Published : 27 Oct 2023, 01:54 AM
ঢাকার মহাখালীতে বহুতল ভবন খাজা টাওয়ারে আগুনে তিনজনের প্রাণহাণি এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।
হতাহতের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এ আগুনে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক সেবাতেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
রাত দেড়টার পরও ১৪ তলা এ ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বিকালের পর থেকে ১১টি ইউনিট সেখানে টানা কাজ করে। মাঝ রাতের পরও ভেতরে আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এ ভবনে রয়েছে দেশের ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদাতা অনেক কোম্পানির ডেটা সেন্টার। যে কারণে আগুন লাগার পর দেশের অর্ধেকের বেশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহকের সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইন্টারনেট সেবাদাতারা।
মোবাইল ফোন সেবা ব্যাহত হওয়ায় গ্রাহকদের নোটিশ পাঠিয়েছে দেশের প্রধান তিনটি মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণ ফোন, রবি ও বাংলালিংক।
এদিকে ফায়ার সার্ভিস বলছে, এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ভবনে ‘সামগ্রিক কোনো’ অগ্নি নির্বাপনের নিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল না।
সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলছেন, ভবনে প্রচুর ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম, তার, ব্যাটারি, সুইচ ইত্যাদির পাশাপাশি অফিসগুলো অন্দরসজ্জায় (ইন্টেরিয়র) ব্যবহৃত উপাদানগুলোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে।
ঢাকার মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনের এক ভবন পরেই ১৪ তলা খাজা টাওয়ারের অবস্থান। এ ভবনের ছয়টি ফ্লোর জুড়ে সাইফ পাওয়ারটেকের সার্ভার ও অফিস। নবম ও দশম তলায় আর্থ গ্রুপ ও রেইস অনলাইনের অফিস ও ডেটা সেন্টার। ১২ তলার পুরোটা ও ১১ তলার কিছু অংশ জুড়ে এনআরবি টেলিকমের ডেটা সেন্টার। চতুর্থ তলায় রয়েছে গ্রামীণফোনের একটি ডেটা সেন্টার।
ভবনের দোতলায় একটি ব্যাংক ছাড়া পুরো ভবনেই রয়েছে তথ্য প্রযুক্তি খাতের অনেকগুলো কোম্পানির অফিস ও সরঞ্জাম।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, বেলা ৪টা ৫৭ মিনিটে তাদের আগুনের খবর দেওয়া হয়। ৫টা ৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম গাড়ি এখানে এসে উপস্থিত হয়।
“সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আগুনটা আমাদের কন্ট্রোলে; তখন আগুন কিন্তু বাইরে তেমন একটা ছিল না। কিন্তু আমরা অনেকটুকু সময় নিই একজন মানুষকে উদ্ধার করার জন্য। কারণ ১৩ তলায় যে অফিসটা আছে সেই অফিসটা ছোট ছোট কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত। প্রত্যেকটা কম্পার্টমেন্টে আবার ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা ছিল। যার জন্য আমরা আগুন নেভাচ্ছি, পরক্ষণেই আবার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। আমরা ব্রিদিং ইকুইপমেন্ট পরে বারবার গিয়েও তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছিলাম না।”
পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে রফিকুল ইসলাম (৬২) নামে ওই প্রকৌশলীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতারে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া আগুন লাগার কিছুক্ষণ পর ভবন থেকে পড়ে রেইস অনলাইনের কর্মকর্তা হাসনা হেনা (২৭) মারা যান। একই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আকলিমা রহমানের (৩২) লাশ উদ্ধার করা হয় সাড়ে ১২টার দিকে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরেও রাত পৌনে ১২টার দিকে ভবন থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, “এখনও ভেতরে আগুন আছে, যার জন্য ধোঁয়া হচ্ছে। ধোঁয়ার অনেকগুলো কারণ- এখানে ব্যাটারি আছে, স্টোর আছে, এখানে প্রচুর কেবল-সুইচ আছে এবং ১২, ১৩, ১৪ তলায় সুসজ্জিত ‘ইন্টেরিয়র’ যা আগুন জ্বলতে বিশেষ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। যার জন্য এখনো আগুন আছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে আগুন কন্ট্রোলে কিন্তু আমাদের পুরোপুরি নির্বাপন করতে সময় লাগবে।”
কয়তলা থেকে আগুন লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কেউ বলেছেন চারতলা থেকে ডাক্টের মধ্য দিয়ে আগুনটা দ্রুত নয়-দশ তলায় ছড়িয়েছে। আবার কেউ বলেছেন আগুন ১১ তলায় লেগেছে। তবে আমরা তদন্ত শেষ করেই বলতে পারবো কোত্থেকে, কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হলো। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে হয়তো হতে পারে।”
