Published : 20 Sep 2026, 03:17 PM
নাইজেরিয়ার প্রাচীন লোককথা ‘হোয়াই দ্য স্কাই ইজ ফার অ্যাওয়ে’। গল্পটি মূল সংগ্রাহক ও পুনর্কথক মেরি-জোন গার্সন একজন মার্কিন লেখক ও মনোবিজ্ঞানী। তিনি মূলত বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রাচীন লোককথাগুলো সংগ্রহ করে শিশু-কিশোরদের উপযোগী ভাষায় রূপান্তরের জন্য বেশি পরিচিত। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত এ গল্পে মূলত প্রকৃতির সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার ও অপচয়ের পরিণামের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন হোপ মেরিম্যান।
বহু কাল আগের কথা। তখনকার পৃথিবীর রূপ ছিল আজকের চেয়ে একেবারেই আলাদা। সে এক আশ্চর্য সময়, যখন আকাশ আজকের মতো এত দূরে ছিল না। আকাশ ছিল পৃথিবীর একদম কাছাকাছি। মানুষ মাটিতে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেই অনায়াসে আকাশ ছুঁতে পারত! সেই যুগে আকাশই ছিল মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন ও খাদ্যের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার।
সেসময় মানুষদের বেঁচে থাকার জন্য মাঠে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কোনো কাজ করতে হতো না। ভোরবেলা উঠে জমিতে লাঙল চালাতে হতো না, বীজ বুনতে হতো না। রান্নাবান্না করার জন্য কাঠকুটো জোগাড় করা বা আগুন জ্বালানোরও কোনো দরকার ছিল না। যখনই কারও খিদে পেত, সে কেবল হাত বাড়িয়ে মাথার ওপর থেকে আকাশের কিছুটা অংশ ছিঁড়ে নিত এবং তা পরম তৃপ্তিতে খেত।
আকাশের একেক জায়গার স্বাদ ছিল একেক রকম। মেঘের কোনো টুকরোর স্বাদ ছিল গাছপাকা মিষ্টি কলার মতো, কোনোটা বা আগুনে পোড়ানো সুস্বাদু আলুর মতো। গ্রীষ্মের ঝকঝকে হলুদ আকাশ মুখে দিলে মনে হতো তাজা, রসালো আনারস। আবার শীতের সন্ধ্যার রঙিন মেঘের স্বাদ ছিল মশলাদার মাংসের স্টু বা নরম নারকেলের মতো। ভোরের শিশিরভেজা গোলাপি আকাশ মুখে দিলে মনে হতো যেন বনের মধুর মতো মিষ্টি খাবার।
রাজ্যে খাদ্যের কোনো অভাব ছিল না। মানুষ পেট ভরে খেত আর মহা আনন্দে দিন কাটাত। কাজের চাপ না থাকায় গ্রামের মানুষ অবসরে সৃজনশীল কাজে মগ্ন থাকত। পুরুষেরা সুন্দর কাঠের খোদাই করত, মেয়েরা মনের মাধুরী মিশিয়ে অপূর্ব কাপড় বুনত। রাতে গ্রামের মানুষ খোলা মাঠে গোল হয়ে বসে গান গাইত, নাচত। তাদের একজন প্রজাদরদী রাজা ছিলেন, নাম ‘ওবা’। তার রাজপ্রাসাদে ভৃত্যরা প্রতিদিন সকালে আকাশের বিভিন্ন অংশ ছিঁড়ে সুন্দর সুন্দর নকশা তৈরি করে রাজকীয় ভোজসভায় পরিবেশন করত।
