Published : 05 Mar 2026, 01:59 PM
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে ৩১ বাংলাদেশি নাবিক নিয়ে সাত দিন ধরে আটকে আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা‘।
প্রতিদিনই ওই বন্দরের আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হচ্ছে। সেসব দৃশ্য দেখে আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন বাংলাদেশি জাহাজটির নাবিকরা।
জাহাজের জীবন এমনিতেই কঠিন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ার কথা তুলে ধরে জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “জান হাতে নিয়ে আছি।”
দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে নোঙ্গর করে আছে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা‘। বর্তমানে জাহাজটি থেকে স্টিল কয়েল খালাসের কাজ চলছে।

ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বুধবার গভীর রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা জাহাজ নিয়ে জেবেল আলী বন্দরে আসার পর থেকে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। গত শনিবারে জাহাজের দুইশ মিটার দূরে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলা হয়েছিল।
“ওই ঘটনার পর আমরা সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ি। এরপর প্রতিদিনই জাহাজ থেকে দুবাইয়ের আকাশে মিসাইল ও ড্রোনের আনাগনো দেখছি। আকাশে বিস্ফোরণও হচ্ছে। বন্দরের কাছাকাছি বিস্ফোরণের শব্দও পাচ্ছি মাঝে মাঝে।”
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এভাবেই দিন কাটছে জানিয়ে শফিকুল বলেন, “শুরুতে নাবিকেরা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে নিজেরা ধাতস্ত হয়েছি।”
বিএসসির মালিকানাধীন ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা‘কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জেবেল আলী বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে আসে। পরদিন সেটি বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে ভেড়ে। তিনদিন পর পণ্য খালাস শুরু হয়। খালাস করে জাহাজটি পুনরায় কাতারে যাওয়ার কথা ছিল পণ্য বোঝাইয়ের জন্য।

কিন্তু এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানে হামলা করে বসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টায় ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে। জয়যাত্রার নাবিকরাও অনিশ্চয়তায় পড়েন।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জাহাজটিকে ১০ মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছে বিদেশি একটি কোম্পানি। জেবেল আরী বন্দরে পণ্য খালাস চললেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরবর্তী গন্তব্য কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত। পণ্য খালাস প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর কর্মরত নাবিকরা কোথায় যাবেন তাও ঠিক হয়নি।
জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, জাহাজে এখনো নাবিকদের জন্য পর্যাপ্ত পানি, খাবার ও জ্বালানি তেল রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার, বিএসসি এবং আমিরাতের দূতাবাস থেকে নিয়মিত রাখা হচ্ছে।
“যে কোনো ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের সাহয্য করার প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছেন।”

এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, “জাহাজে থাকা কার্গো খালাসের পর আমাদের কাতারে যাওয়ার কথা থাকলেও এখনকার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তা স্থগিত করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্টিল কয়েল খালাস করা শেষ হলে জাহাজ ভাড়া নেওয়া কোম্পানি বলবে পরবর্তী গন্তব্য কোথায়।”
বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জেবেল আলী বন্দর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক বড় বন্দর। এখন ১০০টির মত জাহাজ রয়েছে। বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও চলমান। বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হলে নাবিকরা সকলে নিরাপদ স্থানে চলে যাব।”
৩৩ বছরের নাবিক জীবন শফিকুল ইসলামের, ১৮ বছর ধরে ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাহাজী জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন এখন। তার বাড়ি চাঁদপুরে; স্ত্রী, সন্তানরা সেখানেই থাকেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন।

শফিকুল বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমাদের সবার পরিবারই উদ্বিগ্ন। তাদের টেনশন কাটানোর জন্য নাবিকরা প্রতিদিনই ফোনে কথা বলেন। তাদের তাদেরও মনোবল চাঙ্গা হয়।”
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচারক কমডোর মাহমুদুল মালেক বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাহাজের সকল নাবিক ভালো আছেন। জাহাজ থেকে তৃতীয় দিনের মতো কার্গো খালাস হচ্ছে। শেষ হতে আরও কয়েকদিন লাগবে।
“তাদের সাথে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি এবং করণীয় সম্পর্কে অবহিত করছি।”