Published : 14 Jan 2026, 12:33 AM
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো অভিযানের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের দাবি, নিরস্ত্র মানুষের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ কেবল স্লোগান দিয়েছে আর হত্যার শিকার হয়েছে। এটা ছিল ‘একতরফা যুদ্ধ’।
বিবিসি এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে এই প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা। ইরান এবং বাদবাকী বিশ্বের মধ্যে নীরবতা ভেঙে কর্তৃপক্ষের কষাঘাতে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও সাহস করে যারা বিক্ষোভে হত্যাযজ্ঞ নিয়ে মুখ খুলেছেন, তাদের একজন হচ্ছেন ওমিদ।
নিরাপত্তার স্বার্থে ৪০ এর কোঠার বয়সের এই বাসিন্দার ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। বিবিসি জানায়, দক্ষিণ ইরানের এই বাসিন্দা ছোট্ট একটি শহরের রাস্তায় গত কয়েকদিন ধরে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভে ছিলেন।
তিনি জানিয়েছেন, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর কালাশনিকভ-ধরনের রাইফেল দিয়ে গুলি চালিয়েছে। ওমিদের কথায়, “আমি নিজের চোখে দেখেছি তারা (নিরাপত্তা বাহিনী) সরাসরি বিক্ষোভকারীদের লাইনে গুলি চালিয়েছে।
“মানুষ যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই মাটিতে পড়ে গেছে। আমরা খালি হাতে একটি বর্বর শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছি,” বলেন তিনি।
ওদিকে, ইরানের রাজধানী তেহরানের এক তরুণী গত বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতিকে ‘কেয়ামত’ বা ‘বিচার দিবস’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, “সেদিন প্রচুর মানুষ বিক্ষোভে নেমেছিল। এমনকি তেহরানের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত মানুষে ভর্তি ছিল। কিন্তু শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনী কেবল হত্যাই করে গেছে।
“নিজের চোখে এসব দেখে আমি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি। শুক্রবার ছিল একটা রক্তঝরা দিন।” তার কথায়, বর্তমানে তেহরান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তবে এটি একতরফা যুদ্ধ। কারণ একটি যুদ্ধে দুইপক্ষের হাতেই অস্ত্র থাকে। আর এখানে একদিকে রয়েছে ভারি অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী, আর অন্যদিকে আছে কেবল স্লোগান দেওয়া নিরস্ত্র মানুষ।”
তেহরানের পশ্চিমের ফারদিস শহরে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, গত শুক্রবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অধীন প্যারামিলিটারি বাহিনী বাসিজ ফোর্সের সদস্যরা হঠাৎ করেই বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ চালায়।
ইউনিফর্ম পরা এবং মটরসাইকেলে চড়ে আসা ওই প্যারামিলিটারি সদস্যরা সরাসরি বিক্ষোভকারীদের ওপর তাজা গুলি ছোড়ে। কয়েকটি চিহ্নবিহীন গাড়িও গলিতে গলিতে ঢুকে পড়ে এবং গাড়ির ভেতর থেকে বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হচ্ছিল, যারা বিক্ষোভে জড়িত ছিল না।
“প্রতিটি গলিতেই এভাবে দুইজন বা তিনজন গুলিতে নিহত হয়েছে” বলে জানিয়েছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী। বিবিসি পার্সিয়ানকে যারা এই হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিয়েছেন তারা বলছেন, ইরানের ভেতরকার বাস্তবতা বহির্বশ্বের জন্য কল্পনা করাও কঠিন।
স্থানীয় কয়েকজন মানুষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, বিভিন্ন শহরে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছে, যা হতে পারে শত শত থেকে হাজার হাজার।
ইরান এতদিন পর্যন্ত নিহতের কোনও পরিসংখ্যান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করলেও মঙ্গলবার দেশটির এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, নিহতের সংখ্যা ২ হাজারের মতো হবে। এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও আছে বলে জানান তিনি।
তিনি এই মৃত্যুর জন্য সন্ত্রাসীদের দায়ী করেন। ইরানের গণমাধ্যম বিক্ষোভ চলাকালে ১০০ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে। বিক্ষোভকারীদেরকে দাঙ্গাকারী আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, তারা বিভিন্ন শহরে মসজিদ ও ব্যাংকে আগুন দিয়েছে।
বিবিসি পার্সিয়ানে যারা কথা বলেছেন এবং ভিডিও পাঠিয়েছেন সেগুলো মূলত এসেছে তেহরান এবং এর কাছাকাছি কারাজ, উত্তরের রাসত, উত্তরপূর্বের মাশহাদ ও দক্ষিণের সিরাজের মতো বড় শহরগুলো থেকে। এই শহরগুলোতে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট অনেকটা সচল রয়েছে।
আর ছোট ছোট বিভিন্ন শহর- যেখানে এর আগে হত্যার ঘটনা ঘটেছে- সেগুলো থেকে তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি ইন্টারনেট পরিষেবা খুবই সীমিত থাকার কারণে।
তবে বিভিন্ন শহর থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলোর মধ্যকার ধারাবাহিকতা এবং বয়ানের সাযুজ্য থেকেই দমনাভিযানের ভয়াবহতা এবং প্রাণঘাতী সহিংসতার ব্যাপকতা কতটা তা প্রতীয়মান হয়েছে।
বিবিসি’র সঙ্গে কথা বলা নার্স এবং চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন, তারা অসংখ্য মৃতদেহ এবং আহত বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে আনতে দেখেছেন।
তারা জানান, বহু শহরেই হাসপাতালগুলো মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং মারাত্মক জখম হওয়া অনেকেরই চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। এই আহতদের বেশিরভাগেরই মাথা এবং চোখে আঘাত ছিল।
কোনও কোনও প্রত্যক্ষদর্শী লাশ স্তুপাকারে রাখা দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। রোববার টেলিগ্রাম চ্যানেল ভাহিদ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কিছু গ্রাফিক ভিডিওতে তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারে লাশের স্তূপ এবং স্বজনদের হাহাকার দেখা গেছে।
মাশহাদ শহরের এক মর্গের কর্মী জানান, শুক্রবার ভোরে মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ১৮০ থেকে ২০০টি মৃতদেহ মর্গে আনা হয়েছিল। সেগুলো দ্রুত সমাহিত করা হয়।
বিবিসি পার্সিয়ানকে রাসত শহরের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ৭০ জন বিক্ষোভকারীর মৃতদেহ বৃহস্পতিবার শহরের হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছিল। নিহতদের এসব মৃতদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের আগে নিরাপত্তা বাহিনী ‘বুলেটের দাম’ দাবি করেছে বলেও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবারেই পূর্ব তেহরানের একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসাকর্মী বিবিসি পার্সিয়ানকে বলেন, এদিন প্রায় ৪০ টি লাশ হাসপাতালে আনা হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস রোববার বলেছিলেন, “সম্প্রতি কয়েকদিনে ইরানে সহিংসতার খবর এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের মাত্রাতিরক্তি শক্তির ব্যবহারে মানুষের মৃত্যু ও জখম হওয়ার ঘটনায় তিনি স্তম্ভিত।”
ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক বিশেষ জাতিসংঘ দূত মাই সাতো বিবিসি পার্সিয়ানকে বলেন, ইরানে নিরাপত্তা বাহিনী যে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করছে সেটি উদ্বেগজনক।
গত ২৮ ডিসেম্বর, রাজধানী তেহরানের কয়েকটি বাজারে অর্থনৈতিক সঙ্কটের জেরে ছোট ছোট বিক্ষোভ থেকেই ইরানে বিক্ষোভের শুরু। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে। মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, রিয়ালের দরপতন- সব মিলিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণ জনগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামতে থাকে লাগাতার।
গত বৃহস্পতিবার থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ইরানের নির্বাসিত শেষ শাহ এর ছেলে রেজা পাহলভির সরকারের বিরুদ্ধে আরও জোরালো প্রতিবাদের ডাকের পরই রাস্তা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র কোনোভাবেই পিছু হঠবে না। এরপর থেকেই নিরাপত্তা বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বিক্ষোভ দমন-পীড়ন আরও জোরালো করে।