Published : 15 Jul 2026, 04:21 PM
জুলাই আন্দোলনে নিহতদের লাশ গুম করতে ঢাকার পাশের একটি নদীতে মরদেহ ভাসিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, “প্রমাণ গোপনের উদ্দেশ্যে হাসপাতাল থেকে এসব লাশ নদীতে ফেলা হয়েছিল।”
বুধবার রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১১৪ জন শহীদের একটি গণকবর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম ও তদন্ত সংস্থা এদিন যৌথভাবে ওই গণকবর পরিদর্শন করে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে হতাহতের পরিসংখ্যান তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "জাতিসংঘ রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ১৪ শর মত শহীদ হয়েছেন এবং প্রায় ২৫ হাজার পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।"
তদন্তের অংশ হিসেবে গণকবর পরিদর্শনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাইয়ে শহীদ ৮৩৪ জনকে শনাক্ত করে তাদের নাম গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
“তার বাইরে ১৪০০ জনের মধ্যে আরও অনেকে (অশনাক্ত) আছে। আমরা সন্দেহ করি, এই গণকবরটিতে যে ১১৪ জন আছে, তারাও আছে তাদের মধ্যে।"
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে হাসপাতালগুলোর ভূমিকা নিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, "এই চার-পাঁচটি গণকবরের বাইরেও তখন অনেক হাসপাতালে অনেক ডেডবডি থাকত, যারা জুলাই শহীদ। তাদের ডেডবডিগুলো তখন হাসপাতালগুলোর রেজিস্ট্রিতে এন্ট্রি করত না, বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ডিসপোজাল করত।
"কখনো কখনো পরিবারের সদস্যরা কোনো এন্ট্রি ছাড়াই দাফন করত। সেখানে সুরতহাল করতে দেওয়া হত না, পোস্টমর্টেম করতে দেওয়া হত না, এমনকি হাসপাতালগুলো রেজিস্ট্রারে তারা এন্ট্রি পর্যন্ত করত না।"
নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, "আপনাদের অবগতির জন্য বলি যে, আমাদের ঢাকার নিকটস্থ একটি নদীতে একটি হাসপাতাল থেকে অনেক ডেডবডি পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই তথ্য আমরা তদন্তে পেয়েছি।
“আমরা সেই হাসপাতালের তখনকার কর্তৃপক্ষসহ যারা এই অপরাধের সাথে জড়িত ছিল, আমরা তাদেরকেও শনাক্ত করার চেষ্টা করছি এবং তাদেরকেও আমরা বিচারের আওতায় নিয়ে আসব।"
এ বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "আমরা সেই হাসপাতাল, তখনকার কর্তৃপক্ষ এবং যারা এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিল, তাদেরকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। যে ডেডবডিগুলো নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে, সেগুলো আমরা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।"
প্রধান কৌঁসুলি জানান, রায়েরবাজার ছাড়াও জুরাইন, মাতুয়াইল, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের কয়েকটি গণকবর তারা পরিদর্শন করবেন।
"প্রত্যেকটি গণকবর থেকে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শহীদদের লাশ শনাক্ত করার জন্য আমরা কাজ করেছি। আমরা কিছু কিছু রিপোর্ট পেয়েছি, তদন্ত অব্যাহত আছে। যেভাবে তাদেরকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, সেভাবেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।"
আমিনুল ইসলাম বলেন, "আমরা জাতিসংঘের রিপোর্টে যে ১৪০০ জনের তথ্য পেয়েছি, সেই তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেকটি শহীদ পরিবার এবং শহীদদের শনাক্ত করার জন্য জোরালোভাবে তদন্ত করে দেখছি। আমাদের জাতির কাছে আমাদের অঙ্গীকার, প্রত্যেক শহীদকে আমরা শনাক্ত করে বাংলার মাটিতে বিচার নিশ্চিত করতে চাই।
“আমরা আপনাদের মাধ্যমে জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, এই গণহত্যার সাথে যারা জড়িত, রাষ্ট্রের যত বড় ব্যক্তিই হোক, রাষ্ট্রযন্ত্রের যারাই জড়িত থাকুক এবং যারা এর মধ্যে মনে করে থাকেন যে তারা পার পেয়ে গেছেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আমরা, আমাদের তদন্ত দল, আমাদের প্রসিকিউশন টিম এই প্রত্যেকটির বিচার ইনশাআল্লাহ বাংলার মাটিতে নিশ্চিত করব।"
তদন্ত প্রক্রিয়ায় শহীদ পরিবারগুলোর সহযোগিতা চেয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, "আপনারা আমাদের প্রসিকিউশন টিম অথবা আমাদের তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে মাঝে মাঝে আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আমরা যখনই যেটা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হব অথবা শনাক্ত করতে পারব, সেই তথ্যটা আপনাদের আমরা সরবরাহ করব।”
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, "আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করবেন।"