Published : 04 Mar 2026, 10:53 PM
চার বছর বয়সে দৃষ্টি হারান মোশাররফ হোসেন। কেউ কেউ হয়তো ভেবে নিয়েছিলেন দৃষ্টিহীন মোশাররফের জীবন বুঝি এখানেই থেমে গেল। অদম্য মোশাররফ থামেননি, তিনি এখন দৃষ্টিজয়ী।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ষাটোর্ধ্ব মোশাররফ হোসেনকে অমর একুশে বইমেলায় পাওয়া গেল ‘ভিজুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি’ (ভিপস) নামে একটি স্টলে। তিনি ভিপসের সভাপতির দায়িত্বে আছেন। এটি মূলত দৃষ্টি প্রতিবন্দ্বী ব্যক্তিসহ সকল প্রতিবন্দ্বী মানুষের জ্ঞান ও সৃজনশীলতার চর্চা এবং আত্মপ্রকাশের একটি সংগঠন।

মোশাররফ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছিলেন, ভিপসের সঙ্গে কাজ করছেন ২৫০ জনের মতো সদস্য। ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টির মতো বই প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে ব্রেইল পদ্ধতির প্রায় ৫০টি বইও আছে।
এই আইনজীবী বলেন, “২০০৫ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত একটি সংগঠন ভিপস। মানসম্মত ব্রেইল বইসহ নানা রকম শিক্ষা উপকরণ আমরা সরবরাহ করি দৃষ্টিহীনদের জন্য।”
বইমেলায় ভিপসের স্টলেও সাজিয়ে রাখা আছে বেশ কয়েকটি ব্রেইল পদ্ধতির বই।
এখানে এসে অনেকে বই পড়েন এবং বই সংগ্রহ করেন, বলেন তিনি।
পাশেই স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনীর স্টল, সেখানে গিয়ে দেখা গেল দুজন শিক্ষার্থী অক্ষর স্পর্শ করে বই পড়ছেন, যেটি ব্রেইল পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত।
দৃষ্টিহীনদের জন্য বিশেষভাবে ছাপানো বই প্রকাশ করে থাকে এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি। এবারের মেলায় ব্রেইল পদ্ধতির ৬টি নতুন বই প্রকাশ করেছে তারা। তাদের স্টলে নতুন বই পড়ার সুযোগও রয়েছে।
স্টলে বসে ব্রেইল পদ্ধতিতে বই পড়ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আইরিন সুলতানা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার।
আইরিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই বইমেলায় এসে স্পর্শের এই স্টলে বই পড়ছি। এখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এবারই প্রথম বইমেলার স্টলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছি।”
স্পর্শ ব্রেইল পদ্ধতির এখন পর্যন্ত ১৬৭টি বই প্রকাশ করেছে বলেও জানান আইরিন। তিনি বলেন, “সারা দেশের পাঁচ শতাধিক পাঠক এখান থেকে বই নিয়ে পড়েন।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় চব্বিশ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আয়েশা আক্তার বইমেলার জন্যই ঢাকায় এসেছেন বলে জানান।
তিনি বলেন, “আমার বাসা ঢাকার রামপুরায়। এখন তো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকি। বইমেলার জন্যই ঢাকায় এসেছি। এখানে এলে আমার মতো অনেকের সঙ্গে দেখা হয়।”

আইরিন ও আয়েশা দুজনই সরকারের দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েও তারা নানা রকম সংকটে থাকেন। তারা তো স্বাভাবিকভাবে বই পড়তে পারেন না। অডিও বই থেকে জ্ঞানার্জন করেন। তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে ব্রেইল পদ্ধতির বই। সরকার থেকে যদি ব্রেইল পদ্ধতির বই প্রকাশে উৎসাহ দেওয়া হয়। সকল প্রকাশনীই যদি ভালো ভালো বই ব্রেইল পদ্ধতিতেও প্রকাশ করে, তাদের জন্য ভালো হয়।
দৃষ্টিহীন না হয়েও দৃষ্টিজয়ীদের স্টলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন ইডেন কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নেছা ঊষা।
তিনি বলেন, “২০২২ সাল থেকে আমি এই সংগঠনে যুক্ত হই। দৃষ্টিহীন যারা আছেন, তারা কিন্তু অনেকেই খুব মেধাবী। তারা একটু যত্ন পেলে অনেকে ভালো কিছু করতে পারেন। তাদের নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আরো কাজ করা উচিত।”
যারা নানা কারণে চোখে দেখতে পান না, তাদের বই পড়ার পরিসরকে আরও বিস্তৃত ও সহজ করার পরিকল্পনা নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল স্পর্শ ফাউন্ডেশন।
২০০৯ সালে তারা প্রথম একটি ছড়ার বই ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রকাশ করে। আর ২০১১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বইমেলায় অংশ নিচ্ছে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী।
প্রকাশক ঐক্যের চিঠি
বইমেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর বুধবার চিঠি দিয়েছে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’।
মেলার মাঠে ‘স্টল বরাদ্দে শর্তভঙ্গ ও বৈষম্য’, ‘অবকাঠামোগত ত্রুটি, ধুলা ও মশার উপদ্রব’সহ বেশকিছু সমস্যার কথা চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকাশক ঐক্য থেকে আমরা একটা চিঠি পেয়েছি। এটি মেলা কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হবে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

সপ্তম দিনে এসেছে ৮১টি নতুন বই
বুধবার ছিল বইমেলার সপ্তম দিন। মেলা চলে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এদিন মেলার তথ্যকেন্দ্রে নতুন বই জমা পড়েছে ৮১টি।
‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস।
সন্জীদা খাতুন স্মরণ
বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় ‘স্মরণ: সন্জীদা খাতুন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান, সেখানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন ভীষ্মদেব চৌধুরী।
মফিদুল হক বলেন, “বিগত বছরের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ সন্জীদা খাতুনের প্রয়াণে এক সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় মানবের সৃজনমুখর কর্মময় দীর্ঘ জীবনের অবসান ঘটে। তার অন্তিমযাত্রা ছিল অনেক অর্থে ব্যতিক্রমী, যে ব্যতিক্রম তৈরি করেছিলেন মানুষটি নিজেই। জীবনজুড়ে নানাভাবে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক ভিন্নতর সত্তা।”
তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় কথা সন্জীদা খাতুনের জীবনসাধনায় আত্মবিকাশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল সমষ্টিবিকাশের ভাবনা। তার ব্যক্তিত্বের বহুমাত্রিকতা নির্মিত হয়েছে কর্মের বিস্তার এবং জীবনভর বহুমুখী সাধনার দ্বারা। ফলে সন্জীদা খাতুনের পরিচিতি ও অবদান কোনো একক অভিধায় চিহ্নিত করা মুশকিল। সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি যেভাবে বিচরণ করেছেন, মানুষের ও সমাজের অন্তরে যে ছাপ রেখে গেছেন, তা একটি সামগ্রিক বিবেচনা দাবি করে।”
মফিদুল হক বলেন, “জীবনে গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির যে সুষমা সন্জীদা খাতুনের অর্জন করেছিলেন এবং বহিরঙ্গে ধারণ করেছিলেন, তা তিনি অন্তরাত্মায়ও পোষণ করতেন। ফলে ভেতরে বাইরে এমন এক সাযুজ্য তিনি গড়ে তুলতে পেরেছিলেন যা তাকে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বময়ী রূপ দিয়েছিল।”
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, “সন্জীদা খাতুন একটি পরিপূর্ণ, মার্জিত ও সম্ভ্রান্ত জীবনযাপন করেছেন। তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নিবিষ্টলিপ্ততা। তিনি গান সম্পর্কে আলোচনা করতে এবং বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পছন্দ করতেন। তার শিক্ষকসত্তার সঙ্গে প্রাবন্ধিকসত্তা, সমালোচকসত্তা ও বিশ্লেষকসত্তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
“নিঃসন্দেহে সংগীতের সামগ্রিক চর্চা, সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও সামাজিকীকরণ তার বহুমুখী অবদানগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে স্থান পাবে।”
অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন, “সন্জীদা খাতুন তার দীর্ঘ কর্মময় জীবনে যা কিছু আত্মস্থ করেছেন, তা শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সংকল্প, প্রত্যয় ও দায়বদ্ধতার ব্যাপারে তিনি কখনো আপস করেননি। তার জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।”

গান-কবিতার আয়োজন
বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি খোকন মাহমুদ ও মনিরুজ্জামান মিন্টু।
আবৃত্তি পরিবেশন করেন সুনৃত সুজন, রূপশ্রী চক্রবর্তী এবং শারমিন সুলতানা জুঁই।
সংগীত পরিবেশন করেন সুমন মজুমদার, বর্ণালী সরকার, সুকন্যা মজুমদার, মুন্নী কাদের, গার্গী ঘোষ, নাদিয়া আরেফিন শাওন।
যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন কাজী মো. ইমতিয়াজ সুলতান (তবলা), মো. নূর এ আলম সজীব (কী-বোর্ড), গাজী আবদুল হাকিম (বাঁশি) ও মো. মেজবাহ উদ্দিন (অক্টোপ্যাড)।
বৃহস্পতিবার যা থাকছে
বৃহস্পতিবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘জন্মশতবর্ষ: সুকান্ত ভট্টাচার্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সুমন সাজ্জাদ। আলোচনায় অংশ নেবেন আহমেদ মাওলা। সভাপতিত্ব করবেন আবদুল হাই শিকদার। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।