Published : 18 Jul 2024, 01:57 AM
শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাত দিনের পাশাপাশি রাতের ভাগেও গড়িয়েছে; রাজধানীর শনির আখড়ায় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের সময় বিক্ষোভে যোগ দেওয়া আশপাশের মানুষ রাতে আগুন দিয়েছে টোল প্লাজায়।
বুধবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধৈর্য ধরার আহ্বান উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এর নতুন কর্মসূচির মধ্যে মধ্যরাতে আবার শনির আখড়ার সংঘর্ষ পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়।
দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় পাশের যাত্রাবাড়ী এলাকাও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আহত অনেককে নেওয়া হয়েছে হাসপাতালে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে ক্রমেই সহিংসতা বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের ‘শাটডাউনের’ কর্মসূচি উদ্বিগ্ন করেছে নগরবাসীকে।
সরকারপ্রধানের বিচারবিভাগীয় তদন্তের ঘোষণা, জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি এবং ছাত্রসমাজ আদালতে ন্যায়বিচার পাবে, এমন আশাবাদের পরও সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে শিক্ষার্থীদের কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় রাজধানীতে বায়তুল মোকররমের দক্ষিণ গেইটে সমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের।
অপরদিকে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে ‘সর্বাত্মক’ সমর্থন দিয়েছে বিএনপি।
পুলিশও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মত সহিংস কর্মকাণ্ড পরিহার করতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছে।
সরকারি চাকরিতে কোটার বিরোধীতায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এ আন্দোলনকে ঘিরে গত দুই দিনের প্রাণঘাতি সহিংসতা যাতে আর না ঘটে সেজন্য এদিন সন্ধ্যায় ধৈর্য ধরতে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, আমাদের ছাত্রসমাজ উচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচারই পাবে, তাদের হতাশ হতে হবে না।”
সরকারপ্রধানের এমন আহ্বানের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ’কমপ্লিট শাটডাউনের’ নতুন কর্মসূচি নিয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের মধ্যে দেশজুড়ে কঠোর এ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন সমন্বয়কারীদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তার নিজের জায়গা থেকে সহমর্মিতা না দেখিয়ে এখন তিনি কীভাবে আমাদের কাছে ধৈর্য আশা করেন?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ”প্রধানমন্ত্রী তার নিজের জায়গা থেকে সহমর্মিতা না দেখিয়ে এখন তিনি কীভাবে আমাদের কাছে ধৈর্য আশা করেন? একটি প্রেস ব্রিফিং করলেন, আর ছাত্রসমাজ সব ভুলে যাবে?"
এমন প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির সব কোটা বাতিল করেছিল সরকার। হাই কোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করে কোটা ফিরিয়ে আনার রায় দিলে চলতি মাসের প্রথম দিন থেকে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়।
শুরুতে অবস্থান কর্মসূচি, সড়ক অবরোধ, বাংলা ব্লকেডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিদাওয়া জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্যের পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
গত সোমবার দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে মঙ্গলবার সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা। এদিন দুই পক্ষের শক্ত অবস্থানে দুপুরের পর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। দফায় দফায় সংঘাতের এসব ঘটনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং রংপুরে ৬ জন মারা যান এবং আহত হন কয়েকশ মানুষ।
আগের দিন নিহত এসব ব্যক্তিদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল কর্মসূচি পালনে ক্যাম্পাসে জড়ো হয় কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা। সেখানে তাদের পাশাপাশি অদূরে ছাত্রলীগ ও পুলিশের অবস্থান উত্তেজনা ছড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও হল ছাড়তে না চাওয়া নিয়েও মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়।
পরে পুলিশ-র্যাব-বিজিবির লাঠিপেটা, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের মুখে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়। ক্যাম্পাসের দিকের পরিস্থিতি আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে।

তবে এদিন বিকালে শনির আখড়ায় শুরু হওয়া দফায় দফায় সংঘর্ষ রাত ৯টার কিছু আগে আবার বাড়তে থাকে। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও কাদুনে গ্যাস আতঙ্ক ছড়ায় সড়কে চলাচলকারী মানুষ ও স্থানীয়দের মধ্যে।
কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘাতের খবরের মধ্যে শনির আখড়ায় সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে বিকাল ৫টার দিকে। সেখানে আশপাশের মানুষ বিক্ষোভ দেখানোর সময় পুলিশের ওপর ‘অতর্কিত হামলা’ চালায়। পরে রাতে দ্বিতীয় দফা সংঘাতের সময় আগুন দেয় টোল প্লাজাসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে।
এর আগে দিনের বেলায় কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের অবরোধ ও বিক্ষোভের সময় সংঘাত, জ্বালাও-পোড়াও এর ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে আহত হয়ে অনেকে হাসপাতালে গেলেও এদিন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহীসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীদের জোর করে বের করে দিয়েছে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। টিয়ার শেলের ঝাঁজালো গন্ধ, রাবার বুলেট আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে প্রকম্পিত হয়েছে ক্যাম্পাসগুলো। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীরা আহত হয়েছে।
আগের দিনের সংঘাতে ছয়জন নিহত হওয়ার পর বুধবার আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী আরও কঠোর হয়। নিয়মিত পুলিশ ও দাঙ্গা দমনে নিয়োজিত পুলিশের পাশাপাশি আর্মড পুলিশ, র্যাব ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংঘাতময় এলাকাগুলোতে দেখা গেছে।

এদিন দুপুরের পর থেকে দফায় দফায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘাতে আহত হয়ে শিক্ষার্থী সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যপক সংঘর্ষ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকজন শিক্ষককে দীর্ঘসময় অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে তাদের ছাড়িয়ে নিয়ে যায় পুলিশ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্যসহ শিক্ষকদের অবরুদ্ধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যসহ ৩৫ জন শিক্ষককে এডমিন ব্লকে অবরুদ্ধ করে বাইরে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয় আন্দোলনকারীরা। সন্ধ্যা ৭টার সময় র্যাব-পুলিশ- বিজিবি যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। ৪৫ মিনিটের সমন্বিত অভিযানে আউটার সার্কেলে পুলিশ টিয়ারসেল এবং ফাঁকা রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ঢাকার বাইরে গাইবান্ধায় আন্দোলনকারীরা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও আগুন দেয়। এ সময় তারা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিকসহ ১০-১১ জন নেতাকর্মীকে মারধর করে আহত করে।

বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে আন্দোলনকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। সান্তাহারে রেললাইন অবরোধ করলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরের কয়েকটি জেলার রেল যোগাযোগ কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
সংঘাত হয়েছে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ঝিনাইদহ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও জামালপুরে।
অগ্নিগর্ভ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে যেতে বলা হয়। নির্দেশের আগেই সকাল থেকে আতঙ্কে হল ছাড়া শুরু করে শিক্ষার্থীরা। তবে নির্দেশনা আসার পরই জিনিসপত্র ও ব্যাগ নিয়ে হল ছাড়েন অনেক শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখগুলো দিয়ে সাংবাদিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ।
আন্দোলনকারীদের টিএসসি মোড়ে ‘গায়েবানা জানাজা’ কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে দুপুরে টিএসসি মোড়ে রোকেয়া হলের সামনেও দাঙ্গা দমনের সরঞ্জাম নিয়ে দুই পথ আটকে দাঁড়ায় পুলিশ। পুলিশ টিএসসি মোড়ে কাউকে দাঁড়াতে না দিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীরা।
টিএসসির বদলে উপাচার্য ভবনের সামনে সাড়ে ৩টার দিকে গায়েবানা জানাজার প্রস্তুতি নেয় আন্দোলনকারীরা। পৌনে ৪টার দিকে নীলক্ষেত, মল চত্বর এবং ফুলার রোড থেকে তিনটি মিছিল সেখানে আসে। পুলিশ ব্যারিকেডের মধ্যে চারটার পর গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা প্রতীকী কফিন ধরে শপথ করেন।
জানাজা শেষে পেছনের পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙ্গে টিএসসির দিকে কফিন মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে গুরুদুয়ারা নানকশাহীর সামনে পুলিশ দুদিক থেকে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এরপর দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিপরীতে ইট পাটকেল নিক্ষেপের মধ্যে শিক্ষার্থীরা কলা ভবন, মল চত্বরসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যায়।
পুলিশের অ্যাকশনের মুখে শিক্ষার্থীরা উত্তরপাড়ার হলের দিকে চলে যান। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে শিক্ষকরা এসে দুপক্ষকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ সময় রাবার বুলেটের আঘাতে আহত ২ জনকে হাসপাতালে নিতে দেখা গেছে।
শিক্ষার্থীদের হল ছাড়া শুরুর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরপাড়ার হলগুলোতে সংঘর্ষ থামলেও ৬টার পর দোয়েল চত্বর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। বেশ কিছু সময় ধরে সেখানেও সংঘাত চলে।

ক্যাম্পাসের ভেতরে সংঘর্ষের শেষ দিকে টিএসসিতে ডিবি সদস্যদের একটি দল নিয়ে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) হারুন অর রশীদ। বিকাল ৫টার দিকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৬টার মধ্যে হল ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদেরকে এখানে আসার অনুমতি দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হল না ছাড়লে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের তিনটি হলে রয়ে যাওয়া কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়। তবে বাকি হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা চলে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ, আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে সংঘাতের বিচারবিভাগীয় তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈয্য ধরার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আমার বিশ্বাস, আমাদের ছাত্রসমাজ উচ্চ আদালত থেকে ন্যায়বিচারই পাবে, তাদের হতাশ হতে হবে না।”
হামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, যারা হত্যাকাণ্ড ও লুটপাট, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে এরা যেই হোক না কেন তারা যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“আমি আরও ঘোষণা করছি হত্যাকাণ্ডসহ যে সকল অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে, সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে সে সকল বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হবে।”
তবে আন্দোলনকারীরা চাপের মুখে হল ছাড়লেও বৃহস্পতিবার তারা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ নামে নতুন কর্মসূচি দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর রাত পৌনে ৮টার দিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ নিজের ফেইসবুক আইডিতে কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
তিনি সেখানে লিখেন, “শুধু হাসপাতাল ও জরুরি সেবা ব্যতীত কোনো প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলবে না, অ্যাম্বুলেন্স ব্যতীত সড়কে কোনো গাড়ি চলবে না। সারাদেশের প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানাচ্ছি আগামীকালকের কর্মসূচি সফল করুন।”
প্রধানমন্ত্রীর ধৈর্য্য ধরার আহ্বান এবং আশ্বাসবাণীর পরেও কেন এ কর্মসূচি জানতে চাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা মনে করি, সরকারপ্রধান বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশের ছাত্র সমাজের উপর গুলি চালানোর সাহস করত না। সেখানে একটা যৌক্তিক আন্দোলনে গতকাল ৬ টা লাশ পড়েছে।
"আজকে প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, এমনকি হলের ভেতরে ঢুকে গুলি চালিয়েছে। এই নারকীয়তা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ হয়েছিল। এগুলো এখন রিপিট হচ্ছে।৷ প্রধানমন্ত্রী তার নিজের জায়গা থেকে সহমর্মিতা না দেখিয়ে এখন তিনি কীভাবে আমাদের কাছে ধৈর্য আশা করেন? একটি প্রেসব্রিফিং করলেন, আর ছাত্র সমাজ সব ভুলে যাবে?"
বন্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কীভাবে কর্মসূচি পালন করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা নিয়ে আমরা ভাবছি। আমাদের সমন্বয়কদের সঙ্গে কথা বলে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করব।”

মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের নামে ‘নাশকতা, সরকার পতনের অপচেষ্টা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করার’ প্রতিবাদে ঢাকায় সমাবেশের ডাক দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা-শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় বায়তুল মোকররমের দক্ষিণ গেইটে এই সমাবেশ হবে।
সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা-শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে সমাবেশের ঘোষণা দেন।
ওই সম্মেলনেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে রাজাকার বলেন নাই। তার কথাকে বিকৃত করে তারা (আন্দোলনকারীরা) স্লোগান দিচ্ছে। তাদের আসল চরিত্র তারা প্রকাশ করেছে। ”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর ভাষ্য, আন্দোলন বা কোনো কিছু দাবি করার অধিকার স্বাধীন দেশে যে কারোরই থাকতে পারে।
“কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী ছাত্রদল, ছাত্র শিবির ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের হলগুলোতে তছনছ করেছে।”
পরিষদের আহ্বায়ক শাজাহান খান আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “কোটা ব্যবস্থা নিয়ে আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা আদেশের পরে হাই কোর্ট বিভাগের রায়ের কোনো কার্যকারিতা বর্তমানে নেই। এরপরও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলমান থাকার যৌক্তিকতা নেই।”
তার অভিযোগ হল, শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে ‘অনুপ্রবেশকারী ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরের ইন্ধনে’ ৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
বিএনপির সমর্থন
এদিকে রাতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ডাকা শাটডাউন কর্মসূচিতে ‘সর্বাত্মক‘সমর্থন দিয়েছে বিএনপি।
দলটির স্থায়ী কমিটি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বুধবার রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে রিজভীর অভিযোগ করেন, “শিক্ষার্থীদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ ও সশস্ত্র ছাত্রলীগের হিংস্র আক্রমণে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আজও (বুধবার) আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর র্যাব-পুলিশ-বিজেপির ব্যাপক হামলায় অনেকেই আহত হয়েছেন।
”এই রক্তাক্ত হামলায় বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা বৃহস্পতিবারের সারা দেশে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিতে সর্বাত্মক সমর্থন জানানো হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা যে কর্মসূচি দিয়েছে, তাতে বিএনপি সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছে।”
একই সঙ্গে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে দেশের আপামর জনগণকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানি্য়ে রিজভী বলেন, “আমি বিএনপির পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিতে জনগণকে অংশগ্রহণ করার জন্য জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি।”
এর আগেও কয়েক দফা আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন দিয়ে তাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে বিএনপি।

শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান পুলিশের
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মত সহিংস কর্মকাণ্ড পরিহার করতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
বুধবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাগুলো পুলিশ ‘যথেষ্ট ধৈর্য, সহনশীলতা এবং পেশাদারির’ সঙ্গে মোকাবেলা করছে।
"যে কোনো দাবি আদায়ের নামে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, সম্পদ বিনষ্ট করা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না।"
আন্দোলনকারীদের ’কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অবস্থান থেকে তাদের সরে আসার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ‘গুজবে কান না দিতে’ সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে পুলিশ সদরদপ্তরের বিবৃতিতে।
সেখানে বলা হয়, “চলমান কোটাবিরোধী আন্দোলনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
ঢাকা মহানগরে ১৬ প্লাটুন আনসার মোতায়েন
কোটা আন্দোলনকে ঘিরে বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঢাকা মহানগরে ৪০ জন নারী আনসার সদস্যসহ ১৬ প্লাটুন আনসার মোতায়েন করেছে করা হয়েছে। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বুধবার রাতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ তথ্য দিয়েছে।
গায়েবানা জানাজা: রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হওয়ার চেষ্টা, ছত্রভঙ্গ করল পুলিশ
ঢাবিতে হলছাড়া ছাত্রলীগ নেতারা, কক্ষে ভাঙচুর
ঢাকায় বৃহস্পতিবার মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ
কোটা আন্দোলন ঘিরে দেশজুড়ে সংঘাত, ঝরল প্রাণ
শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান পুলিশের
ছাত্র রাজনীতি ‘নিষিদ্ধের' অঙ্গীকারনামায় প্রাধ্যক্ষদের সই নিয়েছে ঢাবির হলের শিক্ষার্থীরা