Published : 20 Jan 2026, 12:59 AM
দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কারা প্রার্থী থাকছেন আর কারা সরে দাঁড়াচ্ছেন তা সুস্পষ্ট হবে একদিন পরই; জানা যাবে দলীয় ও স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে থাকছেন কারা।
তফসিল অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের পরদিন দেওয়া হবে প্রতীক। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে আরও একদিন পর ২২ জানুয়ারি-বৃহস্পতিবার।
এরইমধ্যে ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়ে গেছেন প্রার্থীরা। নানা কায়দায় ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন, নিজেদের জানান দিচ্ছেন। এরমধ্যেই ভোটে থাকা প্রধান দলগুলো নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আপিল শুনানির সময়কালে টানা দুদিন নির্বাচন ভবনের সামনে অবস্থান, ঘেরাও কর্মসূচি হয়েছে।
বিএনপি পোস্টাল ব্যালটে প্রতীক বিন্যাসে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছে। জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। এনসিপি বলছে, নির্বাচন কমিশন যদি পক্ষপাত দুষ্ট আচরণ করে সেটা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে এবং নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন একটি দলের হয়ে কাজ করছে বলেও অভিযোগ দলটির।
এসব অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, নিরপেক্ষভাবে কাজ করছেন তারা। সবার জন্যই সমান সুযোগ তৈরি করা হবে। সব দলের অংশগ্রহণে হবে সুষ্ঠু নির্বাচন।

‘ইসি কোনো চাপে নেই, অভিযোগ থাকলে খতিয়ে দেখা হবে’
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, কমিশন একদমই কোনো চাপে নেই। সবাই চায় ভাল নির্বাচন, কমিশনও তাই চায়।
তিনি বলেন, সবাই ইসিতে এসে নিজেদের অভিযোগ, পরামর্শ জানাচ্ছেন। এতে কমিশন সমৃদ্ধ হচ্ছে। ছোট সমস্যার সমাধান করে যাচ্ছে কমিশন।
"ইসি বড় সমস্যার সম্মুখীন এখনো হয়নি। রাজনৈতিক দলের বক্তব্য আমরা খতিয়ে দেখছি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি।"
এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, আপিল শুনানিতে মনে হয়েছে, একটি ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে। প্রার্থীরা যেভাবে শুনানিতে নিজেদের বক্তব্য রেখেছেন, ভোটের মাঠেও তারা তাদের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন বলে মনে করছে কমিশন।
“কমিশন একদমই কোনো চাপে নেই। কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেও না। আমরা শতভাগ নিরপেক্ষ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
‘শক্ত হতে হবে ইসিকে’
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের পরিবেশ বজায় রাখতে দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে এখন শক্ত ভূমিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম।
সোমবার তিনি বলেন, “তিনটি বড় দল নির্বাচন কমিশনে এসে নালিশ করছে। তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ বা এরকম কথা বলা হচ্ছে, প্রশাসন তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ-এমন কথাবর্তা হচ্ছে। একই সঙ্গে আবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে গিয়ে নালিশ করছে।”
ইসির সামনে একদল কর্মীর অবস্থান ও আন্দোলন হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে সেসময় এভাবে অভিযোগ, আন্দোলন দেখা যায়নি। বেশিরভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি ছিল শান্ত, স্বাভাবিক, কোনো ঝামেলা ছিল না।
“এবার এগুলো দেখতে পাচ্ছি। এটা অনাকাঙ্খিত। জানি না কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে (ইসি)। নির্বাচন করতে গেলে নির্বাচন কমিশনকে শক্ত ভূমিকা রাখতে হয়। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা করতে হয়। কিন্তু আমরা এবার শুধু নালিশ, অভিযোগ। যেন আমরা অভিযোগের নির্বাচনের মধ্যে ঢুকে পড়ছি। শুধু অভিযোগ হচ্ছে। এটা চলতে থাকলে সামনে প্রচারণার সময়, প্রতীক বরাদ্দের পর অভিযোগ বাড়তে পারে।”