এত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামে ঠাসা একটা ভবনে অগ্নি নির্বাপনে কী ব্যবস্থা ছিল জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন বলেন, “যদি ফায়ার সেফটি প্ল্যানের কথা বলি তাহলে সামগ্রিকভাবে এখানে কোন ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না। তবে বিভিন্ন ফ্লোরে আমরা ফায়ার এক্সটিংগুইশার পেয়েছি, সেগুলো কার্যকর ছিল। তবে ভবনে দাহ্য পদার্থ বেশি ছিল তার আগুনটা দ্রুত ছড়িয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, বিকাল ৪টা ৫৮ মিনিটে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের একটি টহলগাড়ি তখন ছিল (আধা কিলোমিটার দূরের) এসকেএস টাওয়ারের সামনে। ৫টা ৭ মিনিটে গাড়িটি এখানে এসে উপস্থিত হয়। এরপর একে একে ১১টি ইউনিট আসে।
“এখানে তিনটি টার্ন টেবিল ল্যাডার (টিটিএল) যেটা পৃথিবীর সর্বোচ্চ টিটিএল, যার উচ্চতা ৬৮ মিটার ব্যবহার করা হয়েছে। দেড়শর বেশি ফায়ার সার্ভিস কর্মী এখানে যুক্ত হন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, আনসার সবাই আমাদের সাথে কাজ করেছে।
“ছয়জনকে আমরা টিটিএল দিয়ে নামিয়ে এনেছি। এছাড়া আরও অনেকেই ছিল যাদের আমরা বিভিন্নভাবে উদ্ধার করেছি।”
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নাজমুর করিম ভুঁইয়া ঘটনাস্থলে এসে দ্রুত ভবনে তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আর্জি জানান।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, “আমরা দ্রুত এই ভবনটি তল্লাশি করে সব আগুন নিভিয়ে ভবনটা পুলিশের কাছে হ্যান্ডওভার করব। আমাদের কাজ হচ্ছে আগুন নেভানো। ওনারা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে কাজ করবেন।”
ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা ব্যহত
খাজা টাওয়ারে অবস্থিত এনআরবি টেলিকমের ডেটাসেন্টারের কিছু অংশ ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে উইন্ডস্ট্রিম কমিউনিকেশন্স নামের আরেকটি কোম্পানি।
উইন্ডস্ট্রিমের স্বত্বাধিকারী মাহাবুব আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ ভবনে গ্রামীণফোনসহ অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের ডেটা সেন্টার ও সার্ভার রুম রয়েছে। এ ভবনের ডেটা সেন্টার ও সার্ভারগুলোর সঙ্গে সারা বাংলাদেশের প্রায় সব আইআইজি ও আইএসপি যুক্ত। আগুনে ভবনে থাকা ডেটা সেন্টার ও অপটিক্যাল ফাইবার কেবল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মারাত্মকভাবে।
বাংলাদেশ আইএসপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এমদাদুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খাজা টাওয়ারে বড় দুটো ডেটা সেন্টার রয়েছে। যেগুলোর সঙ্গে ১০-১২টি আইআইজি যুক্ত রয়েছে; যাদের থেকে কয়েকশ আইএসপি সেবা নিয়ে থাকে। যে কারণে দেশের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “বলা যায় সারা দেশের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আইএসপি সরাসরি অ্যাফেক্টেড। এছাড়া আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ আইএসপি অনেকগুলো সেবা পাবে না, তারাও পরোক্ষভাবে অ্যাফেক্টেড।”
এছাড়া ওখানে এনআরবির যে ডেটা সেন্টার আছে তার থেকে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোও কিছু সেবা নিয়ে থাকে। আগুনে ক্ষতির কারণে এখন কল ড্রপের ইস্যুও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তার।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অফিস ও বাসায় ইন্টারনেট সেবাদাতা বিঘ্নিত হওয়ার খবর আসতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও গতি ধীর হয়ে পড়েছে। এলাকায় এলাকায় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের গ্রাহকদের সেবা বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে জানিয়েছে।
বহুতল এ ভবনে গ্রামীণফোনসহ অনেকগুলো কোম্পানির ডেটাসেন্টার ও সার্ভার রয়েছে; যেগুলোর সঙ্গে সারা দেশের বেশির ভাগ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) ও ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ওই ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত ন্যাশনওয়াইড টেলিকম ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) সেবাদাতার ব্যাকবোন ফাইবার কেটে যাওয়ার কারণে এসব কোম্পানির সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবা বাধাগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।
মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক গ্রাহকদের সেবা বিঘ্নিত হওয়ার আগাম নোটিস দিয়েছে।
খাজা টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় ইন্টারনেট বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটব সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আগুনে ওই ভবনে থাকা যন্ত্রাপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অপারেটরগুলোর একে অন্যের মধ্যে ভয়েস কলে সমস্যা হচ্ছে।
ভবনটিকে ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জের (আইসিএক্স) একটি হাব থাকার কথা জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, সংশ্লিষ্ট আইসিএক্স অপারেটরগুলো দ্রুততম সময়ে সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। আন্ত:সংযোগ ব্যবস্থা অন্যত্র পুনঃস্থাপনের জন্যও কাজ চলছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে।