Published : 25 Jun 2026, 05:16 PM
ঢাকার পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দম্পতি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের পক্ষে উচ্চ আদালতে লড়বেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান।
তাকে এ দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা।
তিনি বৃহস্পতিবার বলেন, “গত ১৭ জুন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার দ্বৈত হাই কোর্ট বেঞ্চ স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের জন্য সলিসিটরকে নির্দেশ দেন।
“সে অনুযায়ী আইনজীবী হাফিজুর রহমান খানকে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের পক্ষে আইনি লড়াই চালাবেন।”
যোগাযোগ করা হলে আইনজীবী হাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোনো আসামিকে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে হাই কোর্টের অনুমোদন ছাড়া তা কার্যকর করা যায় না, যা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে পরিচিত। আর ন্যায়বিচার নিশ্চিতের স্বার্থে আসামির যদি নিজস্ব আইনজীবী না থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী দেওয়া আইনেরই অংশ। সেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবেই আমাকে নিযুক্ত করা হয়েছে।"
মামলার বর্তমান অবস্থা ও নিজের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, "মামলার পেপারবুক ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে এবং আমি তা হাতে পেয়েছি।
“এখন আমার প্রধান কাজ হলো এই পেপারবুকটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্টাডি (পর্যালোচনা) করা। স্টাডি শেষ করে শুনানির জন্য আমি আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করব।”
আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, “আমাকে যেহেতু একিউজডের (আসামির) পক্ষে ডিফেন্ড করার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট (নিয়োগ) দেওয়া হয়েছে, সেহেতু আমাকে মামলার এভিডেন্সের (সাক্ষ্য-প্রমাণ) ওপর নির্ভর করেই কথা বলতে হবে। নিম্ন আদালতে যে সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে।
“একই সাথে নিম্ন আদালতের জাজমেন্টটি কীভাবে হয়েছে, সেটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে হবে। পরবর্তীতে অনারেবল সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট ডিভিশন সবকিছু অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) করে চূড়ান্ত জাজমেন্ট দেবেন।”
এক প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান বলেন, “পেশাগত জীবনে কম-বেশি সব মামলাতেই একধরনের কাজের চাপ থাকে।
“তবে এই মামলায় ব্যক্তিগত কোনো বৈরিতা বা চাপের সুযোগ নেই। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখন সচেতন ও শিক্ষিত, তারা আইনি প্রক্রিয়াটি বোঝেন।”
তিনি বলেন, “এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো আশা-ভরসা বা চাওয়া-পাওয়ার বিষয় নেই। আইনজীবী হিসেবে আমার মূল দায়িত্ব আসামির আইনগত অধিকারগুলো আদালতের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরা।
“মামলার নথিপত্র পর্যালোচনার পর যদি দেখা যায়—নিম্ন আদালতের দেওয়া দণ্ডে কোনো আইনগত ত্রুটি রয়েছে, তবে অনারেবল হাই কোর্ট ডিভিশন তা কারেক্ট (সংশোধন) করবেন। আর যদি সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও প্রক্রিয়া সঠিক থাকে, তবে আদালত তা অ্যাফার্ম (বহাল) করে দেবেন।”
হাফিজুর রহমান খান বলেন, “এর আগে ২৯ নম্বর কোর্টে এই নিয়োগের অর্ডার হয়েছিল। সলিসিটর উইংয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর হাই কোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হবে। আমি আইনগতভাবে আসামিপক্ষকে ডিফেন্ড করার জন্য আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব।”
গত ৭ জুন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। তাতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি সোহেলকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে আসামিদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ভুক্তভোগী পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে।
রায়ের পর দুই আসামিকে কনডেম সেলে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে তারা রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল করেন। গত ৯ জুন ৬৯ পৃষ্ঠার রায় ও অন্যান্য নথিপত্র সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন বলেন, “একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।”
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে এক হাজার আটশতাধিক বিচারাধীন মামলার প্রেক্ষাপটে রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে মন্তব্য করে বিচারক বলেছিলেন, “কারণ এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।”
পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশন এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আসামি সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতেন।
গত ১৯ মে দুপুরে সোহেলদের বাসা থেকে রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ সেখান থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেন সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।
রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ঘটনার দিনই দুইজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। পরদিন সোহেল দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আর স্বপ্নাকেও পাঠানো হয় কারাগারে।
ধর্ষণ ও হত্যার নৃশংস ঘটনাটি সারাদেশে ক্ষোভের জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাসায় গিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। আশ্বাস দেন, বিচার দ্রুত শেষ করার। বিচার শুরুর পর ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করা হয়।