বিশ্বকাপ ফুটবল: কাতারের কার্বন প্রতিশ্রুতি নিছকই প্রতিশ্রুতি?

কার্বন নির্গমনশূন্য রাখতে কাতার নানা পদক্ষেপ নিলেও বিশ্বকাপের দর্শক আনা-নেওয়ায় বেড়েছে বিমান চলাচল, যা প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে হয়েছে বাধা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 2 Dec 2022, 03:19 AM
Updated : 2 Dec 2022, 03:19 AM

বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হতে আবেদনের সময়ই কাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা এই টুর্নামেন্টকে প্রথমবারের মতো একটি শূন্য কার্বন নির্গমনের আয়োজনে পরিণত করবে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধের আন্দোলনকারীরা কাতারের এই প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে ঘোরতর সংশয় প্রকাশ করেছিল।

আসলেই কি কাতার তাদের এই প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে রয়েছে? - জানার চেষ্টা করেছে বিবিসি।

বিশ্বকাপ ফুটবলকে বলা হয়, গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। এক মাসের এই আয়োজনে মেতে ওঠে গোটা বিশ্ব। এবার বিশ্বকাপ মরুর বুকে গেলেও মাতামাতি আগের মতোই। সারাবিশ্ব থেকে দর্শকরা ভিড় করেছে উপসাগরীয় ছোট্ট এই দেশে।

কাতারে হোটেলে আবাসন সুবিধার ব্যাপক সংকটের কারণে বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট দেখতে যাওয়া হাজার হাজার দর্শক প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থান করছে, বেশি থাকছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

তাই ভক্ত-সমর্থকদের খেলার দিন স্টেডিয়ামগুলোতে আনা-নেওয়ার জন্য চালু হয়েছে শাটল ফ্লাইট। কাতারের রাজধানী দোহা থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে দিনে এ ধরনের ৫০০ ফ্লাইট যাতায়াত করছে। শুধু দুবাই থেকেই দিনে ১২০টি ফ্লাইট ওঠানামা করছে দোহায়।

আর এই বিমান পরিবহনের মাধ্যমে সমর্থকদের স্বাগতিক দেশে আনা-নেওয়ার কারণে পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়টি ধরা পড়েছে পরিবেশবাদীদের চোখে।

ফ্রান্সের প্যারিস-ভিত্তিক কার্বন নিঃসরণ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রিনলির হিসাবে, বিশ্বকাপ শুরুর দিন থেকে এসব শাটল ফ্লাইট চলাচলের কারণে দিনে ৬ থেকে ৮ হাজার টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন হচ্ছে প্রকৃতিতে।

পরিবেশবাদী গোষ্ঠী কার্বন মার্কেট ওয়াচের কর্মী খালেদ দিয়াব বলছেন, এই বিপুল সংখ্যক শাটল ফ্লাইটের চলাচল টুর্নামেন্ট চলার সময় উড়োহাজাজ চলাচল কমিয়ে রাখার বিষয়ে আয়োজকদের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তার বরখেলাপ।

তিনি বলেন, “একটি ছোট্ট এলাকার মধ্যে এতগুলো স্টেডিয়াম নির্মাণের বড় যুক্তিই ছিল বিমান চলাচল কমানো, যাতে কার্বন নির্গমন কম হয়।”

বিবিসি জানায়, বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট উপলক্ষে ১২ লাখের বেশি দর্শকের গমনাগমন প্রত্যাশিত ছিল। অথচ গোটা কাতারে মাত্র ৩০ হাজার হোটেল কক্ষ রয়েছে, যার ৮০ শতাংশই আবার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা আগাম বুকিং দিয়ে রেখেছিল অংশগ্রহণকারী দলের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও পৃষ্ঠপোষকদের থাকার জন্য।

আবাসন সুবিধা বাড়াতে টুর্নামেন্টের আয়োজকরা খালি থাকা অ্যাপার্টমেন্ট, ভিলা, ফ্যান ভিলেজ ও মরুতে ঐতিহ্যবাহী তাঁবুতে দর্শনার্থী ও সমর্থকদের থাকার ব্যবস্থা করে। কিন্তু সেগুলোর ভাড়া অনেক বেশি হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বেছে নেন বিকল্প পথ।

আর এই বিকল্পগুলোর অন্যতম হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বড় শহর দুবাই। দুবাই স্পোর্টস কাউন্সিলের হিসাবে, এই টুর্নামেন্ট উপলক্ষে সেখানে নিয়মিত পর্যটকের চেয়ে ১০ লাখ বেশি এখন অবস্থান করছে।

