Published : 17 May 2026, 01:09 PM
সকালে উঠে ফোন, অফিসে কম্পিউটার, বাড়ি ফিরে আবার ফোন। মাঝে মাঝে শুয়ে শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করা। এই রুটিন এখন প্রায় সবার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
তবে এর মাঝে একটা প্রশ্ন করুন নিজেকে— হাতে কি মাঝে মাঝে ঝিঁঝি ধরে? আঙুল অবশ লাগে? কব্জিতে ব্যথা করে?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে শরীর আপনাকে একটা সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আর সেই বার্তাটা এখনই বোঝা দরকার।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন বলছেন, “প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ অভিশাপ হয়ে উঠতে পারে যদি অতি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। দীর্ঘক্ষণ একনাগাড়ে স্মার্টফোন ধরে রাখা বা কম্পিউটারে কাজ করার ফলে হাতের সূক্ষ্ম স্নায়ুর ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে 'রিপেটিটিভ স্ট্রেন ইনজুরি', যা দীর্ঘ মেয়াদে হাতের কার্যক্ষমতাই কমিয়ে দিতে পারে।
কম্পিউটারে কাজ করেন? কার্পাল টানেল সিনড্রোম চেনেন?
অফিসে যারা সারাদিন কম্পিউটারে কাজ করেন, তাদের জন্য সবচেয়ে পরিচিত সমস্যাটার নাম ‘কার্পাল টানেল সিনড্রোম।’
ডা. নয়ন বলেন, “আমাদের কব্জির ভেতর দিয়ে একটি সরু পথে যায় 'মিডিয়ান নার্ভ' নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু। দীর্ঘক্ষণ ভুল ভঙ্গিতে কিবোর্ড বা মাউসে হাত রেখে কাজ করলে এই স্নায়ুর ওপর বারবার চাপ পড়তে থাকে। ফলে হাতের তালু আর আঙুলে, বিশেষ করে বৃদ্ধাঙ্গুলি, তর্জনী আর মধ্যমায় ঝিঁঝি ধরার মতো অনুভূতি হয়। কখনো সুচ ফোটার মতো লাগে, কখনো আঙুল অবশ হয়ে আসে। অনেকের ক্ষেত্রে রাতে হাতের ব্যথায় ঘুম ভেঙে যায়।”
শুরুতে মৃদু মনে হলেও অবহেলা করলে এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। অনেকে বুঝতেই পারেন না যে প্রতিদিনের কম্পিউটার ব্যবহারই এর কারণ।
ফোনে কথা বলেন কানে ধরে? বিপদ ঘনাচ্ছে কনুইতে
কম্পিউটার ব্যবহারকারী নন, তবু হাতের সমস্যায় ভুগছেন? কারণটা হয়তো ফোনে কথা বলার ভঙ্গি।
অনেকেই দীর্ঘক্ষণ কনুই ভাঁজ করে ফোন কানে ধরে রাখেন। সোফায় শুয়ে বা বিছানায় হেলান দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন স্ক্রল করেন।
এই ভঙ্গিতে কনুইয়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া 'আলনার নার্ভ' সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই সমস্যার নাম ‘কিউবিটাল টানেল সিনড্রোম’। সহজ ভাষায় অনেকে এটাকে বলেন 'সেলফোন এলবো'।
লক্ষণের মধ্যে আছে- কনিষ্ঠা আর অনামিকায় অবশভাব আসে, আঙুলে শক্তি কমে যায়। দীর্ঘ মেয়াদে এই সমস্যা আঙুলের স্বাভাবিক নড়াচড়াই ব্যাহত করতে পারে।
বুড়ো আঙুলে ব্যথা করছে? কারণটা মোবাইলেই
স্মার্টফোনে যারা প্রচুর টাইপ করেন বা গেম খেলেন, তারা একটা সমস্যায় পড়েন যেটার নাম 'টেক্সট ক্ল'। এক নাগাড়ে আঙুল দিয়ে টাইপ করতে থাকলে হাতের পেশিগুলোয় খিঁচুনি ও ব্যথা হয়।
আর বুড়ো আঙুলের কথা আলাদা করে বলতে হয়। স্মার্টফোনে স্ক্রল করা, টাইপ করা, সোয়াইপ করা— এই সব কাজে বুড়ো আঙুলটাই সবচেয়ে বেশি খাটে। এই অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বুড়ো আঙুলের রগ ফুলে গিয়ে একটি যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা তৈরি হতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের যাকে বলে ‘ডি কোয়েরভেইন’স টেনোসিনোভাইটিস’।
নামটা কঠিন, আর ব্যথাটা আরও কঠিন। এই সমস্যায় বুড়ো আঙুল নাড়াতে গেলেই তীব্র ব্যথা হয়।
ছোট পরিবর্তনে বড় সুরক্ষা
ভালো খবর হল, সামান্য কিছু অভ্যাস বদললেই এই সমস্যাগুলো থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
“প্রতি বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট কাজ করার পর একটু বিরতি নিতে হবে। হাত আর আঙুলগুলো একটু স্ট্রেচ করতে হবে। মুঠি শক্ত করে ধরুন, তারপর ছেড়ে দিন। এই সহজ ব্যায়ামটুকু দিনে কয়েকবার করলে স্নায়ুর ওপর চাপ অনেকটা কমে”- পরামর্শ দেন ডা. নয়ন।
কিবোর্ড ব্যবহারের সময় কবজি সোজা রাখতে হবে। মাউস ব্যবহারের সময় হাত যেন ঝুলে না থাকে, সেদিকে খেয়াল দিতে হবে। চেয়ার আর টেবিলের উচ্চতা ঠিক রাখার জরুরি, যাতে হাত স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে।
দীর্ঘক্ষণ ফোনে কথা বলতে হলে কানে ধরে না রেখে হেডফোন বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যেতে পারে। কনুই ভাঁজ করে রাখার সময়টা যত কম করা যায়, তত ভালো।
টাইপ করার বদলে মাঝে মাঝে ভয়েস মেসেজ পাঠান— এতে বুড়ো আঙুলও একটু বিশ্রাম পায়।
শুরুতেই সতর্ক হওয়া জরুরি
হাতের স্নায়ুর সমস্যা শুরুতে মৃদু মনে হয়। একটু ঝিঁঝি ধরা, একটু অবশ লাগা— এগুলো অনেকেই গায়ে মাখেন না। ভাবেন কাজের চাপে হচ্ছে, একটু বিশ্রামেই সেরে যাবে।
“তবে এই অবহেলাটাই পরে বড় বিপদ ডেকে আনে।
ডা. আফসানা সতর্ক করছেন, “দীর্ঘমেয়াদে অবহেলা করলে এই সমস্যা স্থায়ী পক্ষাঘাত বা অস্ত্রোপচারের দিকেও মোড় নিতে পারে।”
তাই প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হাত দুটো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অঙ্গ। প্রতিদিন কত কাজ করা হয় এই দুটো দিয়ে — লেখা, রান্না, সন্তানকে আদর করা। এই হাতের যত্ন নেওয়াটা তাই বিলাসিতা নয়, বরং বেশি প্রয়োজনীয়।
আরও পড়ুন
পায়ের আঙুলে ব্যথা হওয়ার কারণ ও করণীয়