Published : 12 Jun 2026, 04:27 PM
নীল নদের অববাহিকায় তপ্ত মরুভূমির বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম- গিজার গ্রেট পিরামিড। প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বছর ধরে ঝড়, বৃষ্টি, রোদ আর মানুষের তৈরি কত সভ্যতা ধ্বংস হতে দেখেছে এ বিশাল স্থাপত্য, তার ইয়ত্তা নেই।
কিন্তু যে প্রশ্নটি আধুনিক প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের দশকের পর দশক ধরে ভাবিয়ে তুলছে তা হলো- এত দীর্ঘ সময় ধরে বহু ভূমিকম্প ও ভূকম্পন সহ্য করে কীভাবে অটল দাঁড়িয়ে আছে এ কাঠামো? যেখানে আধুনিক অনেক বহুতল ভবন কয়েক দশকেই ধসে পড়ে, সেখানে ২৩ লাখ পাথরের এই স্তূপ কীভাবে টিকে আছে?
সম্প্রতি মিশরীয় ও জাপানি বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ গবেষণা এ রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পিরামিডের ভেতরে ও বাইরে কম্পনের ফ্রিকোয়েন্সি বা স্পন্দন পরিমাপ করেছেন। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য: প্রাচীন মিশরীয় নির্মাতারা পিরামিডটিকে এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যে, এটি ভূমিকম্পের বিধ্বংসী শক্তির বিরুদ্ধে নিজের ভেতর কম্পন ছড়িয়ে ক্ষয় রোধ করতে পারে।
পিরামিডের সহনশীলতা বুঝতে হলে ১৯৯২ সালের অক্টোবরের সেই বিধ্বংসী দিনটির কথা মনে করতে হবে। কায়রো থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে আঘাত হেনেছিল ৫.৯ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প। মুহূর্তের মধ্যে কায়রো ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়, ধসে পড়ে অসংখ্য আধুনিক দালান এবং প্রাচীন অনেক মসজিদের মার্বেল কাঠামোতে দেখা দেয় গভীর ফাটল। এমনকি রাজাদের উপত্যকা বা ‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস’-এর প্রাচীন সমাধিগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও গিজার গ্রেট পিরামিড বা খুফুর পিরামিড দাঁড়িয়ে ছিল এক অজেয় পাহাড়ের মতো। গবেষক মোহাম্মদ আল-গাবরি জানান, এত বড় ভূমিকম্পেও পিরামিড থেকে মাত্র একটি পাথর খসে পড়েছিল। এই ঘটনাটিই বিজ্ঞানীদের মনে কৌতূহল জাগিয়ে দেয়, কী এমন জাদু আছে এই স্থাপত্যে?
সম্প্রতি ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কায়রোর ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিক্স এবং জাপানের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তারা ‘অ্যাম্বিয়েন্ট ভাইব্রেশন অ্যানালাইসিস’ নামে একটি অ-ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করে পিরামিডের প্রায় ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে কম্পনের তথ্য সংগ্রহ করেন।
বিজ্ঞানীরা রাজা ও রানির কক্ষ, পিরামিডের ভেতরের টানেল এবং একদম নিচের ভূগর্ভস্থ কক্ষে সেন্সর বসিয়ে দেখেন, ভূমিকম্প বা বাতাসের চাপে পিরামিডটি কীভাবে সাড়া দেয়। গবেষণার সহ-লেখক আসেম মোস্তফা জানান, এই স্থাপত্যটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্তভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে। এটি অনেকটা সুর করা কোনো বাদ্যযন্ত্রের মতো, যা কম্পনের বিরুদ্ধে টিউনড করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, পিরামিডের নিজস্ব রেজোনেন্স বা কম্পন হার ২ থেকে ২.৬ হার্টজের মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, পিরামিডের পাথর থেকে পাথরে কম্পন খুব সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, পিরামিড যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটির কম্পন হার ০.৬ হার্টজ।
প্রকৌশল বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো স্থাপনার কম্পন হার যদি মাটির কম্পন হারের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, তবে ভূমিকম্পের সময় সেই স্থাপনাটি দুলতে দুলতে ভেঙে পড়ে, একে ‘রেজোনেন্স এফেক্ট’ বলা হয়। কিন্তু খুফুর পিরামিড এবং এর নিচের মাটির কম্পন হার আলাদা হওয়ায়, মাটির কম্পন পিরামিডের ভেতরে প্রবেশ করার পর তা দুর্বল হয়ে যায়। এটি পিরামিডকে মাটির বিধ্বংসী ঝাঁকুনি থেকে রক্ষা করে।
সুইজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ আহমেদ এলদোসুাকি বলেন, “পিরামিডের প্রতিটি অংশের মধ্যে যে ধারাবাহিক কম্পন দেখা গেছে, তা এক অসাধারণ স্থিতিশীল কাঠামোর প্রমাণ দেয়। সেই যুগে কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এমন নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি করা ছিল অকল্পনীয়।”
পিরামিডের ভেতরে ‘কিংস চেম্বার’ বা রাজার কক্ষটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর ছাদের ওপর পাঁচটি বিশেষ স্তর বা ‘রিলিভিং চেম্বার’ বা ওজন কমানোর কক্ষ রয়েছে। এতদিন ধারণা করা হতো, এগুলো কেবল ওপরের কোটি কোটি টন পাথরের ওজন কমানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে অন্য কথা। এই রিলিফ চেম্বারগুলো আসলে ভূমিকম্পের সময় এক ধরনের ‘শক অ্যাবজরবার’ হিসেবে কাজ করে। যখন মাটির কম্পন ওপরের দিকে ওঠে, এই চেম্বারগুলো সেই শক্তিকে শুষে নেয় বা কমিয়ে দেয়। ফলে রাজার কক্ষ এবং পিরামিডের মূল কাঠামো কোনো বড় ধরনের ফাটল থেকে বেঁচে যায়। প্রাচীন প্রকৌশলীরা জানতেন কীভাবে শক্তির বিন্যাস ঘটিয়ে একটি কাঠামোকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হয়।
এই অসাধারণ কারিগরি দক্ষতা কি একদিনে এসেছিল? মোস্তফা মনে করেন, এটি ছিল শত শত বছরের অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে শেখার ফসল। খুফুর আগে তার পিতা স্নোফেরু এবং পূর্বসূরী জোসার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন।
সাক্কারার ‘স্টেপ পিরামিড’ বা ধাপ পিরামিড ছিল নির্মাণের প্রথম ধাপ। কিন্তু সব পিরামিড খুফুর পিরামিডের মতো সফল হয়নি। যেমন, ফারাও আমেনেমহাট-এর তৈরি ‘ব্ল্যাক পিরামিড’ বা কালো পিরামিড মূলত কাদা-মাটির ইট দিয়ে তৈরি হয়েছিল। খরচ কমাতে গিয়ে এর স্থায়িত্ব বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে আজ সেটি ধ্বংসের মুখে। আবার ফারাও জেদেফ্রে পাহাড়ের ওপর পিরামিড বানিয়েছিলেন, কিন্তু পাথরের ব্লকের সঠিক বাঁধুনি না থাকায় তা টিকেনি।
খুফুর পিরামিড তৈরির সময় নির্মাতারা কোনো আপোশ করেননি। তারা বিশাল বিশাল চুনাপাথর এবং গ্রানাইটের ব্লকগুলোকে একে অপরের সাথে গেঁথেছিলেন, একে বলা হয় ‘ইন্টারলকড’ যা ভূমিকম্পের সময় কাঠামোটিকে বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না।
গিজার পিরামিড আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ‘প্রাচীন’ মানেই অনগ্রসর নয়। ৪ হাজার ৬০০ বছর আগে যখন কোনো কম্পিউটার সিমুলেশন বা সিসমোগ্রাফ ছিল না, তখনও মানুষ প্রকৃতির নিয়মকে এমন নিপুণভাবে বুঝতে পেরেছিল যা আজকেও আমাদের বিস্মিত করে। হয়তো খুফু তার অমরত্বের আকাঙ্ক্ষায় এ পিরামিড গড়েছিলেন, কিন্তু সেই অমরত্ব কেবল তার নামে নয়, বরং মিশরের সেই নাম না জানা স্থপতিদের অসামান্য মেধা আর প্রজ্ঞার মাঝেও টিকে আছে।