শাটল ফ্লাইটগুলো এসব দর্শনার্থী ও ফুটবল ভক্তদের দুবাই ও প্রতিবেশী অন্যান্য শহর থেকে ভেন্যুতে গিয়ে দিনে দিনে খেলা দেখে আবার তাদের আবাসস্থলে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রাইভেট জেট বিমান এবং ভাড়া করা বিমানের চাহিদাই চোখে পড়ার মতো। ওই অঞ্চলের বিভিন্ন শহর থেকে প্রতিদিন এসব বিমান কাতারে যাওয়া-আসা করছে।

কার্বন মার্কেট ওয়াচের খালেদ দিয়াব বলেন, এত পরিমাণ ফ্লাইটের ওঠানামা প্রমাণ করছে যে একটি শূন্য কার্বন-নির্গমনের টুর্নামেন্ট আয়োজন করার যে প্রতিশ্রুতি আয়োজকেরা দিয়েছিলেন, তারা আসলে ওই প্রতিশ্রুতির বিষয়ে আন্তরিক ছিলেন না।

তিনি বলেন, “যদি আসলেই তারা এমনটি চাইতেন, তাহলে এর বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করতেন, যেমন প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে সড়ক পথে চলাচলের ব্যবস্থা করা।”

অবশ্য টুর্নামেন্টের আয়োজক কাতার সরকার তাদের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে।

বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, এই শাটল ফ্লাইট সার্ভিস ‘কার্বন-সাশ্রয়ী’ ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

তিনি বলেন, “সরাসরি চলাচল করা ফ্লাইটগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে বিরতি নিয়ে চলা ফ্লাইটগুলোর চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন সাশ্রয়ী। তাছাড়া টুর্নামেন্টের আটোসাঁটো সূচির কারণে খেলা দেখতে আসা সমর্থকরা অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটও ব্যবহার করতে চাইতেন না।”

টুর্নামেন্টের কারণে মোট কার্বন নির্গমনের হিসাবে এই শাটল ফ্লাইট থেকে নিঃসরিত কার্বনের হিসাবও যোগ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে কাতার।

আয়োজকদের ধারণা, বিশ্বকাপের আয়োজনে ৩৬ লাখ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন হবে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে, যার সবচেয়ে বড় অংশের (৫২ শতাংশ) জোগান হবে ভ্রমণজনিত কারণে।

তবে গবেষকেরা বলছেন, এই হিসাব খুবই কমিয়ে ধরা হয়েছে। গ্রিনলির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেকসিস নরম্যান্ডের ধারণা, চূড়ান্ত হিসাবটি আয়োজকদের প্রত্যাশার চেয়ে অন্তত ৭০ শতাংশ বেশি হবে।

তিনি বলেন, “২০২২ সালের টুর্নামেন্টটি সবচেয়ে দূষণ সৃষ্টিকারী টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে। এই বিশ্বকাপ একটি শূন্য কার্বন নিঃসরণের আয়োজন হবে- এমনটা আশা করা একটি কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।”

টুর্নামেন্টকে কার্বন নির্গমনমুক্ত রাখতে আয়োজকেরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয়, যার মধ্যে আছে, স্টেডিয়ামে সৌর-শক্তি চালিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিঃসরণের দায় কমাতে কার্বন ক্রেডিট কেনা, নির্মাণ উপকরণ হিসেবে শিপিং কনটেইনারের ব্যবহার।

বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে কাতার সাতটি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করেছে। এরমধ্যে একটি, স্টেডিয়াম ৯৭৪, সম্পূর্ণ শিপিং কনটেইনার ও মডুলার ইস্পাতে নির্মিত এবং টুর্নামেন্টের পরে এটা সরিয়ে ফেলা হবে। অন্য স্টেডিয়ামগুলো অবশ্য থেকেই যাবে।

এই টুর্নামেন্ট আয়োজন উপলক্ষে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ হিসাবের বিষয়ে আয়োজকরা জানিয়েছে, এসব স্টেডিয়ামকে ভবিষ্যতের দশকগুলোতে অর্থবহ কাজে ব্যবহার করা হবে এবং তাদের নির্মাণে যতটা কার্বন নির্গমন হয়েছে, তার তুলনায় খুবই কম কার্বন নির্গমন করা হবে।

গ্রিনলির সিইও নরম্যান বলেন, এই ধরনের কথা টুর্নামেন্টের কারণে কার্বন নির্গমনের সত্যিকারের হিসাবকে খাটো করছে।

তিনি আরও বলেন, “আয়োজকেরা নিঃসরণের দায় থেকে মুক্ত হতে কার্বন ক্রেডিট কিনতে আস্থা রাখছে এমন সব প্রকল্পে, যেগুলো এখনও পুরোপুরি সনদ পায়নি।”

ভবিষ্যতে এ ধরনের কৌশলের পরিবর্তন হওয়াটা জরুরি উল্লেখ করে নরম্যান বলেন, “এ ধরনের বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের সময় সেটাকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর একটি উপলক্ষ্য ধরে বিনিয়োগ করা উচিৎ, এর উল্টোটা করা ঠিক হবে না।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক