সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যুক্ত হয়েছিলেন, স্বীকারোক্তি শামীমা বেগমের

আইএস সদস্যদের মাধ্যমে ব্যাপক নির্দেশনা পাওয়ার পাশাপাশি সিরিয়া যাত্রা বিষয়ে তার নিজস্ব কিছু পরিকল্পনাও ছিল বলে জানিয়েছেন শামীমা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Jan 2023, 08:46 AM
Updated : 11 Jan 2023, 08:46 AM

স্কুলশিক্ষার্থী থাকাকালে যুক্তরাজ্য ছেড়ে যাওয়ার পর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করে নিয়েছেন শামীমা বেগম; তার প্রতি জনসাধারণের ক্ষোভের বিষয়টিও বুঝতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

নিরাপত্তা ঝুঁকিজনিত কারণে শামীমার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বছরখানেকেরও বেশি সময় ধরে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোতে এই নারী বলেছেন, আইএস সদস্যদের মাধ্যমে ব্যাপক নির্দেশনা পাওয়ার পাশাপাশি সিরিয়া যাত্রা বিষয়ে তার নিজস্ব কিছু পরিকল্পনাও ছিল।

ওই যাত্রা নিয়ে বিবিসি পডকাস্ট ‘দ্য শামীমা বেগম স্টোরি’তে তিনি আরও বলেছেন, যুক্তরাজ্য ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ায় তিনি ‘স্বস্তি’ পেয়েছিলেন, আর কখনো দেশটিতে ফিরে আসার প্রত্যাশাও ছিল না তার।

যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা যে এখন তাকে ‘তাদের যাপিত জীবনে, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিপজ্জনক, ঝুঁকিপূ্র্ণ বা সম্ভাব্য বিপদ হিসেবে দেখে, তাও জানেন বলে জানান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এ নারী।

“তারা যেমনটা ভাবে, আমি তেমন মানুষ নই,” বলেছেন তিনি। 

২০১৯ সালে আইএস তাদের তথাকথিত ‘খেলাফত’ হারানোর পর সিরিয়ার বিভিন্ন বন্দিশালা ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজারও নর-নারী, শিশুর মধ্যে বিশ্বজুড়ে শামীমার মতো পরিচিতি আর কেউ পাননি।

বন্দিশালা ও আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে থাকা ওই হাজার হাজার মানুষ এমন সব দেশ থেকে সিরিয়া গিয়েছিলেন, যারা আর তাদের ফেরত নিতে চায় না।

বর্তমানে ২৩ বছর বয়সী শামীমা সিরিয়া থাকাকালে তিন সন্তানের মা হয়েছিলেন, তিনটি শিশুই মারা গেছে। এই নারী এখন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ফিরে পেতে ও লন্ডনে ফিরতে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন।

শামীমা কি যৌন নির্যাতনের লক্ষ্যে পাচারের শিকার হওয়া নারী ছিলেন নাকি আইএসের স্বেচ্ছাসেবক হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েই দেশ ছেড়েছিলেন, শুনানির কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার এই প্রশ্নই ঘুরপাক খেয়েছে।

গণহারে হত্যা, গুম, শিরশ্ছেদের মতো নির্মম বর্বরতার জন্য কুখ্যাতি আছে আইএসের। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়িত্বে থাকা এর কয়েকটি ইউনিট ২০১৫ সালে প্যারিসে ও ২০১৬ সালে ব্রাসেলসে সুনির্দিষ্ট হামলার জন্য দায়ী। গোষ্ঠীটি ম্যানচেস্টার অ্যারেনায় বোমাবাজি ও ২০১৭ সালে লন্ডন ব্রিজে হামলার দায়ও স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে।

শামীমা জানান, ব্রিটিশরা যে তাকে ‘সম্ভাব্য বিপজ্জনক’ হিসেবে দেখছে তা তিনি জানেন, তবে তিনি ‘মোটেও খারাপ মানুষ নন’। জনসাধারণ যে তাকে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করছে, তার জন্য গণমাধ্যমকেও দোষারোপ করেছেন তিনি। বলেছেন, গণমাধ্যমই বারবার ঘুরেফিরে তাকে এমনভাবে হাজির করেছে, যে মানুষ তাকে ‘বিপজ্জনক’ বলেই ধরে নিয়েছে।

ব্রিটিশ সমাজের লোকজন যে তার উপর ক্ষুব্ধ, বিষয়টি বুঝতে পারছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে এ তরুণী বলেন, “হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি।

“কিন্তু আমার মনে হয় না, তাদের এই ক্ষোভ আমার প্রতি, এই ক্ষোভ আইএসআইএস-র প্রতি,” আইএসের অন্য একটি নাম ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া ব্যবহার করে বলেন শামীমা।

তবে যুক্তরাজ্যের সাবেক শিশু বিষয়ক মন্ত্রী টিম লুটন বিবিসিকে বলেছেন, শামীমা বেগম কেন কৈশোরেই আইএসে যোগ দিলেন বা ‘কোন ধরনের শক্তি’ তার মগজ ধোলাই করেছে, তা পরিষ্কার হওয়া না গেলেও তিনি যখন প্রথম নিখোঁজ হন, তখন জনসাধারণের মধ্যে তার জন্য যে সহানুভূতি ছিল, ক্রমেই তা ক্রোধে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ফিরতে শামীমা এখন নাটক করছে বলেও অনেকে মনে করেন, বলেছেন তিনি।

শামীমা বলেছেন, বেথনেল গ্রিন থেকে আইএস অধ্যুষিত রাক্কায় যাওয়ার জন্য তিনি এবং আরও দুই কিশোরী নিজেরাই নানান বিষয়ে ব্যাপক খোঁজখবর নিয়েছিলেন, এর পাশাপাশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির সদস্যরাও তাদেরকে বিস্তৃত নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করেছিল।

“অনলাইনে থাকা লোকজন আমাদের অনেক কিছু বলেছিল। কী করতে হবে, কী করা যাবে না সে সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছিল, বিস্তৃত নির্দেশনার দীর্ঘ তালিকা ছিল, যার মধ্যে ছিল ধরা পড়লে কী গল্প ফাঁদতে হবে তাও,” বলেছেন আইএসে ক্যাম্পে ও বন্দিশিবিরে কিশোরী থেকে নারী হয় ওঠা শামীমা।

নিজেরা যেসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল ভ্রমণ খরচ আর আইএস অধ্যুষিত সিরিয়ায় প্রবেশের আগে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময়ের জন্য টুকটাক তুর্কি ভাষা জানা।

এই তিন তরুণীর পরিবারগুলোর প্রতিনিধিত্ব করা আইনজীবী তাসনিম আকুঞ্জি জানান, তিন কিশোরী দেশ ছাড়ার পর তিনি তাদের ঘরে রসিদ, ফোন বিল, মোবাইল মেসেজ বা ইমেইলের খোঁজে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছিলেন।

কিন্তু তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি, এই বয়সী কিশোরীদের ক্ষেত্রে যা অস্বাভাবিক ছিল।

“যাদের সঙ্গে কথা বলেছিল তাদের প্রতি তাদের এমনই বিশ্বাস ছিল যে, তারা খুবই সতর্কতার সঙ্গে সেসব নির্দেশনা অনুসরণ করেছিল,” বলেন তাসনিম।

শামীমার ঘরে এক টুকরো কাগজ মিলেছিল, যাতে ৭৫ পাউন্ডে একটি ফোন ও ৪ পাউন্ডে মোজা কেনা এবং ১০০ পাউন্ডের ট্যাক্সি ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি জানা যায়।

শামীমা জানান, ওই কাগজটি তার নয়, খুব সম্ভবত আমিরার ছিল। শামীমাসহ যে তিন কিশোরী আইএসে যোগ দিতে একসঙ্গে যুক্তরাজ্য ছেড়েছিল, তার মধ্যে আমিরাও ছিলেন।

“আমরা আমাদের পালিয়ে যাওয়া সংশ্লিষ্ট সবকিছু মুছে ফেলতে ব্যাপক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমাদেরই একজন ছিল স্টুপিড,” বলেছেন তিনি।

সিরিয়া যাত্রার সময় ব্যাগে যথাসম্ভব কম জিনিসপত্র নেওয়ার চেষ্টার কথাও বলেছেন এই নারী; জানান, সিরিয়ায় পাওয়া যাবে না ভেবে ৩০টির মতো পেপারমিন্ট মিল্ক চকলেট বাবল বারও জোগাড় করেছিলেন তিনি।

“ওই দেশে আপনি অনেক কিছুই পেতে পারেন, কিন্তু মিন্ট চকলেট পাবেন না,” বলেছেন শামীমা।

তার স্কুলের সাবেক এক সহপাঠী নারী জানান, স্কুলে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না শামীমা, ছিলেন নীরব প্রকৃতির, বন্ধুর সংখ্যাও ছিল হাতেগোনা।

আইএসে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গে শামীমা আরও বলেন, “আমার পরিবার আমাকে দুর্বল ভাবত, মনে করত যে আমি এ ধরনের পাগলামি করতে পারবো না। যে কারণে তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি যে আমি (আইএসে যোগ দিতে) চলে যাবো।”

“আমি সবসময়ই নির্জনে থাকতে পছন্দ করা মানুষ। আমার জীবন যেভাবে গণমাধ্যমে চলে এসেছে তা আমার জন্য সত্যিই কঠিন হয়ে উঠেছে, কেননা আমি মোটেও মনোযোগের কেন্দ্রে থাকতে পছন্দ করা মানুষ নই,” বিবিসিকে বলেছেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক