Published : 20 Mar 2026, 12:14 AM
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ ৩১ নাবিককে নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের যাওয়ার অপেক্ষায় আট দিন ধরে বসে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের জলসীমায়।
গুরুত্বর্পূণ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা জাহাজটি সম্ভাব্য হামলার শঙ্কায় শারজাহ বন্দর থেকে ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙ্গর ফেলে আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ৩১ বাংলাদেশি নাবিক একপ্রকার আতঙ্কের মধ্যে একেকটা দিন পার করছে। ঈদের দিনটাও তাদের সেভাবেই কাটবে।
বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পরিবার-স্বজন এবং নিজেদের উৎকণ্ঠা মিলিয়ে তাদের অপেক্ষার পালা যেন শেষ হবার নয়।
“আমাদের মাথার ওপর দিয়ে প্রতিদিন শত শত ড্রোন বা মিসাইল উড়ে যাচ্ছে। কখন কোথায় আঘাত হানবে তার কোনো ঠিক নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মনোবল শক্ত রাখাই আমাদের প্রধান কাজ।”
তিনি বলেন, “আমাদের নাবিক জীবন সবসময়ই কষ্টের, র্দীঘ সময় ধরে গভীর সমুদ্রে জাহাজে অবস্থান করতে হয়। এজন্য আমাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়া থাকে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কীভাবে সময় পার করতে হবে, তাও আমাদের জানা রয়েছে।”
আট দিন ধরে শারজাহ বন্দরের জলসীমার মধ্যে ভাসতে থাকা এমভি বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলামের জাহাজী জীবন ৩৪ বছরের বেশি।
তিনি বলেন, প্রতিটি জাহাজে নিয়মিত কিছু কার্যক্রম থাকে। জাহাজ বসে থাকলেও সেসব কাজ নাবিকদের করে যেতে হচ্ছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় বাংলার জয়যাত্রা। পরদিন ওই বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে ভেড়ে জাহাজটি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা করে বসে। ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় পাল্টা হামলা শুরু করলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
তাতে জেবেল আলী বন্দরে বাংলার জয়যাত্রার পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়। টার্মিনালে ভেড়ার একদিন পরেই বন্দরে অবস্থানরত জাহাজটির দুইশ মিটার দূরে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলার পর আগুন ধরে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে জাহাজটির ৩১ নাবিকের নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। কয়েকদিন পর জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়।
পণ্য খালাস শেষে জাহাজটি পুনরায় কাতারে ফিরে যাবার কথা থাকলেও ‘জয়যাত্রা’ ভাড়া করা (চার্টার) কোম্পানি পরবর্তী গন্তব্য ঠিক করে মুম্বাই বন্দর। পরবর্তী গন্তব্যের জন্য জাহাজটি হরমুজ প্রণালির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আরব আমিরাতের কোস্টর্গাড তাদের যাত্রা আটকে দেয় নিরাপত্তার অজুহাতে। জাহাজটি দিক বদলে শারজাহ বন্দর থেকে ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে গভীর সমুদ্রে অবস্থান নেয়।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমডোর মাহমুদুল মালেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফেঅর ডটকমকে বলেন, জাহাজটি হরমুজ প্রণালী পার হয়ে মুম্বাই বন্দরে যাবার কথা থাকলেও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতে তা সম্ভব হয়নি।

“জাহাজটি গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছে। এখনো পর্যন্ত নাবিকদের কোনো সমস্যা হয়নি। জাহাজে নাবিকদের পানি, খাবার, জ্বালানি তেলসহ প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ কয়েক মাসের জন্য মজুদ রয়েছে।”
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাবিকদের জীবন কেমন চলছে জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই নাবিকদের রোটেশন করে জাহাজে ডিউটি করতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় ৩১ নাবিকের সবাইকেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
“প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর ছয়জন করে নাবিক জাহাজের ব্রিজে ও নিচে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি পালায় ব্রিজে তিনজন ও জাহাজের নিচে তিনজন দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এর বাইরে রান্না ও খাবারের জন্য চারজনকে ব্যস্ত থাকতে হয়। আট ঘণ্টা বিশ্রাম শেষে নাবিকদের পুনরায় কাজে ফিরতে হয়।”
ক্যাপ্টেন শফিকুল বলেন, প্রতিবারে দায়িত্ব পালনের সময় জাহাজটি নোঙ্গর ঠিকমত আছে কি না, নোঙ্গর অন্য কোনো জাহাজে সাথে লাগে কি না এবং জাহাজের মাধ্যমে কোনো দূষণ হচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এছাড়া কোন হামলা হচ্ছে কি না সেদিকেও তাদের এখন খেয়াল রাখতে হচ্ছে।
যুদ্ধদিনের দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রতিদিনই আমাদের জাহাজের মাথার ওপর বা দূর দিয়ে মিসাইল উড়ে যাচ্ছে শব্দ করে। তাতে নাবিকরা কিছুটা ভয় পেতে পারেন। কিন্তু জাহাজের নিরাপত্তাসহ সকল নিয়মিত র্কাযক্রম তো আমাদের করে যেতে হবে।”
শারজাহ বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে থাকা অবস্থায় প্রায় প্রতিদিনই মিসাইল ছুটে যাবার দৃশ্য দেখছেন জানিয়ে ক্যাপ্টেন শফিকুল বলেন, “বজ্রপাত দেখলে যেমন মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তার চাইতেও খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা একেক দিন পার করি। কিন্তু আমরা প্রতিদিনই ওই অবস্থার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।‘‘

এই অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সীমিত ইন্টারনেট পরিসেবার মধ্যেও তাদের সাথে কথা বলি। তারাও জিজ্ঞেস করে আমরা কীভাবে দিন কাটাচ্ছি। স্বজনদের সাথে কথা বলার পর নিজেরা হয়ত কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠি। এটা মেরিনারদের থাকতেই হয়। আমরা অটুট মনোবল নিয়েই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।”
বিএসসির এমডি মাহমুদুল মালেক বলেন, “নাবিকদের মনোবল অটুট আছে এবং বিএসসির পক্ষ থেকে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যে কোনো জরুরি অবস্থার মধ্যে করণীয় সম্পর্কে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে একদিন পরেই শুক্রবার ঈদুল ফিতর। জাহাজেই তারা এবারে ঈদের নামাজ পড়বেন। তাদের জন্য ভালো খাবার রান্না করা হবে।
ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, “জয়যাত্রার এবারের চুক্তিতে রোজার ঈদে জাহাজে থাকার কথা ছিল না। হয়ত অন্য কোনো গন্তব্যে আমরা থাকতাম। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে শারজাহ বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে আটকে আছি।”
পুরনো খবর-
'বাংলার জয়যাত্রা' জেবেল আলী বন্দর ছাড়লেও আমিরাতেই 'আটকা'
যুদ্ধের মধ্যে জেবেল আলী বন্দরে আটকা বিএসসির জাহাজ 'জয়যাত্রা'