কিন্তু অফুরন্ত খাবার আর আরাম-আয়েশ পেয়ে মানুষ ধীরে ধীরে লোভী ও বেপরোয়া হয়ে উঠল। তারা আকাশের এই উদারতার কোনো মূল্যই দিল না। দরকারের চেয়ে অনেক বেশি আকাশ ছিঁড়ে নিতে শুরু করল। যতটা খেতে পারে, তার চেয়েও বড় টুকরো অকারণে ছিঁড়ে নিত। অর্ধেক খেয়ে পেট ভরে গেলে অবশিষ্টাংশ অবলীলায় ছুড়ে ফেলে দিত ময়লার স্তূপে। শিশুরা আকাশের টুকরো দিয়ে বল বানিয়ে খেলত আর শেষে মাটিতে ফেলে দিত। প্রতিদিন উচ্ছিষ্ট আকাশের স্তূপ বাড়তে লাগল পুরো রাজ্য জুড়ে।
মানুষের এই অবহেলা আর অপচয় দেখে আকাশ ভীষণ কষ্ট পেল। সে প্রতিদিন নিজেকে উজাড় করে দেয়, আর মানুষ তাকেই অর্ধেক খেয়ে ময়লার মতো ছুড়ে ফেলে! আকাশের এই কষ্ট একসময় রূপ নিল ক্ষোভে, আর ক্ষোভ পরিণত হলো রাগে। একদিন ভোরবেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে এল চারদিক। কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল। আকাশে দেখা দিল বিদ্যুতের ঝিলিক আর ভয়ংকর বজ্রপাত। সেই গর্জনের মধ্যে আকাশ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে উঠল, “হে মানুষ! তোমরা আমার দেওয়া অমূল্য খাবারের কোনো সম্মান করছ না। তোমরা প্রতিদিন অবলীলায় খাবার নষ্ট করছ। আমি শেষবারের মতো সাবধান করে দিচ্ছি, যদি আর কখনো কাউকে খাবার নষ্ট করতে দেখি, তবে আমি চিরকালের জন্য দূরে চলে যাব। আর কখনো খাবার দেব না।”
আকাশের ধমক খেয়ে মানুষ ভয়ে কেঁপে উঠল। রাজ্যের রাজা ওবা দ্রুত ঘোষণা করে দিলেন, “যার যতটুকু খিদে, সে যেন ঠিক ততটুকুই ছিঁড়ে নেয়। কেউ আকাশ নষ্ট করলে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।” রাজার আদেশে সবাই কিছুদিন খুব সাবধানে থাকল। কেউ আর এক টুকরো আকাশও নষ্ট করল না। খাওয়ার পর আকাশকে ধন্যবাদ জানাতেও ভুলল না।
কিন্তু মানুষের স্মৃতি বড়ই দুর্বল। কিছুদিন পর রাজ্যে এক বিরাট বার্ষিক উৎসবের আয়োজন করা হলো। রাজা ওবার সম্মানে আয়োজিত এ উৎসবে রাজ্যের সব মানুষ জড়ো হলো। চারদিকে বাজতে লাগল ঢাক-ঢোল আর ঘণ্টা। রঙিন পোশাক পরে মানুষ আনন্দে নাচতে ও গাইতে লাগল। উৎসব উপলক্ষে প্রাসাদের টেবিলগুলো সাজানো হলো আপেল, বরই, আম, আনারস—নানা স্বাদের ও রঙের আকাশ দিয়ে। আকাশও সেদিন ছিল উদার, ভেবেছিল মানুষ হয়তো নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে।
সেই রাজ্যেই ওসাতো নামে এক ভীষণ লোভী নারী বাস করত। তার দুই হাত ভরা থাকত পিতলের চুড়িতে, গলায় থাকত ভারী প্রবালের মালা। এত গয়না ও প্রাচুর্য থাকার পরও সে জীবনে সন্তুষ্ট ছিল না। খাবারে তার ছিল সীমাহীন লোভ। উৎসবের দিন ওসাতো প্রথমে এক বিশাল টুকরো আনারস স্বাদের হলুদ আকাশ খেল। এরপর খেল গরম, মশলাদার মাংসের স্টু স্বাদের আকাশ। শেষে ভোরের গোলাপি নরম আকাশও সে গপগপ করে গিলে ফেলল। খেতে খেতে তার পেট একদম ফুলে ঢোল হয়ে গেল। সে এতই খেল যে তার নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
উৎসব শেষে রাতে রীতিমতো হাঁপাতে হাঁপাতে সে নিজের বাড়িতে ফিরে এল। গলা পর্যন্ত খাবারে ভর্তি থাকলেও ওসাতোর লোভী চোখ তখনো ওপরের মুক্ত আকাশের দিকে। সে ভাবল, “রাতের আকাশের স্বাদ ঠিক কেমন হতে পারে? লেবুর মতো? নাকি মধুর মতো?” তার জিভে জল চলে এল। সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে তার আর একটুও খিদে নেই, আর আকাশও অপচয় না করতে কড়াভাবে সাবধান করে দিয়েছে। কিন্তু তার লোভ কিছুতেই শান্ত হলো না। সে ভাবল, “আকাশ তো এত বিশাল! আমি আর ছোট্ট এক টুকরো নিলে আকাশের কী-ই বা এমন ক্ষতি হবে! কেউ টেরও পাবে না।”
এই ভেবে ওসাতো আকাশের এক টুকরো কেটে মুখে দিল। অপূর্ব স্বাদ পেয়ে তার লোভ আরও বেড়ে গেল। সে চামচ ফেলে দুই হাত দিয়ে আকাশ খামচে ধরে বিশাল এক টুকরো ছিঁড়ে আনল। সেই বিশাল টুকরোটা দিয়ে অনায়াসে একটা পরিবারের অনেক দিনের খাবার হয়ে যেত।
কিন্তু মাত্র দু-তিন কামড় দেওয়ার পরই ওসাতো বুঝল, তার পক্ষে আর এক বিন্দুও গেলা সম্ভব না। ভয়ে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে দৌড়ে তার স্বামী, ছেলেমেয়ে ও পাড়াপড়শিদের ডাকল। কিন্তু সবার পেটই উৎসবে এত ভরা ছিল যে, কেউ এক টুকরো আকাশও খেতে পারল না। উপায় না দেখে রাতের অন্ধকারে ওসাতো সেই বিশাল আকাশের টুকরোটি বাড়ির পেছনের ময়লার গাদায় ফেলে দিল।
পরদিন সকালে মানুষ দেখল এক ভয়ংকর কাণ্ড! প্রবল বেগে বাতাস বইতে শুরু করেছে আর আকাশ ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠছে। গাছ ও পাহাড়ের চূড়া ছাড়িয়ে আকাশ উঠতে লাগল আরও ওপরে। ওপর থেকে আকাশের গম্ভীর গলা ভেসে এল, “আমি তোমাদের দরকারি সবকিছু অকাতরে দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা লোভ সামলাতে পারোনি। আমি চিরকালের জন্য দূরে চলে যাচ্ছি, আর কোনোদিন নিচে নামব না।”
মানুষ হাহাকার করে উঠল। ওসাতো নিজের ভুলের জন্য মাটিতে লুটিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। তখন মাটি বা পৃথিবী শান্ত গলায় বলল, “তোমরা কেঁদো না। আকাশ চলে গেছে, কিন্তু আমি তোমাদের খাবার দেব। তবে তার জন্য তোমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। মাটি খুঁড়ে বীজ বুনতে হবে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাতে হবে। তবেই তোমরা এক মুঠো খাবারের আসল মূল্য বুঝবে। আর মনে রাখবে—প্রকৃতির দান কখনো অপচয় কোরো না।”
সেই দিন থেকে মানুষ আর কখনো আকাশ ছিঁড়ে খেতে পারল না। তাদের মাঠে নামতে হলো, শুরু হলো কৃষিকাজ। আর মাথার ওপরে থাকা নীল আকাশ আজও ঠিক ততটাই দূরে রয়ে গেছে, মানুষকে তাদের লোভ আর অপচয়ের শাস্তির কথা মনে করিয়ে দিতে।