Published : 27 May 2026, 01:09 AM
স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে ঘরে ফিরছে মানুষ। এই ঈদযাত্রায় ‘অবধারিতভাবে’ তাদের সঙ্গী হয়েছে বিভিন্ন মহাসড়কে যানজটসহ নানা ভোগান্তি।
সোমবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি এই ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। মঙ্গলবারও ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা সিলেট, ঢাকা ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে এই ভোগান্তি অব্যাহত ছিল।
এ দিন দুপুর থেকে তিন ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আটকে শ্রমিকদের অবরোধ এই রুটে যানজট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যান্য মহাসড়কেও ছিল প্রায় একই চিত্র, কোথাও যানজট আবার কোথাও যানবাহনের ধীর গতি।

বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ঈদের আগের দিন বুধবারও মহাসড়কগুলোতে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মঙ্গলবার বলেছেন, স্বজনদের সঙ্গে ঢাকার বাইরে ঈদ উদযাপন করে নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরে আসার সব ধরনের ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে।
কিন্তু নানাভাবে ভোগান্তিতে পড়া মানুষ তাতে যে খুব একটা আশান্বিত হতে পারছেন না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের উগড়ে দেওয়া ক্ষোভ যেন তার প্রমাণ দিচ্ছে। বরাবরের মতই তারা দুষছেন সড়ক ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকে।
ঈদের সরকারি ছুটির প্রথম দিন সোমবারের ঈদযাত্রা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সকালে যারা ঢাকা ছেড়েছেন মোটামুটি ভোগান্তি ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন। দুপুর পর্যন্ত ঢাকার ছাড়ার ‘এক্সিট ওয়েগুলো’ সামলে রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

কিন্তু দুপুরে আকাশ ভেঙে নামা বৃষ্টি সড়কের শৃঙ্খলা যেন ভেঙেচুরে দেয়। বিকেল থেকেই দেখা যায় যানজট।
উত্তরের পথে দুপুরের পর থেকে ভোগরা বাইপাস, চন্দ্রা মোড়, বাইপাইল এসব এলাকায় প্রচণ্ড যানজট তৈরি হয়। ঢাকা থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরের চন্দ্রা পার হতেই অনেকের সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লেগে গেছে।
ওইদিন রাতে ঢাকা থেকে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানসহ কুড়িগ্রামের পথে রওনা দিয়ে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েন ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম সারওয়ার।
তিনি বলেন, “রাত ৯টার গাড়ি ছেড়েছে ১১টায়। ধামরাই, কালামপুর (মানিকগঞ্জ) হয়ে বাস চালক সরাসরি টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার গিয়ে ওঠেন। এরপরও যমুনা সেতু যখন পার হয়েছি, তখন সকাল ৭টার মত বাজে। চন্দ্রা দিয়ে যারা এসেছেন তাদের আরো বেশি সময় লেগেছে।
“এরপর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে কিছুটা জ্যাম পোহাতে হয়েছে। রংপুর মডার্ন মোড়েও বেশ খানিকক্ষণ যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। দুপুরে কুড়িগ্রাম পৌঁছেছি।”
রাজশাহীর যাত্রী ইমরান হাসান বলছেন, “কাল রাতে গাবতলী থেকে যানজট তো মনে হয় কলাবাগান পর্যন্ত এসে পড়েছিল। কল্যাণপুর যাব বাস ধরতে, এটুকু যেতেই দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গেল। তারপর গাবতলী থেকে বের হতে আরো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।”

উত্তরবঙ্গের যাত্রী ব্যবসায়ী হাসিবুর রহমানও নানা ভোগান্তিতে পড়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “টার্মিনালকেন্দ্রিক বাস ব্যবস্থাপনা করাটা আমরা শিখলাম না। সব গাড়ি ছাড়ে রাস্তা থেকে। চন্দ্রায় যেখানে বাস বে করে দেওয়া হয়েছে সেখানে তো বাস দাঁড়িয়ে থাকেই। সামনে পেছনে সড়কগুলোতেও দুই থেকে তিন সারিতে বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। পুলিশ সদস্যদের বাস চালকরা যেন পাত্তাই দিচ্ছেন না।
“বিজিবি সদস্যরা দেখলাম লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কেবল সার্জেন্ট এসে গাড়ির কাগজপত্র চাইলেই বাস চালকরা একটু তৎপর হচ্ছে। এভাবে তো চলতে পারে না।”
যমুনা সেতুর টোল প্লাজার টোল আদায়ের সমালোচনা করে এই ব্যবসায়ী বলেন, “যমুনা সেতুর ২৭ বছর হয়ে গেল। অথচ আমরা এখনো অটোমেটেড টোল কালেকশন করতে পারলাম না। অন্তত ঈদের সময় তো কিছু বুথ বাড়ানো যায়। এখন যমুনা সেতু পার হলেই চমৎকার রাস্তা। অথচ টোল দিতে জ্যামে পড়তে হচ্ছে।”



বৃষ্টি বিঘ্নিত ঈদের যানজটময় পরিস্থিতিতে আবার মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর ত্রিপদ্রি এলাকায় বেতন-বোনাসের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে নেমেছিলেন একটি কারখানার পোশাক শ্রমিকরা। প্রায় তিন ঘণ্টা পরে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে এবং টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে সরিয়ে দেয়।
কিন্তু ততক্ষণে যানজট কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়।
‘চৈতি গার্মেন্টস’ নামে ওই পোশাক কারখানার মালিক সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্য।
কাচপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি শামীম শেখ বলেন, “দুপুর থেকে চৈতি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বেতন ও বোনাসের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করে। এতে সড়কের একটি লেনে যানজটের সৃষ্টি হয়।”

এই পথের যাত্রী মাহফুজুল হক শিপন ফেইসবুকে লিখেছেন, “মদনপুর থেকে সোনারগাঁ পর্যন্ত জ্যাম। দেড় ঘণ্টার বেশি এক জায়গায় বসে আছি। কোনো গাড়ি চলে না। হাইওয়ে পুলিশ বৃষ্টিতে চানাচুর মুড়ি মাখা খায়।”
নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় ঢাকা সিলেট মহাসড়কে যানজট যেন নিত্যদিনের নিয়তি। ঈদযাত্রায় বৃষ্টিতে সেখানে আরো খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে টঙ্গী থেকে ভালুকা পর্যন্ত থেমে থেমে যানজটে পড়ার তথ্য দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এই সড়কের যাত্রী ইমরুল হাসান শিহাব বলছেন, “ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ বেশি দূরে না হলেও ভোগান্তিটা খুবই ভয়াবহ। প্রথমত বাসওয়ালারা সিন্ডিকেট করে রেখেছে। বাড়তি ভাড়া না দিতে চাইলে আপনাকে টিকিটের জন্য আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এরপর বাসে উঠে ভুগতে হবে যানজটে।”
সোমবার বিকেলে তিনি ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে মধ্যরাতে বাড়ি পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন।