‘বাংলার জয়যাত্রা’ জেবেল আলী বন্দর ছাড়লেও আমিরাতেই ‘আটকা’
“অনেকেই কিছুটা চিন্তিত হলেও জাহাজ তো হামলার শিকার হয়নি, এখনো আমরা বেঁচে আছি বলা যায়,” বলছেন ক্যাপ্টেন শফিকুল।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে ৩১ বাংলাদেশি নাবিকসহ আটকে থাকা ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ পণ্য খালাস শেষ করেছে।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এড়াতে পণ্য খালাসের পর জাহাজটি বন্দর ত্যাগ করে নতুন বাণিজ্যিক গন্তব্যে যাত্রা করলেও নিরাপত্তার স্বার্থে সেটি এখন আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের অদূরে নোঙ্গর করে আছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে জাহাজটি পরবর্তী বাণিজ্যিক গন্তব্যের জন্য জেবেল আলী বন্দর থেকে হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে রওনা দিলেও আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড সদস্যরা ওই পথে পা না ফেলার পরামর্শ দিলে সেটি পুনরায় ফিরে আসে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ শারজাহ বন্দর সীমার ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে বসে আছে বলে বিএসসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিএসসি ও জাহাজে অবস্থানরত নাবিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাজে বেশ কয়েক মাসের খাবার পানি, শুকনোসহ সব ধরনের খাবার এবং পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলও রয়েছে। খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকট না থাকলেও নাবিকরা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে কিছুটা ‘দমে’ গেছেন।
গত ২৬ জানুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আসে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। পরদিন বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে ভেড়ে সেটি।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়। ভেড়ার একদিন পরেই জাহাজ থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলার পর আগুন ধরে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে জাহাজটির ৩১ বাংলাদেশি নাবিকের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর কয়েকদিনের মধ্যে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়। পণ্য খালাস শেষে যানটির পুনরায় কাতারে ফেরার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতে সেটি বাতিল হয়।
জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বুধবার জেবেল আলী বন্দরে জাহাজ থেকে কার্গো খালাস শেষ হয়েছে।
“এরপর আমরা পরবর্তী গন্তব্যের জন্য হরমুজ প্রণালির উদ্দেশে রওনা দিই। জাহাজের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ভারতের মুম্বাই বন্দর।”
সেখানে যেতে হলে যানটিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হবে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতে গুরুত্বর্পূণ এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল র্কাযত বন্ধ হয়ে আছে। এ কারণে এমভি বাংলার জয়যাত্রা বুধবার গভীর রাত সাড়ে ১২টার দিকে হরমুজ প্রণালির ৬৩ নটিক্যাল আগে অবস্থান করে।
ওই সময় আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ডের সদস্যরা জাহাজটিকে নিরাপদে সরে গিয়ে ঝুঁকির্পূণ এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয়।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কমডোর মাহমুদুল মালেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বুধবার হরমুজ প্রণালি এলাকায় মিসাইল আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। সেকারণে এমভি জয়যাত্রা দিক পরিবর্তন করে শারজাহ বন্দরের জলসীমার বাইরে অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, “নিরাপত্তার স্বার্থে জাহাজটি ওই এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। আমরা নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছি।
“হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ডের ছাড়পত্র পাওয়া সাপেক্ষে ‘জয়যাত্রা’ ঝুঁকির্পূণ সমুদ্র এলাকা ত্যাগ করবে।”
জয়যাত্রার সব নাবিক সুস্থ এবং তাদের মনোবল অটুট রয়েছে জানিয়ে বিএসসি এমডি মাহমুদুল মালেক বলেন, “জাহাজে সব ধরনের খাবার ও সুপেয় পানি পর্যাপ্ত রয়েছে, জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বালানি তেলও রয়েছে।
“আগামী কয়েকমাস এসবের কোনো সমস্যা হবে না। নাবিকদের নিরাপদে থাকার জন্য নিয়মিত বিভিন্ন পরামর্শ আমরা দিয়ে যাচ্ছি।”
‘এখনো বেঁচে আছি বলা যায়’
‘এমভি জয়যাত্রা’র ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল একপ্রকার বন্ধই আছে। সেখানে কয়েকটি জাহাজে মিসাইল বা ড্রোন হামলাও হয়েছে।
“গত মঙ্গলবারে একটি চীনা জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে বলে শুনেছি। গত দুইদিন কোনো জাহাজের মুভমেন্ট ছিল না।”
তিনি বলেন, “আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মুম্বাই, জাহাজ ভাড়াকারী প্রতিষ্ঠান এ গন্তব্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়।
“সেকারণে আমরা শারজাহ বন্দরের অদূরে জাহাজ নোঙ্গর করে আছি।”
প্রতিদিনই জাহাজ থেকে মিসাইল বা ড্রোন হামলা দেখছেন জানিয়ে জাহাজে জীবনের ৩৩ বছর পার করা শফিকুল ইসলাম বলেন, “শেলিংয়ের মধ্যেও আমরা ভালোই আছি। অনেকেই কিছুটা চিন্তিত হলেও জাহাজ তো হামলার শিকার হয়নি, এখনো আমরা বেঁচে আছি বলা যায়।
‘‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজ আটকে পড়ায় পরিবারের সদস্যরা সকলেই উদ্বিগ্ন। সীমিত নেটওয়ার্কের মধ্যেই নাবিকরা পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়মিত কথা বলছেন। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রতিকূল পরিস্থিতি সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে পারছেন।”
নাবিক ও জাহাজের নিরাপত্তায় বিএসসির তরফে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এমভি বাংলার জয়যাত্রাকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার করাতে প্রয়োজনীয় কূটনেতিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পররাষ্ট্র সচিব বরাবরে বৃহস্পতিবার চিঠি দিয়েছেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।
