Published : 19 Dec 2025, 07:26 PM
স্থির প্রত্যয় যাত্রায় অবিচল থাকার অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সমাজ গড়তে প্রয়াসী বলে জানিয়েছে এই সংগঠনটি। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে গভীরভাবে শোকাহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে ছায়ানট।
কিন্তু ওই সূত্র ধরে ছায়ানট-সংস্কৃতি ভবনে কেন হামলা সংঘটিত হলো তা মোটেই বোধগম্য নয় জানিয়ে ছায়ানট বলেছে, "হয়ত, পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছে সংস্কৃতি চর্চার বিরোধী গোষ্ঠী।"
শুক্রবার সন্ধ্যায় ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী ও সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসার দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ১৮ তারিখ রাত ১২টার পর ওসমান হাদির মর্মান্তিক মৃত্যুকে উপলক্ষ্য করে একজোট লোক ছায়ানট-সংস্কৃতি ভবনে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ভাঙচুর ও লুটতরাজ চালায় এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে।
তারা ছয়তলা ভবনের প্রতিটি সিসি ক্যামেরাসহ অধিকাংশ কক্ষ, প্রক্ষালণ কক্ষ এবং বহু বাদ্যযন্ত্র, মিলনায়তন, কম্পিউটার ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে।

সার্ভারসহ ছায়ানটের কিছু বাদ্যযন্ত্র ও আসবাবপত্র পুড়িয়ে দিয়েছে। অন্তত ৭টি ল্যাপটপসহ চারটি ফোন ও কিছু হার্ড ডিস্ক লুঠ করেছে। তাদের ভাঙচুরে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই হামলার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে ছায়ানট।
এদিকে বেলা আড়াইটার দিকে ছায়ানট ভবন পরিদর্শনে আসেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
পরে এক বিবৃতিতে উপদেষ্টা বলেছেন, ছায়ানট ভবনে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে- এই বিষয়ে যা যা করণীয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ছায়ানট কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে সেটা করবে।
তবে ছায়ানটের বিবৃতিতে বলা হয়, "ছায়ানট একটি স্বেচ্ছাসেবী ও স্বনির্ভর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ছায়ানট কোনো সরকার, বিদেশি সংস্থা বা কর্পোরেট অনুদান গ্রহণ করে না। সুতরাং, ছায়ানট আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে এই ক্ষতিপূরণ করবে। সঙ্গীত এবং শিশুদের সাধারণ শিক্ষায় এই সাময়িক বিঘ্নের দ্রুত প্রতিকার করতে বদ্ধপরিকর।"
"ছায়ানটের কাজের ক্ষেত্র রাজনীতি নয়, সঙ্গীতসংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাঙালী জাতিসত্তাকে ধারণ করে ছায়ানট৷"
ছায়ানট এই উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ অনানুষ্ঠানিক সঙ্গীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা দেশে ও বিদেশে সমাদৃত। বাংলা গানের চর্চা বিস্তৃতির পশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রামে ছায়ানটের ভূমিকাও সারা বিশ্বে স্বীকৃত।
তাই এই নিন্দনীয় হামলা মাতৃভূমি সম্পর্কে বিশ্বে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে বলেও মনে করছে ছায়ানট।

দেশ ও বিদেশ থেকে যে অগনিত শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা জানিয়েছেন, তাদের সবার কাছে ছায়ানট কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে।
এদিকে ছায়ানটে হামলার ঘটনায় গান গেয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন নালন্দা ও ছায়ানট বিদ্যায়তনের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
শুক্রবার বিকাল ৪টায় ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের সামনে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতসহ কয়েকটি গান পরিবেশন করা হয়।
প্রতিবাদী এই আয়োজনে অংশ নিয়ে সংস্কৃতিকর্মী আরিফ নূর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "রাতে ছায়ানটে যে ন্যাক্কারজনক হামলা হয়েছে, তার প্রতিবাদে এটি আমাদের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ।"
বৃহ্স্পতিবার রাত দেড়টা থেকে আড়াইটার মাঝামাঝি সময়ে একদল বিক্ষোভকারী ধানমন্ডির সাততলা এ ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন তলায় গিয়ে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল মিছিল নিয়ে এসে এ হামলা করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। প্রথমে পার্কিং লটের দিকে আগুন দেওয়া হয়। পরে তারা ভবনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।

এ সময় হামলাকারীরা ‘ভারতের দালাল’, ‘ভুয়া’,’ নারায়ে তাকবীর’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘ভাঙো’ এসব স্লোগান দেয়। প্রয়াত সন্জীদা খাতুনের প্রতিকৃতি কেটে নষ্ট করার সময় ‘নাস্তিক’ বলে সম্বোধন করেছে।
মিলনায়তনে হামলাকারীর যা পেয়েছেন সেটিই ভাঙচুর করেছেন। তবলা, হারমোনিয়াম, তানপুরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনতলার একটি ভবনে পুড়ে যাওয়া বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে স্তুপকারে পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া বই।
পুরো মনিটরিং সিস্টেম, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পিকার, লাইট ও ফ্যান ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে থাকা মাটির তৈরি চারুকর্ম ও শিল্প কর্ম ভেঙে ফেলা হয়েছে।
প্রতিটি তলায় থাকা সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট এবং সেখানে পরিচালিত বিদ্যালয়ের সবগুলো কক্ষ ও অফিস রুমের বেশিরভাগ আসবাব ভেঙে ফেলা হয়েছে। কাগজপত্র ও সরঞ্জাম তছনছ করা হয়েছে।
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কক্ষও বাদ যায়নি। আলমারির গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে। চেয়ার-টেবিল ভেঙেচুড়ে ওলট পালট করা হয়েছে। রমেশ চন্দ্র স্মৃতি মিলনায়তন, মূল মিলনায়তনসহ, শৌচাগারও রেহাই পায়নি ভাঙচুরের তাণ্ডব থেকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, হামলাকারীদের মধ্যে একটি অংশ ছিল লুটপাটকারী। তারা বিভিন্ন কক্ষে গিয়ে টেবিলের ড্রয়ার ভাঙচুর করে খুঁজেছে টাকা-পয়সা আছে কি না। কেউ কেউ কিছু বাদ্যযন্ত্রসহ অন্যান্য সামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে।