২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি: ‘হাড়হিম’ করা অভিজ্ঞতা জানালেন বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, ওই দুর্ঘটনায় এখনো বাংলাদেশিসহ প্রায় ২৫০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Apr 2026, 07:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:25 PM

আন্দামান সাগরে সম্প্রতি ট্রলারডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া এক রোহিঙ্গা তার সমুদ্রযাত্রার ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। 

মঙ্গলবার জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, আন্দামান সাগরে ওই দুর্ঘটনায় এখনো বাংলাদেশিসহ প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় টেকনাফ উপকূল থেকে ছেড়ে যাওয়া মালয়েশিয়াগামী ট্রলারটি উত্তাল সমুদ্র, তীব্র বাতাস এবং অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই হওয়ার কারণে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ডুবে যায়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বুধবার এক প্রতিবেদনে জানায়, কীভাবে টানা চার দিন ছোট্ট একটি ট্রলারে গাদাগাদি করে থেকেছেন অভিবাসন প্রত্যাশীরা, কোন পরিস্থিতিতে ট্রলারটি ডুবে যায়–তার বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেছেন বেঁচে যাওয়াদের একজন রোহিঙ্গা রফিকুল ইসলাম।   

তিনি বলছেন, ট্রলারটিতে নারী, শিশু এবং সন্দেহভাজন পাচারকারীসহ প্রায় ৩০০ জন গাদাগাদি করে ছিল। সমুদ্রের অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকায় যাত্রীদের টানা চার দিন ও রাত ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ সহ্য করতে হয়। 

নৌবাহিনীর টহল এড়াতে পাচারকারীরা সবাইকে মাছ ও জাল রাখার জন্য তৈরি করা ছোট্ট গুদামের ভেতর থাকতে বাধ্য করেছিল। সেখানে অক্সিজেনের খুব অভাব ছিল। 

“ট্রলার উল্টে যাওয়ার আগেই ওই গুদামে শ্বাসরোধ হয়ে অন্তত ৩০ জন মারা যায়। আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। যখন ট্রলারটি উল্টে যায়, তখন শত শত মানুষ সমুদ্রে পড়ে যায়।” 

রফিকুলের ধারণা, দুর্ঘটনার সময় ট্রলারে প্রায় ২৪০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন নারী এবং বেশ কয়েকজন শিশু ছিল। তারমধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন বাঁচতে পেরেছেন।

রয়টার্স লিখেছে, আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির পর বাংলাদেশের পতাকাবাহী একটি তেলের জাহাজ প্রথমে রফিকুলসহ ৪ জনকে উদ্ধার করে। পরে ওই জাহাজটি সমুদ্রে আরও মানুষ থাকার ব্যাপারে সতর্ক করে ক্রুদের। তারা পরে আরও ৫ জনকে খুঁজে পায়।

রফিকুল গত ৪ এপ্রিল শুরু হওয়া বিপজ্জনক সেই যাত্রার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, যাত্রীরা প্রথমে একটি ছোট মাছ ধরার নৌকায় রওনা হন। পরে মিয়ানমারের জলসীমার কাছে একটি বড় ট্রলারে তাদের তুলে দেয় পাচারকারীরা। এক পর্যায়ে টহলদারদের নজর এড়াতে তাদের ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল।

রয়টার্স লিখেছে, এই ট্র্যাজেডি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চরম হতাশার চিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে, যাদের অনেকেই মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মত দেশে পৌঁছানোর জন্য বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি নিয়ে চলেছেন।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রিত; তাদের বেশিরভাগই মিয়ানমারে ২০১৭ সালের সহিংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিলেন। উন্নত জীবন ও নিরাপত্তার খোঁজে অনেকেই এখনো বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাহায্যকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করে বওছে, মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ার সাথে সাথে পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। 

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) সম্প্রতি কক্সবাজারে ৫০০টি রোহিঙ্গা পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছে, মাত্র ২ শতাংশ রোহিঙ্গা বাবা-মা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী; যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ৮৪ শতাংশ।

এছাড়া খাদ্য বরাদ্দ জনপ্রতি মাসে মাত্র ৭ ডলারে নেমে আসায় অনেক রোহিঙ্গা পরিবার চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রায় ৬৯ শতাংশ শরণার্থী পরিবার জানিয়েছে, তাদের শিশুরা স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। 

এমন পরিস্থিতিতে আইআরসি দাতা সংস্থা এবং কর্তৃপক্ষকে জরুরি ত্রাণ থেকে সরে এসে ‘দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের’ দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। 

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, টেকসই সহায়তা ছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী উভয়ই গভীর দারিদ্র্য ও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

পুরনো খবর

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবে বাংলাদেশিসহ নিখোঁজ ২৫০