Published : 20 Jan 2026, 07:30 PM
দুই বছরের আগে বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যাবে না, ভাড়াটিয়ারা যে কোনো সময় বাসায় ঢুকতে পারবেন, ভাড়াটিয়াকে দিতে হবে মূল ফটক ও ছাদের চাবি। এমন নিয়ম রেখে রাজধানীর ‘ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিশ্চিতে’ ১৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন- ডিএনসিসি।
এ বিষয়ে জানাতে মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসি ভবনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ এর আলোকে এ নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ঢাকা মহানগরে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে বাড়ির সংখ্যা ২০–২৫ লাখের বেশি নয়।
ফলে শহরের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশই ভাড়াটিয়া। গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন, ব্যক্তিগত অভিবাসন এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রীক হওয়ায় এই শহরের ওপর চাপ বাড়ছে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, একটি শহরে মানুষের আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ যদি আবাসনে ব্যয় হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। কিন্তু ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে।
নির্দেশিকায় যা আছে
১. বাড়ির মালিক অবশ্যই তার বাড়ি বসবাসের উপযোগী করে রাখবেন।
২. বাড়িতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ, দৈনিক গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহসহ অন্যান্য সব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাকে জানাবেন এবং বাড়িওয়ালা দ্রুত সেই সমস্যার সমাধান করবেন।
৩. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া (বাড়িওয়ালার অনুমোদন সাপেক্ষে) বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং বাড়ির সামনের উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়ন (ফুল/ফল/সবজি) করবেন।
৪. অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ইত্যাদি নানা ধরনের মনুষ্য সৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে প্রাণহানি ও সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালা তার প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকে ছাদের ও মূল গেটের চাবি শর্তসাপেক্ষে দেবেন।
৫. ভাড়াটিয়া মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাড়িওয়ালাকে ভাড়া দেবেন। বাড়িওয়ালাদের অবশ্যই প্রমাণ কপি হিসেবে ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসে মাসিক ভাড়ার লিখিত রশিদ দিতে হবে এবং প্রতি মাসের ভাড়া দেওয়ার সময় ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালার কাছ থেকে ভাড়াপ্রাপ্তির স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রশিদ নেবেন।
৬. ভাড়াটিয়ার যে কোনো সময়ে বাড়িতে প্রবেশের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। বাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই ভাড়াটিয়াকে অবগত করবেন এবং বাস্তবায়নের আগে মতামত নেবেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ভাড়া বাড়ানোর সময় হবে জুন-জুলাই।
৮। দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। দুই বছর পর মানসম্মত/দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সাপেক্ষে ভাড়ার পরিবর্তন করা যাবে।
৯। নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়াটিয়া ভাড়া দিতে ব্যর্থ হলে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে মৌখিকভাবে সতর্ক করবেন এবং নিয়মিত ভাড়া দেওয়ার জন্য তাগাদা দেবেন। তাতেও কাজ না হলে বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে সমস্ত বকেয়া প্রদান করে দুই মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার জন্য লিখিত সতর্কতামূলক নোটিস দেবেন। ভাড়াটিয়ার সঙ্গে আগে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করে উচ্ছেদ করতে পারবেন।
১০. আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার চুক্তি বাতিল করতে হলে দুই মাসের নোটিস দিয়ে উভয় পক্ষ ভাড়া চুক্তি বাতিল করতে পারবেন।
১১. মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করা ও ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
১২. বাড়িওয়ালার সঙ্গে লিখিত চুক্তিতে কী কী শর্তে ভাড়া দেওয়া হল এবং করণীয় কী, সেসব নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। চুক্তিপত্রে ভাড়া বাড়ানো, অগ্রিম জমা ও কখন বাড়ি ছাড়বেন, তা অবশ্যই থাকতে হবে।
১৩. বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় ১ থেকে ৩ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।
১৪. সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটিয়াদের সমিতি গঠন করতে হবে। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ে ভাড়ার বিবাদের সালিসে থাকবেন।
১৫. যে কোনো সমস্যা ওয়ার্ড/জোনভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি এবং ভাড়াটিয়াদের সমিতির আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। যদি সমাধান না হয়, পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জানাতে হবে।
১৬. ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ নিয়ন্ত্রকের পক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রদত্ত নির্দেশিকা ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালাদের মেনে চলার জন্য সচেতন করতে হবে এবং এ ব্যাপারে কোনো জটিলতার সৃষ্টি হলে সিটি করপোরেশনের জোনভিত্তিক মতবিনিময় ও আলোচনা সভা করতে হবে।