Published : 05 Jul 2026, 12:40 PM
হুয়ান বিইয়্যোরো মেক্সিকোর স্বনামধন্য কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম। তবে ফুটবল খেলা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ God is Round বা Dios es Redondo তাঁকে বিশ্বব্যাপী অনেক বেশি পরিচিত করে তুলেছে। ফুটবল নিয়ে লিখিত যদি দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের কথা বলা হয়, তাহলে তাঁর একটি হুয়ান বিইয়্যোরোর এই God is Round. ফুটবল নিয়ে তাঁর লেখা লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের সকল ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তুমুলভাবে সমাদৃত। বর্তমান ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়েও রয়েছে তাঁর অনুভূতি ও অভিমত। বিডিআর্টস-এর পাঠকদের জন্য তাঁর সর্বসাম্প্রতিক অভিমত এখানে নীলিমা রশিদ তৌহিদার অনুবাদে হাজির করা হলো। বি.স
মূল: বাও ট্রাম
অনুবাদ: নীলিমা রশীদ তৌহিদা
বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে ফুটবল কেবল পরিসংখ্যান, কৌশল ও ট্রফির খেলা হলেও, মেক্সিকান লেখক হুয়ান বিয়্যোরোর কাছে ফুটবল তার থেকেও বেশি কিছু। এটি একটি সমাজের গভীরতম বিভ্রম, মানসিক জটিলতা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিফলন দেখার একটি আয়না।
সম্প্রতি হ্যানয়ের ফেনিকাআ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিয়্যোরো ‘খেলার রাজা’ নামে পরিচিত ফুটবল সম্পর্কে তাঁর স্বতন্ত্র সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
তাঁর উপন্যাস "দ্য ওয়াইল্ড বুক" তরুণ ভিয়েতনামি পাঠকদের মেক্সিকোকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এক অনবদ্য যাত্রায় নিয়ে যায়।
া
ভিয়েতনামের হ্যানয়ে ফেনিকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবল ও সাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলছেন মেক্সিকোর লেখক হুয়ান বিয়্যোরো
মেক্সিকান ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ ও বৈপরীত্য
মেক্সিকান ফুটবল নিয়ে বিয়্যোরোর বর্ণনায় তরুণ পাঠকেরা প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে পারে, তা হলো এক গৌরবময় ও হৃদয়স্পর্শী বৈপরীত্য। জয়লাভে মগ্ন এই পৃথিবীতে মেক্সিকো বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অনন্য ও তিক্তমিষ্টি স্থান দখল করে আছে।
ফেনিকাআ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে বিয়্যোরো অকপটে বলেন, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে মেক্সিকো প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছিল। এরপর বহুবার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও দলটি এখনো চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
তবে ট্রফির অভাব মেক্সিকানদের ফুটবলপ্রেমকে একটুও কমাতে পারেনি। ভিয়োরোর ভাষায়, যদি ফুটবলের মূল্যায়ন শুধুমাত্র দর্শকদের নিবেদন ও ভালোবাসা দিয়ে করা হতো, তবে মেক্সিকো নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হতো।
তিনি বলেন,"আমাদের দর্শকরা অসাধারণ। আমাদের ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের মানুষ। একজন লেখক হিসেবে আমি আসলে সমর্থকদেরই ভক্ত। জাতীয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, সেমিফাইনালে ওঠার বা ভালো অবস্থানে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম—তবু কেন এত মানুষ ফুটবলকে এত গভীর আবেগ নিয়ে ভালোবাসে? কারণ ফলাফল আমাদের পক্ষে না গেলেও, আমরা খেলাটি উদ্যাপন করি, আমরা খেলাটি উপভোগ করি।‘’
এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ পাঠকদের ফুটবলকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। মেক্সিকান ফুটবল অধ্যবসায়, ও সম্মিলিত আনন্দের এক অনন্য শিক্ষা। এটি দেখায় যে, বিনোদন এবং একটি অভিন্ন পরিচয়ের অনুভূতি অনেক সময় সোনার পদকের চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে।
বিয়্যোরো বলেন, যদি দর্শকদের জন্যও কোনো বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতো, তাহলে মেক্সিকো সহজেই ফাইনালে পৌঁছে যেত আর সেখানে তারা সম্ভবত ফুটবলপাগল আরেক দেশ ভিয়েতনামের মুখোমুখি হতো।
হুয়ান বিয়্যোরো মেক্সিকোর অন্যতম খ্যাতিমান ও পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, নাট্যকার, সাংবাদিক এবং চিত্রনাট্যকার। তাঁর বই বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর বেশ কয়েকটি বই ইংরেজিতেও প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফুটবলবিষয়ক প্রবন্ধসংকলন God Is Round, যা ২০১৬ সালে Restless Books থেকে প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তিনি মেক্সিকো সিটিতে বসবাস করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একটি শান্তিপ্রিয় সংস্কৃতি: অহিংস প্রতিদ্বন্দ্বিতা
বিশ্বের অনেক দেশে তীব্র ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই বিশৃঙ্খলতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু হুয়ান বিয়্যোরোর মতে, মেক্সিকান ফুটবল সংস্কৃতির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ, যা বারবার হতাশার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই গড়ে উঠেছে।
দক্ষিণ আমেরিকা সফরের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বিয়্যোরো বলেন, আর্জেন্টিনার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব বোকা জুনিয়র্স ও রিভার প্লেট-এর মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী সুপারক্লাসিকো ম্যাচ চলাকালে তাঁর এক স্থানীয় সমর্থকের সঙ্গে কথা হয়। সেই সমর্থক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মেক্সিকোতে কি সত্যিই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকেরা একই গ্যালারিতে পাশাপাশি বসে খেলা দেখেন? উত্তরে বিয়্যোরো জানান, বিষয়টি সত্য।
তিনি বলেন, "হ্যাঁ। আমরা শান্তিপ্রিয় দর্শক। আমরা খেলাটি উপভোগ করি। যেহেতু আমাদের দল প্রায়ই হেরে যায়, তাই আমরা পরাজয়ের সঙ্গে অভ্যস্ত। সে কারণেই আমরা সহিংস নই। আর এই মানসিকতা আপনি এমন একজনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন, যিনি আপনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষের সমর্থক।"
বিয়্যোরোর মতে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান মেক্সিকানদের কাছে গর্বের বিষয়। সেখানে ফুটবলকে কেন্দ্র করে শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কোনো তাণ্ডব নেই। বরং সবার মধ্যে এমন এক সম্মিলিত উপলব্ধি রয়েছে যে, খেলার আনন্দ ও সৌন্দর্য যেকোনো পরাজয়ের তিক্ততার চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।
সাহিত্য হিসেবে ফুটবল: গদ্য বনাম কবিতা
কিন্তু হুয়ান বিয়্যোরোর মতো একজন লেখক কীভাবে ২২ জন খেলোয়াড়ের বলের পেছনে ছুটে চলাকে উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করেন? তাঁর মতে, মাঠ ও সাহিত্যের এই সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল যখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪ বছর। তখন তিনি মেক্সিকোর কিংবদন্তি আজতেকা স্টেডিয়ামে বসে ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখছিলেন। বিয়্যোরো স্মরণ করেন, ইতালীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক পিয়ের পাওলো পাসোলিনি-র একটি লেখা তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। পাসোলিনি সেই ম্যাচটি দেখেছিলেন, যেখানে ব্রাজিল ইতালিকে ৪–১ গোলে পরাজিত করেছিল।
ভিয়োরো বলেন, "ইতালি ও ব্রাজিলের ফাইনাল ম্যাচটি দেখে পাসোলিনি বলেছিলেন, ‘আমি ব্রাজিলকে কবিতার ফুটবল খেলতে দেখছি, আর ইতালিকে দেখছি গদ্যের ফুটবল খেলতে।’ মানুষের প্রকাশভঙ্গির দুটি ধরন আছে—একটি কবিতার ভাষা, অন্যটি গদ্যের ভাষা। সেই ম্যাচে কবিরাই জয়ী হয়েছিল। আমার কাছে এটি ছিল এক বিস্ময়কর উপলব্ধি যে, কেউ একটি ফুটবল ম্যাচ দেখে সেটিকে সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে এবং বলতে পারে এটি কবিতা, আর ওটি নিছক গদ্য।’"
