলেছে ২০১৬ ও ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এবং ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে।
পারফরম্যান্স-পরিসংখ্যান-রেকর্ড-অর্জন, সবকিছুই স্বাক্ষ্য দেবে নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটে তার শ্রেষ্ঠত্বের। ১১০ টেস্টে ৯ হাজার ৫১৫ রান নিয়ে শেষ হলো তার টেস্ট ক্যারিয়ার। তার দেশের অন্য কেউ করতে পারেননি ৮ হাজার রানও। সেঞ্চুরি তার ৩৩টি। আর কারও নেই ২০টি। তার ব্যাটিং গড় ৫৪.০৯। দশটির বেশি টেস্ট খেলা কিউই ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ৪৮ গড় নেই আর কারও।
ওয়ানডেতে তার ১৫ সেঞ্চুরি ও ৭ হাজার ২৫৬ রান নিউ জিল্যান্ডের চতুর্থ সর্বোচ্চ। টি-টোয়েন্টিতে ১৮ ফিফটিতে তার ২ হাজার ৫৭৫ রান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১৯ হাজার ৩৪৬ রান, ৪৮ সেঞ্চুরি, ১০৩ ফিফটি, কোনো কিছুতেই তার ধারেকাছে নেই নিউ জিল্যান্ডের কেউ।
এসব রেকর্ড পরিসংখ্যানের বাইরেও নিউ জিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটস্যান হিসেবে তাকে মানেন না, এমন লোক কমই আছে।
এক সময় অফ স্পিন বোলিংও ভালোই করতেন তিনি। পরে আর হাত ঘোরাননি তেমন। তবু তার ঝুলিতে আছে তিন ৭৩টি আন্তর্জাতিক উইকেট।
স্লিপ থেকে শুরু করে মাঠের যে কোনো পজিশনে ফিল্ডার হিসেবেও তিনি ছিলেন দুর্দান্ত। তার ২১৭ ক্যাচ দেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ।
তার অধিনায়কত্বেব ৪০ টেস্টের ২২টি জিতেছে নিউ জিল্যান্ড, ওয়ানডেতে জিতেছে ৯১ ম্যাচের ৪৬টি। দুটিতেই তার ওপরে আছেন কেবল স্টিভেন ফ্লেমিং (৮০ টেস্টে ২৮ জয়, ২১৮ ওয়ানডেতে ৯৮ জয়)। টি-টোয়েন্টিতে শীর্ষে আছেন উইলিয়ামসনই (৭৫ ম্যাচের ৩৯টি জয়)।
২০১৫ সালে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি, ২০১৯ সালে পেয়েছিলেন বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের পুরস্কার। নিউ জিল্যান্ডের বর্ষসেরা ক্রিকেটারের খেতাব 'স্যার রিচার্ড হ্যাডলি মেডেল' জিতেছেন রেকর্ড চারবার।
এই সবকিছুর বাইরে তার বড় প্রাপ্তি ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে সম্মান ও সমীহ। জেন্টেলমেন'স গেম-এ সত্যিকারের ভদ্রলোক মনে করা হয় তাকে। ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বিতর্কে তেমন জড়াননি বললেই চলে। স্থিতধি মানসিকতা ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি মিলিয়ে তিনি প্রকৃত আদর্শ এক ক্রিকেটার।
নিউ জিল্যান্ড কোচ রব ওয়াল্টারের বিবৃতিতেই ফুটে উঠল যেন উইলিয়ামসনের সবটুকু।
"কেনের সঙ্গে যারা কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তারা জানেন যে সে অত্যন্ত বিশেষ এক ক্রিকেটার ও ব্যক্তি। আমার জন্য যদিও তা খুব স্বল্পস্থায়ী ছিল, তবু তাকে কাজ করতে দেখা এবং দল ও খেলাটি সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনা ও মতামত শোনাটা ছিল পরম এক সৌভাগ্য।"
"তার পরিসংখ্যান এবং ব্যাটিং স্কিলই তার হয়ে কথা বলবে, কিন্তু এই ব্ল্যাকক্যাপস দলের জন্য এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য তার যে অবদান - সেটাই হবে তার লেগ্যাসি। এই দলের সংস্কৃতি এবং মানের উপর তার প্রভাব এর ডিএনএ-র সঙ্গে মিশে থাকবে। কেন সবসময় দলকে সবকিছুর আগে রেখেছেন এবং যদিও তার চলে যাওয়ায় আমরা হতাশ, তবু আমরা এটা জেনে খুশি সিদ্ধান্তটি নিয়ে সে সন্তুষ্ট ও শান্তিতে আছে। অবিশ্বাস্য ক্রিকেটার সেরা, অসাধারণ সতীর্থ, চমৎকার এক নেতা এবং আমাদের এই খেলার জন্য দুর্দান্ত এক দূত।”