Published : 16 May 2026, 12:33 AM
অধিকতর তদন্তেও পুলিশের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসেনি; ঢাকার কদমতলীর তিন খুনের মামলায় পরিবারের বড় মেয়ে মেহজাবিন ইসলাম মুনকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি।
সেখানে বলা হয়েছে, ছোট বোনের সঙ্গে স্বামীর প্রেম, সব জেনেও বাবা-মায়ের নিষ্ক্রিয়তায় ‘তীব্র ক্ষোভ থেকে’ বাবা, মা ও ছোটবোনকে একাই খুন করেন মুন।
হত্যাকাণ্ডে মুনের স্বামী শফিকুল ইসলাম অরণ্যের সম্পৃক্ততার ‘কোনো প্রমাণ না পাওয়ায়’ এবারও তাকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
সেখানে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ১৮ জুন রাতে কদমতলীর বাসায় খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে বাবা মাসুদ রানা, মা মৌসুমি ইসলাম এবং বোন জান্নাতুল ইসলাম মোহিনীকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করেন মুন।
তিনজনকে খুন করার পর ‘মানসিকভাবে বিপর্যস্ত’ হয়ে পড়েন মুন। স্বামীকেও হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন।
সকালে উঠে ৯৯৯ এ ফোন করে তিনজনকে হত্যার কথা পুলিশকে জানিয়ে মুন বলেন, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে না গেলে আরও ৩ জনকে হত্যা করবেন।
চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের পর ২০২১ সালের ২০ জুন মাসুদ রানার বড় ভাই সাখাওয়াত হোসেন তার ভাতিজি মেহজাবিন মুন ও ভাতিজির স্বামী শফিকুল ইসলাম অরণ্যকে আসামি করে কদমতলী থানায় মামলা করেন।
মামলাটি তদন্ত করে ২০২২ সালের ২২ অগাস্ট মুনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন কদমতলী থানার পরিদর্শক ফেরদৌস আলম সরকার। মুনের স্বামী শফিকুল ইসলাম অরণ্যকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয় সেখানে।

কিন্তু পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে আপত্তি জানিয়ে ওই বছরের ৬ অক্টোবর নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী সাখাওয়াত হোসেন।
সেখানে তিনি বলেন, “মামলার তদন্ত সঠিকভাবে হয়নি। মুন একা এত বড় ঘটনা ঘটাতে পারে না। আরও কারো যোগসূত্র রয়েছে।”
তার আবেদনে ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরফাতুল রাকিব নারাজির আবেদন মঞ্জুর মামলায় সিআইডি পুলিশকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
অধিকতর তদন্ত শেষে গত ২৭ এপ্রিল মুনকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক কানাই লাল মজুমদার। তিনিও মুনের স্বামী শফিকুলকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা কানাই লাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আগামী ৪ জুন এ মামলার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।
কী আছে অভিযোগপত্রে
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা কানাই লাল বলেছেন, মেহজামিন ইসলাম মুন ও শফিকুল ইসলাম অরণ্য স্বামী-স্ত্রী। তাদের পাঁচ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।
মৌসুমি ইসলাম, মাসুদ রানা ও জান্নাতুল ইসলাম মোহিনী যথাক্রমে মুনের মা, বাবা ও বোন। মাসুদ রানা সৌদি আরবে থাকতেন।
ঘটনার ৬ বছর আগে শফিকুলের সঙ্গে মুনের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছর আগে মুন ও শফিকুলের ‘মোবাইলের মাধ্যমে’ পরিচয় হয়।
পরে মুন তার ছোট বোন মোহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ধোলাইখাল এলাকায় শফিকুলের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে মোহনীকে দেখে শফিকুলের পছন্দ হয়, তারা পরস্পর মোবাইল নম্বর আদান প্রদান করেন। এক পর্যায়ে মোহনীকে বিয়ে করার জন্য তার মা মোসুমির কাছে প্রস্তাব পাঠান শফিকুল।
কিন্তু মোহিনীর বয়স কম হওয়ায় এবং তার বড় বোন মুনের ওই সময় বিয়ে না হওয়ায় তাদের মা প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। পরে মায়ের প্রস্তাবে মুনের সঙ্গে শফিকুলের বিয়ে হয়।
বিয়ের পর মুন যখন ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তার এক সময়ের প্রাইভেট টিউটর আমিনুল ইসলাম তাকে (মুনকে) ‘বিরক্ত’ করতে থাকেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শফিকুল ইসলাম, মৌসুমি এবং তার বোন শিউলী আক্তার মিলে আমিনুলকে বাসায় ডেকে এনে হত্যা করেন।

ওই ঘটনায় পর শফিকুল, মৌসুমি ও শিউলীর সঙ্গে মুনকেও জেলে যেতে হয়। অভিযোগপত্রে তাদের সবাইকেই আসামি করা হয়।
কানাই লাল লিখেছেন, আমিনুল হত্যা মামলায় জামিন পাওয়ার পর মুন ও শফিকুল ঘর-সংসার করছিলেন। কিন্তু শফিকুলের সঙ্গে মোহিনীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে আবার অশান্তি শুরু হয়।
শফিকুল বিভিন্ন সময়ে মোহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যেতেন। বিষয়টি মুন তার মাকে জানান। কিন্তু মৌসুমি কোনো পদক্ষেপ নেননি।
মোহিনী এক পর্যায়ে শফিকুলের বাড়িতে যায় এবং সেখানে প্রায় দুই বছর থাকে। সে সময় তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
মুন বিষয়টি তার মা ও প্রবাসী বাবাকে জানালেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি। সে কারণে মুনের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয় এবং তিনি চারজনকেই হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন বলে তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য।
পরিদর্শক কানাই লাল তার প্রতিবেদনে বলেছেন, পরিকল্পনার এক বছর পর ২০২১ সালের ১৮ জুন মাসুদ রানা সৌদি আরব থেকে বাড়িতে আসেন। মুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শফিকুল ও মেয়েকে নিয়ে কদমতলীর লাল মিয়া সরকার রোডে বাবার বাড়িতে যান। সেখানে যাওয়ার সময় শনিরআখড়া থেকে ছুরি ও চাপাতি এবং ফার্মেসি থেকে ঘুমের ওষুধ কিনে নিয়ে যান।
সেখানে ঘুমের ওষুধ গুঁড়ো করে স্যুপ, নুডলস, চা, কফি ও তেঁতুল পানির সঙ্গে মিশিয়ে মা, বাবা, বোন ও স্বামীকে খেতে দেন মুন। খাবার খেয়ে সবাই ঘুমে অচেতন হয়ে গেলে মুন বাসার গেইটে তালা লাগিয়ে দেন।
শফিকুল, তার মেয়ে ও দাদিকে পাশের ঘরে আটকে রেখে সবার মোবাইল ফোন অফ করে সিম ও মেমোরি কার্ড টয়লেটে ফেলে দেয় মুন।
এরপর তাদের ঘরের বারান্দা থেকে কাপড় শুকানোর লাইলনের রশি কেটে এনে বাবা, মা ও বোনের হাত পা বাঁধতে শুরু করে। ওড়না ও রশি দিয়ে একে একে তার মা, বাবা ও বোনের হাত-পা বেধে ফেলেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, হাত-পা বাঁধার সময় মোহিনী জেগে গেলে তাকে চাকু দিয়ে মারার ভয় দেখান মুন। প্রথমে মায়ের বুকের ওপর বসে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করেন। একইভাবে বাবার বুকের ওপর বসে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
সে সময় মোহিনী চিৎকার করতে চাইলে মুন ওড়না দিয়ে তার মুখ চেপে ধরেন এবং তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
তিনজনকে হত্যার পর মুন ওষুধ মিশ্রিত খাবারগুলো ওয়াশরুমে ফেলে দেন। সে সময় তার মেয়ে ও দাদি জেগে উঠলে তাদের আবারও ঘুম পাড়িয়ে দেন তিনি। তিনজনকে হত্যার পর বিপর্যস্ত অবস্থায় এক পর্যায়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েন।
পরদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯ এ ফোন করে কদমতলী থানা পুলিশকে হত্যাকাণ্ডের কথা বলেন মুন। তিনি বলেন, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে না গেলে আরও ৩ জনকে হত্যা করবেন।
ওই খবর পেয়ে কদমতলী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং মুনকে গ্রেপ্তার করে। শফিকুলসহ বাকি তিনজনকে অসুস্থ অবস্থায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ।
পরে মুনকে চারদিন এবং শফিকুলকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা। ২০২১ সালের ২৪ জুন মা, বাবা ও বোনকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন মুন।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, অনেক বিষয় নিয়ে ছোটবেলা থেকেই মায়ের প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে তিনি হতাশ ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অবস্থায় তার বাবা আবার বিয়ে করেন। সেখানে তার দুই ছেলে রয়েছে। এ নিয়ে বাবার প্রতি তার ক্ষোভ ছিল। ছোট বোনের প্রতিও তার ক্ষোভ ছিল। এসব কারণে তিনি একাই তিনজনকে হত্যা করেন।
শফিকুলকে অব্যাহতির বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, মুন তার মা, বাবা ও বোনকে হত্যার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় স্বামীকে হত্যা না করে রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। পরে সকালে পুলিশে খবর দেন।
“মুন আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, সে একাই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। তার জবানবন্দিতে শফিকুল বা অন্য কোনো আসামির কথা উল্লেখ নাই।”
তবে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও সন্তুষ্ট নন মুনের চাচা, মামলার বাদী সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “টাকা খরচ করতে পারে যে সে বিচার পায়। টাকা ছাড়া কিছু হয় না। আমার ভাইয়ের পুরো পরিবার চলে গেছে। বিচার নিয়ে আর আগ্রহ নেই। আল্লাহর কাছে বিচার ছেড়ে দিলাম, তিনি বিচার করবেন।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মেয়েটা বলছে, এটা (খুন) সে করেনি। ছেলেটা (শফিকুল) করেছে। তারপরও সে আসামি হচ্ছে না। আমরা হতাশ। বিচার আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিলাম।"
পুরনো খবর
কদমতলীতে তিন খুন: বড় মেয়ে রিমান্ডে
ঢাকার কদমতলীতে ঘরের ভেতরে বাবা-মা-মেয়ের লাশ
'৩ জনকে খুন করেছি, তাড়াতাড়ি আসেন, নইলে আরও দুজনকে মারব'