তরুণ পাঠকদের জন্য এই দ্বৈত ধারণাই বিয়্যোরোর উপন্যাস The Wild Book বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। উপন্যাসটিতে বইগুলো যেন জীবন্ত সত্তা—তারা নড়াচড়া করে, তাদের অনুভূতি আছে, এবং যে কেউ তাদের পড়ুক তা তারা চায় না। তারা এমন একজন পাঠককে খোঁজে, যার কল্পনাশক্তি মুক্ত ও বন্য।
একইভাবে, বিয়্যোরোর কাছে ফুটবলও একটি জীবন্ত আখ্যান—একটি ক্যানভাস, যেখানে দিয়েগো মারাদোনা কিংবা পেলে তাঁদের পায়ের জাদু দিয়ে কবিতা লিখে যান। হোক সেটা মারাদোনার বিতর্কিত "হ্যান্ড অব গড" গোল কিংবা তার পরপরই ইতিহাসের অন্যতম সেরা বৈধ গোল—ফুটবল কৌশল, রূপক এবং জাদুবাস্তবতার এমন সব উপাদানে ভরপুর, যা লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

এই অনুষ্ঠানে ভিয়েতনামে অবস্থিত মেক্সিকান দূতাবাসের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ক্রীড়া ভাষ্যকার ট্রুং আন (Truong Anh) উপস্থিত ছিলেন
বিশ্বকাপ ২০২৬: আধুনিক ফুটবলকে ঘিরে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি
মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আয়োজন করছে। এ প্রসঙ্গে হুয়ান বিয়্যোরো আধুনিক ফুটবলের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে একজন সাংবাদিকের মতোই তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন। তরুণ পাঠক এবং আধুনিক গণমাধ্যমের দর্শকদের জন্য তাঁর পর্যবেক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আর সেই বার্তাটি হলো—বিশ্বব্যাপী বিনোদনকে প্রভাবিত করা শক্তিগুলোর দিকে আমাদের সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে তাকানো উচিত।
বিয়্যোরো জানান, ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে তাঁর অনুভূতি মিশ্র। তিনি বলেন, একাধিক দেশে অনুষ্ঠিত হওয়ায় যাতায়াতের জটিলতা, উচ্চ পর্বতমালা থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠ পর্যন্ত চরম জলবায়ুর পরিবর্তন, এবং টিকিটের মূল্য বেড়ে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া—এসব কারণে সাধারণ শ্রমজীবী ফুটবলপ্রেমীরা ক্রমেই খেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
তবে বাণিজ্যিক প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতা যতই থাকুক না কেন, বিয়্যোরো এখনো ফুটবলের নির্মল ও অকৃত্রিম ‘জাদুতে’ বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন, "এখানে অনেক রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে। আয়োজনের দিক থেকে এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি খুবই জটিল একটি বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। কিন্তু মাঠের খেলা, ফুটবলের সেই জাদু—আমি আশা করি, আমরা মাঠে সেটিই দেখতে পাব।"
তরুণদের জন্য এক অনন্য পাঠ
সবশেষে, হুয়ান বিয়্যোরো ফেনিকাআ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সব তরুণ ভিয়েতনামি পাঠকের উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি তাঁদের জীবনে নিজেদের ‘ওয়াইল্ড বুক’ খুঁজে নিতে আহ্বান জানান—তা সাহিত্য, বিজ্ঞান কিংবা খেলাধুলা, যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন। ফুটবল কখনোই নিছক একটি খেলা নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, ইতিহাস, রাজনীতি এবং নিবেদিতপ্রাণ আবেগকে বোঝার এক চমৎকার মাধ্যম।
বিয়্যোরো বলেন, "আমি ফুটবল নিয়ে লিখি কারণ আমি আমাদের সময়টাকে বুঝতে চাই, মানুষের আচরণ বুঝতে চাই, আর বুঝতে চাই মানুষের সেই গভীর অনুরাগকে, যা কেবল ফুটবলের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ফুটবল এক অসাধারণ আবেগ। এখানে এমন এক বিশাল সম্ভারের সন্ধান মিলবে, যার মাধ্যমে শুধু খেলাটিকেই নয়, বরং খেলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সমগ্র পৃথিবীকেও আরও গভীরভাবে বোঝা যায়।"
তথ্যসূত্র:
https://vovworld.vn/culture-rendezvous/the-soul-of-mexican-football-through-the-eyes-of-writer-juan-villoro-2445680.vov5