Published : 17 Sep 2026, 10:24 PM
ঢাকার চারুকলা ইন্সটিটিউটে পড়ার সময় পেন্সিল দিয়ে স্কেচ খাতার পাতায় কোনোমতে একটা দরখাস্ত লিখে, সঙ্গে ছবি দিয়ে নাট্যদল 'আরণ্যকের' সদস্য হওয়ার আবেদন করেছিলেন চঞ্চল চৌধুরী। এরপর এক বছর অপেক্ষা করে দুইশ জনের ভিড় ঠেলে দলে সুযোগ পান।
প্রথম এক দশক মঞ্চের পেছনেই কাজ করেছেন। অভিনয় করবেন এমন কোনো লক্ষ্য তার ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে দর্শকের সামনে আসেন।
এক পর্বের নাটক ও ধারাবাহিক ছাড়াও মনপুরা সিনেমার সোনাই হয়ে আসেন বড় পর্দায়। আয়নাবাজিতে একাই ছয় চরিত্রে অভিনয় করেন। 'হাওয়া' সিনেমায় জেলে চাঁনমাঝি থেকে হয়ে ওঠেন ‘পদাতিক’ এ মৃণাল সেন।
গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ 'আড্ডানামার’ সপ্তম পর্বে অতিথি হয়ে এসেছিলেন চঞ্চল চৌধুরী। সেখানে তার অভিনয়জীবনের গল্প তিনি বলেছেন।
শৈশবে গ্রামে হ্যাজাকবাতির আলোয় যাত্রাপালা দেখে অভিনয়ের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার। তবে মঞ্চ থেকে টিভি নাটক হয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখা–কোনো কিছুই পূর্বপরিকল্পিত ছিল না।
শুনিয়েছেন মৃণাল সেনকে নিয়ে কলকাতার পরিচালক সৃজিত মুখার্জির সিনেমা 'পদাতিক'–এ অভিনয়ের গল্প। যে সময় তিনি ওই চরিত্রের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বাবাকে হারান। পেশাদারত্বের জায়গা থেকে বাবার মৃত্যুর দুদিন পর চরিত্রের লুক নির্বাচন, শুটিংয়ের সময় পার করার কঠিন সময়েরও গল্পও বলেছেন।
বিনোদন জগতের চলমান সংকট ও কাজের নেপথ্য বাস্তবতা নিয়েও কোনো রাখঢাক রাখেননি চঞ্চল। ওটিটি ও মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে বাজেট কমে যাওয়া, শিল্পীর সঠিক মূল্যায়নের অভাব নিয়েও কথা বলেছেন।
তার বিশ্বাস, অভিনয়ের প্রস্তাব হাতে আসার পর চরিত্রটিকে আগে নিজের বিশ্বাসে নিয়ে আসতে হয়। তাহলেই দর্শকের বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব।
আড্ডনামা সঞ্চালনা করেছেন অভিনেত্রী নিমা রহমান। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।
আগের ছয় পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, আফজাল হোসেন, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।
পদ্মাপাড়ের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা
পাবনার সুজানগর থানার কামারহাট গ্রামে পদ্মার পাড়েই চঞ্চল চৌধুরীর শৈশব ও বেড়ে ওঠা। আট ভাই-বোনের মধ্যে তার পাঁচ বোন ও তিন ভাই। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, যিনি ২০২২ সালে মারা যান; মা গৃহিণী।
চঞ্চল বলেন, "আমরা যে গ্রামে বড় হয়েছি ছোটবেলা থেকে, ওইরকম গ্রাম আমি দেখিনি। কারণ আমি যখন কলেজে পড়ি তখন আমাদের গ্রামে ইলেকট্রিসিটি এসেছে। তার আগ পর্যন্ত আমরা ওই হারিকেনের আলোতে পড়াশোনা করে বড় হয়েছি। রাস্তাঘাট সব ছিল কাঁচা, মাটির রাস্তাঘাট ছিল। শীতের সিজনে ধুলা রাস্তা, আবার এই বর্ষার সিজনে এরকম হাঁটু পর্যন্ত কাদা। তার মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি, মহিষের গাড়ি, গরুর গাড়ি চলত।"
১৯৯১ সালে যখন কলেজে পড়েন, তখন গ্রামে প্রথম বিদ্যুৎ আসে। গ্রামে তখন কোনো সাধারণ টেলিভিশন ছিল না; চেয়ারম্যানের বাড়ি ও বন্ধু তোফাজ্জলের দোতলা কাঠের বাড়িতে ব্যাটারিচালিত সাদাকালো টেলিভিশনে খেলা বা অনুষ্ঠান দেখতেন তারা।