অভিযোগ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি ভিন্নরকম হওয়ার শঙ্কার কথা তুলে ধরেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং ২০১৪, ২০১৮, ২০১৪ সালের নির্বাচন তদন্ত কমিশনের এই সদস্য।
তিনি বলেন, “এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা হচ্ছে-নির্বাচন কমিশনকে শক্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এবং একই সঙ্গে রাঝনৈতিক দলগুলোর উচিত কমিশন ও সরকারকে সহায়তা করা। এছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো রাস্তা নেই। কারণ, এভাবে চলতে থাকলে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে; এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।”
ভোটার, প্রার্থী, দলকে আস্থায় ফেরাতে ইসির ভূমিকার বিষয়ে আব্দুল আলীম বলেন, যারা ব্যত্যয় ঘটাচ্ছে তাদেরকে জবাবদিহি করা, শাস্তির আওতায় আনা, জরিমানা করতে হবে। প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে প্রয়োজনে বেশি অন্যায় করলে প্রার্থিতা বাতিলের মত শক্ত পদক্ষপ নিতে হবে।
এদিকে নির্বাচন সম্পর্কিত যেকোনো অভিযোগ ও পরামর্শ তাৎক্ষণিকভাবে সরকারকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে যে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সরকার তা নেবে। কেউ যেন আইন অমান্য না করতে পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
সপ্তাহ তিনেক পর ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হবে। আপিল শুনানি শেষে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫৪ জন। আপিলে ৪১৮ জন প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন। তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপির অভিযোগে আপিল হয়েছিল এমন ৩০ জনের মত ছাড় পেয়েছেন।
এসব প্রার্থিদের মধ্যে কারা থাকছেন আর কারা সরে দাঁড়াচ্ছেন তা জানা যাবে মঙ্গলবার মনোনয়নপ্রত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে। এরপর শুরু হবে প্রচার।
আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই মনোনয়নপত্র বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
তিন দলের নালিশ-অভিযোগ নিয়ে যা বলছে ইসি
তিন দলের অভিযোগ ও নালিশের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা মনে করি, সব দল থেকে যখন সমালোচনা করে তখন আমরা মনে করবো নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি। এক দল থেকে সমালোচনা করলে অন্য দল বলতো- আমি নিরপেক্ষতা হারিয়েছি, তাদের পক্ষে করছি। যখন কয়েক দলই বলে তখন বলবে ওনাদের (ইসি) মর্জিমত কাজ করছে।
“ইসি তার আইন অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী বাস্তবসম্মত (যেটা) মনে করে, যেটা ন্যায়ানুগ ও সঠিক মনে করে সেটাই করছে।”
এতে কেউ কেউ নাখোশ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলো যা বলে তা তাদের রাজনৈতিক কৌশল, স্ট্র্যাটেজি। আমাদের বিরুদ্ধে বলে মনে করি না।”
পোস্টাল ব্যালট, দলীয় প্রধানদের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের আপিলে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসির অবস্থান তুলে ধরেন এই নির্বাচন কমিশনার।

তিন দলের বিষয়ে কী পদক্ষেপ
বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, প্রবাসে লাইভ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবে, কোনো অনিয়মের শঙ্কা নেই। এছাড়া দেশের পোস্টাল ব্যালটে সব প্রতীক থাকবে না। শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও প্রতীক দিয়ে ব্যালট পেপার দেওয়া হবে।
“সাধারণ ব্যালটের মত দেশের ভেতরে পোস্টাল ব্যালট হবে।”
পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ব্রিফিংয়ে সবগুলো দলের প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে মঙ্গলবার বৈঠক করে ব্রিফিং করা হবে বলে জানান তিনি।
জামায়াতের দাবির বিষয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা পেশাদারত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। কারো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
দলটির প্রধানের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
তিনি বলেন, “জামায়াতের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে একটা আবেদন করেছে, আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফরোয়ার্ড করেছি। যার যতখানি দরকার প্রয়োজন অনুসারে সরকার দেবে, সবার একরকম ঝুঁকি নয়। সবার জন্য সমান সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে আমরাও বলি। জামায়াতের প্রধানকে প্রটেকশনসহ গাড়ি দেওয়া হবে জেনেছি।”
দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে এনসিপির অভিযোগের
বিষয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা বড় বড় আইনজীবির মতামত নিয়েছি। একটা জায়গায় উপণীত হয়েছি সকলের জন্য- তারা যদি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পূর্বে পরিত্যাগপত্রের দরখাস্ত সংশ্লিষ্ট ফোরামে জমা দেয়, ফিসহ জমা দেয় এবং ওই রাষ্ট্রের দূতাবাস নিশ্চিত করে আবেদন ও ফি পেয়েছে। তাহলে প্রার্থীর তরফ থেকে যা দেওয়ার কথা তা করেছে, দূতাবাস বা রাষ্ট্রের পার্টটা তারা করবে। একেক দেশে একের রকম।”
তিনি বলেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিহার করে যথাসময়ে, যথাস্থানে দরখাস্ত দিয়ে থাকলে, প্রযোজনীয় দলিলাদি ও ফি জমা দিয়ে থাকলে এবং নাগরিকত্ব ফেরত না আনতে পারেন এমন পর্যায়ে চলে গেলে ইসি সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ (ক) অনুযায়ী পরিত্যাগ করেছে বলে গণ্য হবে।
তার ভাষ্য, সব দল, সবার জন্য এক নিয়ম করা হয়েছে। এ কারণে ৩০ জনের মত ছাড় পেয়েছে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের ডিএলআর রুলিং অনুযায়ী, ঋণ খেলাপির গ্যারান্টার দায়ী হবে না।
“সুপ্রিম কোর্টের রুলিংয়ের প্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি, চোখের সামনে যেন ঋণ খেলাপি না চলে যায়।”
শোকজ করলে সবার আগে তারেক রহমানকে করা উচিত: এনসিপি
বিএনপির 'মবের মুখে' দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ইসি সুস্পষ্ট অবস্থান নেয়নি
'এক নেতাকে' বাড়তি নিরাপত্তা-প্রটৌকল 'পক্ষপাতমূলক', প্রধান উপদেষ্ট
বাইরের ভোটার রাজধানীতে আনছে 'একটি দল', তথ্য চাইল বিএনপি
ইসির 'আশ্বাসে' নির্বাচন ভবন এলাকা ছাড়ল ছাত্রদল
ভোটে দ্বৈত নাগরিকরা সুযোগ পেলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি এনসিপির
কেউ যেন না ভাবে কমিশন 'ঘুমাচ্ছে': পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ইসি সানাউল্লাহ
বিধি লঙ্ঘন: শোকজের জবাব দিলেন নাহিদ-পাটওয়ারী
ভোট নিয়ে অভিযোগ-পরামর্শ তাৎক্ষণিক জানানোর আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার