Published : 06 Jul 2026, 07:44 PM
“চোখের নিমিষে বাড়িভিটা নদী খায়া গেলো। চার চারটা ঘর কোনো রকমে সরে নিয়া গ্যাছি। তিনটা আমগাছ, একটা জামগাছ, কাটার আগেই নদীত ডুবি গেলো। এই শোকে-দুঃখে বাড়ি ভাঙার তিন দিন পর বাবা কাদের আলী (৬০) মারা গেলো। কোনো রকমে চর বিদ্যানন্দ থাকি দক্ষিণে আনন্দ বাজারে অন্যের জমিতে ঘর উঠাইছি। আমাগো কষ্ট কেউ দ্যাখে না।”
বুকে কষ্ট চেপে মুখ শক্ত করে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইঊনিয়নের চর বিদ্যানন্দ গ্রামের মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে কাফি (৩৫) এভাবেই নিজের দুর্দশার কথা বলছিলেন।
বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ গ্রামের লোকজন জানান, ১৫ দিনে তাদের দুই গ্রামের ১৯টি বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তিস্তা নদীর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। প্রতিনিয়ত মানুষের বাড়িঘর, গাছপালা কিংবা আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। কৃষকের বাদাম, আমন ধানের বীজতলা, মরিচ, শাক-সবজি, পাট ও ভূট্টার ক্ষেত এখন নদীগর্ভে।
তিস্তা নদীতে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে ও বাতাসের কারণে কিছুক্ষণ পর পর ভাঙছে পাড়।
এ রকম পরিস্থিতিতে নদী ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সোমবার দুই গ্রামের মানুষ তিস্তা পাড়ে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন। এ সময় বক্তব্য দেন মাঈদুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম, আশরাফুল হক।

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের জয়নাল ও মাঈদুল বলেন, তাদের গ্রামের কাফি (৩৫), আবদুল জলিল (৫৫), রশিদুল ইসলাম (৩৩), গনি মুন্সী (৫০), মোতালিব (৫০), আশরাফুল (৬০), লোকমান (৫০), জয়নাল (৬০) আবদুস সালাম (৪৫), রফিকুল (৪৫) ও সফিকুলের (৩০) বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে।
আর চর তৈয়বখাঁ গ্রামে নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন মোস্তফা কামাল (৫৫), রোস্তম (৫০), সাত্তার (৬০), জহুরুল (৪২), আইয়ুব আলী (৬৫), মোকছেদ (৪৫), রওশন আরা (৫০), ফকরুল ইসলাম (৪৫)।
তৈয়বখাঁ গ্রামের রোস্তম আলী বলেন, এ নিয়ে পাঁচবার বাড়িভিটা নদীগর্ভে গেছে তার। সেইসঙ্গে আড়াই বিঘা পাট ও আমন ধানের বীজতলা নদী ভেঙে নিয়ে গেছে।
“অনেক কষ্টে অন্যের জমিতে ঘর তুলে আছি। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাই নাই।”

চর বিদ্যানন্দ গ্রামের আব্দুল জলিল বলেন, পূর্বচর বিদ্যানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দুটি মসজিদ ভাঙনের কবলে পড়েছে। স্কুল ঘরটি ভেঙে গেলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
তিনি বলেন, এ ছাড়া দুই শতাধিক বাড়ি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে চরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বিঘ্নিত হবে।
বিদ্যানন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাইজুল ইসলাম বলেন, “আমার ইউনিয়নের ৭৫ ভাগ এলাকা মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে গেছে। বাকিটাও বিলীনের পথে। এ ছাড়া বর্তমানে চর বিদ্যানন্দ ও তৈয়বখাঁ গ্রাম দুটি ভাঙতে ভাঙতে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সীমানায় গিয়ে ঠেকেছে।”
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “জেলাজুড়ে প্রায় ৪০টি পয়েন্টে ভাঙন চলমান রয়েছে। জনগুরত্বপূর্ণ বিবেচনা করে প্রায় ৩০টি পয়েন্টে দুই লাখ জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। চরাঞ্চলের জন্য বাজেট না থাকায় আমরা সেখানে কাজ শুরু করতে পারিনি।”