চঞ্চল বলেন, "প্রতিদিন গোসল করতাম পদ্মায়। নদীতে সাঁতার কেটে এবং মাঝখানে আবার চর পড়ত। আমরা যেটা আমাদের ভাষায় বলি 'কোল'। কোলটা পেরিয়ে সাঁতরে চরে যেতাম। প্রতিদিন বিকেলবেলা গিয়ে ওখানে ফুটবল খেলতাম।"
চঞ্চল জানিয়েছেন, ‘মনপুরা’ সিনেমায় এক হাত দিয়ে জামাকাপড় মাথার ওপর ধরে অন্য হাতে সাঁতার কাটার দৃশ্যটি ছিল তার পদ্মার চরে ফুটবল খেলতে যাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই করা।
পাশের গ্রামের উদয়পুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফরিদপুরের রাজবাড়ী কলেজে ভর্তি হন চঞ্চল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি তার যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে ছিলেন তার 'জীবন মামা'।
গ্রামে তখন ডেকোরেটর বা সাইনবোর্ড লেখার লোক ছিল না। মামা বিয়েবাড়ির ডেকোরেশন, ঝালর কাটা ও হালখাতার লেখালেখি করতেন। মামার কাজ দেখতে দেখতেই আঁকাআঁকি ও লেখার প্রতি আগ্রহ জন্মায় চঞ্চলের।
অভিনয়ের আগ্রহ কীভাবে? চঞ্চল বলেন, "গ্রামে প্রত্যেক বছর যাত্রাপালা হত। হ্যাজাকবাতি জ্বালিয়ে বছরের নির্দিষ্ট একটা সময়ে যাত্রা হত। সেসময় গ্রামটা খুব অসাম্প্রদায়িক ছিল, হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে যাত্রা দেখত। আমার বাবা সেটা কোঅর্ডিনেট করত, গ্রামের ছেলেরা অভিনয় করত। স্কুল ঘরের পাশে সেটার রিহার্সাল হত। সেটা দেখেই বড় হয়েছি।"
চঞ্চলের কথায়, তার অভিনয়ের শেকড় সেই যাত্রা থেকেই শুরু হয়।
স্কেচ খাতায় দরখাস্ত লিখে 'আরণ্যক' নাট্যদলে
চারুকলার বকুলতলার পাশে আউটডোরে ছবি আঁকার সময় বন্ধু রাহুল আনন্দের (গানের দল জলের গানের সংগীতশিল্পী) মাধ্যমে ‘আরণ্যক’ নাট্যদলের কথা প্রথম জানতে পারেন চঞ্চল।
রাহুল তখন আরণ্যকের 'জয়জয়ন্তী' নাটকে বাঁশি বাজাতেন।
চঞ্চল স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, "আমি রাহুলকে বললাম যে জয়জয়ন্তী কী? তারপর আরণ্যক, কিছু কিছু শব্দ শুনলাম। তো বলল, জয়জয়ন্তী হচ্ছে আমাদের একটা মঞ্চ নাটক, যেটা এখন চলে প্রত্যেক মাসে একটা-দুটো করে শো হয়, গাইড হাউজ, মহিলা সমিতি এসব জায়গায় শো হয়। ওই নামগুলো তখন নতুন আমার কাছে, যে গাইড হাউজ কী? মহিলা সমিতি কী? জয়জয়ন্তী কী? আরণ্যক কী? তা সে বললো আরণ্যক নাটকের দল। তো আমি বললাম এখানে কী কী করতে হয়? রাহুল বললো, মঞ্চনাটক। তো আমি জিজ্ঞেস করলাম যাত্রা? তো বলে যে, না, যাত্রার মত না কিন্তু ফরম্যাটটা কাছাকাছি।
"আমি বললাম, আমি যদি এখানে ভর্তি হতে চাই বা কাজ করতে চাই? তো তখন বলল যে হ্যাঁ, আরণ্যকে নাট্যকর্মী নেবে। তখন ওই স্কেচ খাতার মধ্যে আমি পেন্সিল দিয়ে একটা অ্যাপ্লিকেশন লিখলাম। মানিব্যাগ থেকে একটা সাদা-কালো পাসপোর্ট সাইজের ছবি ছিল, সেটা অ্যাটাচ করে রাহুলকে দিলাম। রাহুল সেটা আরণ্যকে গিয়ে জমা দিল।"
এক বছর পর দল থেকে ডাক পান চঞ্চল। অভিনেতার ভাষ্য, "ইন্টারভিউ দিলাম। প্রায় ২০০ ছেলেমেয়ে, ২০০ এর মধ্যে বোধহয় ১০ জন কি ১২ জনকে রাখল, ১৫ জনের একটা ওয়ার্কশপের ভেতর দিয়ে আরো ছাঁটাই করে, ফাইনালি আমাদের গ্রুপ থেকে আমরা বোধহয় পাঁচ কি ছয়জন আরণ্যকে নাট্যকর্মী হিসেবে, প্রাথমিক সদস্য হিসেবে সুযোগ পেলাম কাজ করার।"
নিজের এলাকার ভাষার প্রতি মায়া
সঞ্চালকের প্রশ্ন ছিল, চঞ্চলকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভাষায় বেশি পাওয়া গেছে নাটকে। এর কারণ কী?
চঞ্চল হেসে বলেন, “ওটা আমার জন্মস্থান পাবনার ভাষায়। সবচাইতে বেশি কাজ করা হয়েছে এর পেছনে কারণটা হচ্ছে, আমি আজ পর্যন্ত যত নাটক করেছি, তার ম্যাক্সিমাম নাটকের রাইটার হচ্ছেন বৃন্দাবন দাস। আর ম্যাক্সিমাম নাটকের ডিরেক্টর হচ্ছে সালাহউদ্দিন লাভলু।
"তা লাভলু ভাইয়ের বাড়ি কুষ্টিয়া আর বৃন্দাবনদার বাড়ি হচ্ছে পাবনা। কুষ্টিয়ার ভাষাতে অনেক নাটক করেছি মাসুম রেজার, মাসুম ভাইয়ের। আর নিজের এলাকার ভাষার প্রতি আলাদা মায়া কাজ করে।"
টেলিভিশন নাটকে পা রাখাটাও ছিল এই অভিনেতার জন্য কাকতালীয়। তখন চঞ্চল মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। সুযোগ আসে অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবুর মাধ্যমে।
"গিয়াস উদ্দিন সেলিম ভাই তখন টেলিভিশনে সিরিয়াল বানাচ্ছেন। সেখানে এটিএম শামসুজ্জামান ভাই, হুমায়ুন ফরীদি ভাই, বড় বড় শিল্পী, মানে সেই সময়ের বাঘা বাঘা সব অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন। 'এনেছি সূর্যের হাসি', ২৬ পর্বের ধারাবাহিক। তো ওখানে আমাকে যে ক্যারেক্টারের জন্য ডাকা হয়েছে, সেই ক্যারেক্টারটা যার করার কথা ছিল, তার ডেঙ্গু হয়েছে।
“ডেঙ্গু হওয়ার কারণে এখন ইমিডিয়েটলি কালকে শুটিং এটিএম ভাই এবং ফরিদী ভাইয়ের ডেট নেওয়া। তখন উনি বিপদে পড়েছেন, ওই ছেলেটা তো করতে পারবে না। তখন বাবু ভাইকে সেলিম ভাই বলেছেন, আরণ্যকে তো একটু স্কুলিং ভালো, একটা ছেলেকে একটু দাও আমার তো লাগবে। তখন ওই যে এই যে টেলিভিশনের করা শুরু হল সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে।"
'ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই' থেকে 'মনপুরা'
গিয়াস উদ্দিন সেলিমের নাটকে কাজ করার সময় ফাঁকে ফাঁকে যে আড্ডা চলত, সেখানে 'ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই' গানটি গাইতেন চঞ্চল।
গিয়াস উদ্দিন সেলিম যখন সিনেমা বানানোর ঘোষণা দেন, চঞ্চল তখন ওই চলচ্চিত্রে কেবল গানটি একটু গাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিনেমার পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে জটিলতা তৈরি হয়, কাজ প্রায় সাত-আট বছর পিছিয়ে যায়।
প্রথমে বাণিজ্যিক সিনেমার নায়ক নায়িকার কাজ করার কথা থাকলেও হঠাৎ একদিন পরিচালক ফোন করে চঞ্চলকে প্রধান চরিত্র 'সোনাই' এর ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব দেন।
চঞ্চল বলেন, "হঠাৎ সেলিম ভাই একদিন আমাকে ফোন করে বলছে যে শোন, কাজ শুরু করব, সিনেমার কাজ। আমি গানটার কথা বললাম। তিনি বললেন, গানটা কি গাবি তুই? তোকে গানটা না, ওই অভিনয়টাই, সোনা ক্যারেক্টারটাই যদি দিই? আমি বললাম, কী বলেন সেলিম ভাই! কারণ ওই গল্প তো জানি আমি। স্ক্রিপ্টটা আমাকে পড়িয়েছে অনেক আগে। এই যে সিনেমা করা হলো। তার মানে কোনো কিছুই যে আগে থেকে করব বা প্ল্যান–এটা না।"
বাবা হারানোর শোক নিয়েই 'পদাতিক' সিনেমার কাজে
কলকাতার পরিচালক সৃজিত মুখার্জি যখন প্রথম 'পদাতিক' সিনেমায় মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন, তখন উত্তেজনায় রাতে ঘুম আসেনি চঞ্চলের। শুরুতে বারবার কাজটি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এর মধ্যে চঞ্চলের বাবা অসুস্থ হয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
চঞ্চল বলেন, "মৃণাল সেন, পদাতিক এই নামটা আসলেই আমার শরীরের মধ্যে কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায় এখনো। কারণ আমি কী করেছি, আমি জানি না।"
সৃজিত মুখার্জি যখন প্রথমবার যোগাযোগ করে বলেছিলেন যে যে মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সিনেমা করতে যাচ্ছেন এবং তাতে তাকে ভাবা হচ্ছে, তখন চঞ্চল ভেবেছিলেন হয়ত অন্য কোনো ছোটখাটো চরিত্রে সুযোগ মিলছে।
"আমি বলি হ্যাঁ, অসুবিধা নেই আমি করব। তখন বলেন—'মৃণাল বাবুর চরিত্রটাই আপনি করবেন।'"
সৃজিতের এমন প্রস্তাব শুনে চমকে গিয়েছিলেন চঞ্চল। মৃণাল সেনের মত বিশাল ব্যক্তিত্বকে পর্দায় তুলে ধরা নিজের পক্ষে সম্ভব কি না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান তিনি। উপরন্তু মাত্র এক-দেড় মাসের মধ্যে শুটিং শুরুর তাড়া থাকায় কোনোরকম গবেষণার সময়ও ছিল না।
কাজটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন জানিয়ে চঞ্চল বলেন, "আমি নানাভাবে এড়িয়ে যাই। বলি যে এটা না করে অন্য কাউকে নেন, আমি পারব না।"
তবে পরিচালক সৃজিত মুখার্জি হাল ছাড়েননি। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব চলাকালে সরাসরি প্রযোজক ও প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট নিয়ে হোটেলে হাজির হন তিনি।
ঠিক সেই সময়েই চঞ্চল চৌধুরীর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সময় কিছুটা পিছিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলেও শুটিংয়ের সময়সূচি আগে থেকে নির্ধারিত থাকায় তা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে চঞ্চলের বাবা মারা যান।
তবে পেশাগত জায়গা থেকে বাবার মৃত্যুর মাত্র দুই দিন পরেই ঢাকায় ভারতীয় মেকআপ টিমের কাছে চরিত্রটির 'লুক সেটআপ' করতে হয় চঞ্চলকে। বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান শেষ হওয়ার তিন দিন পর তিনি ঢাকা থেকে কলকাতায় রওনা হন।
পিতৃহারা হওয়ার ব্যথা ও শুটিংয়ের কঠিন মানসিক যন্ত্রণার কথা তুলে ধরে চঞ্চল বলেন, "সৃজিতদাকে গিয়ে আমি বলছি, আমার পক্ষে আর সম্ভব না। দুই-তিন দিন শুট করার পর আমি উনাকে বলেছি দাদা প্লিজ আমাকে ছাড়েন। এই দুই-তিন দিনের শুটিংয়ের খরচ আমি দিয়ে দেব, আমি আর পারছি না।"
তবে সেই কঠিন পরিস্থিতিতেও শুটিং থামাননি তিনি।
"প্রত্যেক রাতে শুটিং শেষ করে বা রুমের মধ্যে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদতাম বাবার জন্যে। তারপর আবার স্ক্রিপ্ট পড়তাম, আবার সকালে শুটিংয়ে যেতাম। "
'হাওয়া' ও 'আয়নাবাজি'
মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম সিনেমা 'হাওয়া'তে কাজ করার গল্প বলতে গিয়ে চঞ্চল জানিয়েছেন, সুমন তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি সংশয়ে ছিলেন।
"সুমন বলেছে, ‘আপনার যে ইমেজ আছে, সেটা ভেঙে চানমাঝি চরিত্রে আসবেন কি না!’ প্রায় দেড়-দুই বছর একসঙ্গে কাজ করেছি, তিন-চার মাস রিহার্সাল। শুটিং হয়েছে ৪৫ দিন, একদম মধ্য সমুদ্রে। সেন্ট মার্টিনে থেকে দুই আড়াই ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে ডিপ সিতে গিয়ে শুটিং, সন্ধ্যায় ফেরা। শুটিং শেষ করে ঢাকায় ফিরেও এক মাস শরীর কাঁপত। ভোর ৩টায় প্রথম কল থাকত, মেকআপ আর্টিস্ট আমাকে ঘুম থেকে তুলে নখ থেকে চুল পর্যন্ত মেকআপ করাতেন।"
অমিতাভ রেজার 'আয়নাবাজি'তে একইসঙ্গে একাধিক চরিত্রে রূপান্তরের অভিজ্ঞতাও বলেন চঞ্চল।
"অমিতাভ একটা ওয়ান লাইনার শোনাল, একজন লোক অন্যের হয়ে জেল খাটে, একদম তার মত সেজে, তার মত কণ্ঠ, তার মত হাঁটাচলা করে। মোট ছয়টা চরিত্র, তার মধ্যে আমার তিনটায় ট্রান্সফর্মেশন হবে।
“মনে হল, এটা যদি সাকসেসফুলি করতে পারি, পুরো দুই আড়াই ঘণ্টা জুড়ে একটা সেকেন্ডের জন্যও আমি ছাড়া কোনো ফ্রেম ছিল না। কয়েক মাস ধরে রিহার্সাল, ক্যারেক্টার ব্রিফিং, মুভি দেখা চলেছে।"
ওটিটিতে জনপ্রিয় হওয়া 'কারাগার' সিরিজের অভিজ্ঞতা ছিল আরেকরকম। প্রতিদিন তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লেগেছে রূপটান নিতে। বাসায় ফিরে তা তুলতেও সময় লাগত দেড় ঘণ্টা।
চঞ্চল বলেন, কারাগার সিরিজে তার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তার অভিনয় দেখে যেন দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তারা যেন ভাবতে শুরু করেন তিনি আড়াইশো বছর ধরে কারাগারে আটক আছেন।
“আমি মনে করি, যে চরিত্রে আমি অভিনয় করি বা করতে চাই সেটায় আমি নিজে বিশ্বাস করেছি কি না। আমি বিশ্বাস করলেই আসলে দর্শক বিশ্বাস করবে।”
ওটিটি: উত্থান আর ভাটার গল্প
কোভিড মহামারীর সময় থেকে বাংলাদেশে ওটিটির উত্থান নিয়ে চঞ্চল বলেন, "প্রথম দিকে তাকদীর, কারাগার, মহানগরের মত ভালো কাজ হয়েছিল। হইচই দাঁড়িয়ে গেল, চরকিও এল। প্রথম এক-দুই বছর ওটিটির রমরমা সময় গেছে। সিনেমা তখন কম হচ্ছিল, তাই সিনেমার একটা অল্টারনেটিভ হিসেবে সময় নিয়ে গবেষণা করে কাজ হচ্ছিল, যেটা নাটকে পাইনি। কিন্তু লাস্ট দুই বছরে দেখলাম, সেটা অনেকটা পড়ে গেছে।”
তার মতে, বাজেট সংকটও এর একটি কারণ।
“প্রথম দিকের যে বাজেট দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটা আর বাড়েনি, অথচ প্রত্যেক বছর সবকিছুর দাম বাড়ছে। যে কোনো মাধ্যমে কাজ করতে গেলে এখন টাকার অংকটা আগে উঠে আসে। যে কাজগুলো ভালো হচ্ছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষ বিনা পয়সায় বা শুধু ভালোবেসে শ্রম আর মেধা দিচ্ছে। ওটিটিতেও, সিনেমাতেও সবার মূল্যায়ন কিন্তু হচ্ছে না। কথাটা দায়িত্ব নিয়েই বললাম, অনেকে মাইন্ড করবে, কিন্তু এটাই সত্য। আমরা চাই প্রত্যেকে যার যোগ্য সম্মানী আর সম্মান নিয়ে কাজটা ঠিকঠাক করুক।"
'শিল্পীর সম্মানটা দিনে দিনে ধ্বংসপ্রাপ্ত'
মঞ্চের কাজে সময় সংকট আর পেশাগত আক্ষেপ নিয়ে চঞ্চল বলেন, "আমার ব্যক্তিগত আক্ষেপ খুব বেশি নেই। যতটুকু সামর্থ্য ছিল, করেছি। কিন্তু আক্ষেপ হচ্ছে, আমরা যে সেক্টরে কাজ করি—মঞ্চ, টেলিভিশন, সিনেমা বা ওটিটি—এই জায়গাগুলো যেন ঠিকঠাক হয়।
“শিল্পী যেন তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায়, সম্মান পায়, সম্মানী পায়। শিল্পীর সম্মানটা দিনে দিনে ধ্বংসপ্রাপ্ত।"