Published : 24 Jun 2025, 07:28 PM
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমানকে অপসারণ দাবির মধ্যে জারি করা সবশেষ দু’টি বদলি আদেশকে ‘প্রতিহিংসা ও নিপীড়নমূলক’ দাবি করে তা ছিঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মঙ্গলবার ঢাকার আঁগারগাওয়ের রাজস্ব ভবনে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ডাকা সংবাদ সম্মেলন করে এ প্রতীকী প্রতিবাদ করেন তারা।
একই সঙ্গে সবশেষ বদলি আদেশ অনুযায়ী পাঁচ কর্মকর্মতার এ দিন নতুন দপ্তরে যোগদানের নির্দেশনা থাকলেও সেখানে তারা যোগ দেননি।
এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চলার মধ্যে রোববার আয়কর অনুবিভাগের পাঁচ কর্মকর্তাকে ‘তাৎক্ষণিক বদলি’ করা হয়।
এর মধ্যে দুজন আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের, একজন এনবিআর বোর্ড অফিসের এবং বাকি দুজন ঢাকা ও কুমিল্লার কর অঞ্চলের।
কর প্রশাসনের এক আদেশে বলা হয়, উপ কর কমিশনার শাহ মোহাম্মদ ফজলে এলাহীকে আয়কর গোয়েন্দা থেকে বদলি করে ময়মনসিংহ কর অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে।
উপ কর কমিশনার মোহাম্মদ শিহাবুল ইসলামকে ঢাকার কর অঞ্চল-১৬ থেকে থেকে খুলনা কর অঞ্চলে এবং উপ কর কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ ইউসুফকে বোর্ড থেকে সরিয়ে বদলি করা হয়েছে বগুড়া কর অঞ্চলে।
এছাড়া উপ কর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিলকে আয়কর গোয়েন্দা থেকে কুমিল্লা কর অঞ্চলে এবং উপ কর কমিশনার নুসরাত জাহান শমীকে কুমিল্লা কর অঞ্চল থেকে রংপুর কর অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, তাদের নতুন কর্মস্থলে মঙ্গলবার বা তার আগেই যোগ দিতে হবে এবং সোমবার বর্তমান কর্মস্থলে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, “গত ২১ ও ২২ জুন একাধিক আদেশের মাধ্যমে রাজস্ব সংস্কার কর্মসূচির সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিহিংসা ও নিপীড়নমূলক বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি আদেশে অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার হিসেবে সুনাম রয়েছে এবং কর্মসূচিতে সম্মুখ সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমন পাঁচজন আয়কর কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত কম রাজস্ব সম্ভাবনাময় দপ্তরে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
“সে আদেশে প্রাপ্য যোগদানকাল না দিয়েই পরবর্তী কর্মদিবসে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগদান করতে বলা হয়েছে, যা চাকরি বিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থি ও অবৈধ। এই অবৈধ আদেশ বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের ‘ব্যক্তিগত জিঘাংসা চরিতার্থের এক জলজ্যান্ত প্রমাণ’।”

এনবিআর চেয়ারম্যান সংস্থাটির ‘যৌক্তিক’ কর্মসূচিতে থাকা কর্মকর্তাদের ‘পুঞ্জিভূত ক্ষোভকে উস্কে’ দিচ্ছেন দাবি করে বলা হয়, “তিনি (এনবিআর চেয়ারম্যান) পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চান। তার এমন কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দুরভিসন্ধিমূলক।”
মে মাসে এনবিআর দুই ভাগ করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব নীতি নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করে অধ্যাদেশ জারির পর তা বাতিলের দাবিতে কলম বিরতিসহ নানা কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তাদের আন্দোলনের মধ্যে সরকার পিছু হটে। বলা হয়, অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
এরপর কাজে যোগ দিলেও আন্দোলনকারীরা এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে অটল থাকেন এবং সংস্থার কার্যালয়ে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ঘোষণা করেন।
পরে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় অফিসে ফেরেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি স্বাভাবিক কাজে ফিরলেও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে দূরত্ব রয়েছে।
তিনি এখন আন্দোলনে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের একের পর এক বদলি করছেন, যেখানে চাকরি বিধি মানা হচ্ছে না বলে ঐক্য পরিষদের অভিযোগ।
সরকারের ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলন কার্যত বন্ধই ছিল অনেকদিন। তবে এর মধ্যে পরিষদ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনদের নিয়ে তাদের পূর্বঘোষিত ‘কেমন এনবিআর চাই’ শীর্ষক সেমিনার আয়োজনের লক্ষ্যে অফিস সময়ের পর প্রস্তুতিমূলক সভা আয়োজনের জন্য কক্ষ বরাদ্দ চেয়ে প্রথমে মৌখিকভাবে ও পরে লিখিত পত্র প্রদানের পরও কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এমনকি, কক্ষ বরাদ্দ চেয়ে দেওয়া চিঠি তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন বলেও জানা যায় বলে পরিষদ দাবি করে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২, ১৯ ও ২১ জুন রাজস্ব ভবনের নিচ তলার মেঝেতে ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সভাগুলো করা হয়।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব ভবন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করে এক ধরনের উস্কানিমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
এর মধ্যে চাকরির বিধি ‘বহির্ভূত’ ও ‘নীপিড়নমূলক’ বদলি আদেশ করায় এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে ফের জোরালো আন্দোলনে নামেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
চেয়ারম্যানকে 'আওয়ামী লীগ সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী' আমলা আখ্যা দিয়ে এবং তার বিরুদ্ধে 'দেশ ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত' থাকার অভিযোগ তুলে পরিষদ সোমবার নতুন কর্মসূচি ডেকেছে।
এনবিআর চেয়ারম্যানকে আগামী শুক্রবারের মধ্যে অপসারণ না করা হলে শনিবার থেকে কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সকল দপ্তরে ‘লাগাতার কমপ্লিট শাটডাউন’ চলবে ঘোষণাও করা হয় পরিষদের তরফে। তবে, আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা এই ‘কমপ্লিট শাটডাউনের’ আওতা বহির্ভূত থাকবে।