Published : 23 Apr 2026, 07:36 PM
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষাখাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে কিনা, তা যাচাই করে শ্বেতপত্র প্রণয়নের কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
একইসঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে শিক্ষায় ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ছিল কিনা, তাও পর্যালোচনা করার কথা বলেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে পাবনা-৫ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুলের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেছেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এদিনের বৈঠকে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত শিক্ষাখাতে ‘সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির’ বিষয়গুলো পর্যালোচনায় সরকার নীতিগতভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে ওই সময়ের সম্ভাব্য অনিয়ম, দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাগুলো যাচাই-বাছাই করে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করা যায়।
মন্ত্রী বলেন, তদন্ত ও যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে শ্বেতপত্র প্রণয়ন ও প্রকাশের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্তের পরিধি বড় হওয়ায় এই মুহূর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
অবসর ভাতার চাপ
রংপুর-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজীর প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী মিলন বলেন, বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে ৮০ হাজার ৩২০টি আবেদন জমা রয়েছে। এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ ৯ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৫৯ হাজার ৮২০টি আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ জন্য প্রায় ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২০ হাজার ৫০০টি আবেদন নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ খাতে ২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে ৬ হাজার আবেদন নিষ্পত্তি করে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে আরও প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে।
কল্যাণ ট্রাস্টে বছরে ঘাটতি ১৮০ কোটি টাকা
যশোর-৪ আসনের জামায়াতের এমপি গোলাম রসুলের প্রশ্নের জবাবে মিলন বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪২ হাজার ৪০৭টি আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে। এগুলো নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমানে কল্যাণ ট্রাস্টের বার্ষিক আয় প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা হলেও ব্যয় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। এতে বছরে প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ঘাটতি হচ্ছে। এই কারণেই আবেদন নিষ্পত্তি বিলম্বিত হচ্ছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ ৭৭ হাজার ২২৭
মানিকগঞ্জ-২ আসনের সরকারি দলের সদস্য মঈনুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের সংখ্যা ৭৭ হাজার ২২৭।
তিনি বলেন, এসব পদ পূরণের লক্ষ্যে ‘ই-রিকুইজিশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সারা দেশের শূন্যপদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ শিগগিরই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। পর্যায়ক্রমে যোগ্য প্রার্থীদের মাধ্যমে এসব পদ পূরণ করা হবে।
মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষায় নতুন পরিকল্পনা
কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপির এমপি আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হলেও বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ও গুণগত মান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাগেরহাট-৪ আসনের আবদুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে ৮ হাজার ২২৯টি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে। বিএম (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট) কলেজ রয়েছে ১ হাজার ৯২৩টি।
কুমিল্লা-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে মিলন বলেন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের পদের সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৪৪টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৭ হাজার ৭৪ জন।
হাসনাতের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে কারিকুলামে পেশাভিত্তিক ও বৃত্তিমূলক বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আইটি ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হবে।
এ লক্ষ্যে একটি কমিটি মাদ্রাসার কারিকুলাম যুগোপযোগী করতে কাজ শুরু করেছে, বলেন তিনি।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিটি মাদ্রাসায় কারিগরি ট্রেড চালু করার কথাও বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ৫৪৮টি মাদ্রাসায় ভোকেশনাল কোর্স চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ১ হাজার মাদ্রাসায় কারিগরি ট্রেড কোর্স চালু করা হবে।
এমপিওবিহীন ও এবতেদায়ী মাদ্রাসা নিয়েও আশ্বাস
জয়পুরহাট-১ আসনের জামায়াতের এমপি ফজলুর রহমান সাইদের প্রশ্নের জবাবে মিলন বলেন, এমপিওবিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত করা হবে, বলেন তিনি।
নীলফামারী-১ আসনের বিরোধীদলীয় এমপি আব্দুস সাত্তারের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ১ হাজার ৩২৭টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করেছে।
নীতিমালা অনুযায়ী সঠিক মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে এগুলোও পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, বলেন তিনি।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১ লাখ ফ্ল্যাটের পরিকল্পনা
বগুড়া-৪ আসনের বিএনপির এমপি মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে কড়াইল বস্তিসহ ৫৮টি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব চিহ্নিত এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ১ লাখ ফ্ল্যাটের সংস্থান করা হবে।