ক্যান্সার জয় করে অবিশ্বাস্যভাবে অস্ট্রেলিয়া দলে ফিরে এখনও ‘হতভম্ব’ ম্যাডিনসন
১৯ মাস ধরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে না খেলার পরও অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে ডাক পেয়ে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না ৩৪ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
গত বছর যখন নিক ম্যাডিনসন জানালেন ক্যান্সারের চিকিৎসা করিয়েছেন, তখন তার অনেকগুলো মর্মস্পর্শী কথার মধ্যে একটি ছিল, ছেলে অগাস্টের সাথে ক্রিকেট খেলতে না পারার কষ্ট। এখন তিনি ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে পারেন। নাটকীয় ৭২ ঘণ্টার পর গত শুক্রবার যখন বাড়িতে গিয়ে ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ ও পাসপোর্ট নিয়ে ঝড়ের বেগে বের হওয়ার সময় অগাস্টের কাছ থেকেও বিদায় নিতে হলো তাকে।
আবেগময় মুহূর্তে ছেলেকে তিনি জানালেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় যেতে হচ্ছে। ‘দক্ষিণ আফ্রিকা’ নামটি শুনে সেই দেশের চেনা সব প্রাণীর নাম গড়গড় করে বলতে শুরু করল তিন বছর বয়সী অগাস্ট। সেই মুহূর্তটি মনে করে ম্যাডিনসন বললেন, “ব্যাপারটা বেশ দারুণ ছিল...।”
ওই তিনটি দিন সম্ভবত ম্যাডিনসনের জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়। শেফিল্ড শিল্ডের নতুন মৌসুম নিউ সাউথ ওয়েলসকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। অনুশীলনে তৈরি করছিলেন সামনের চ্যালেঞ্জের জন্য তৈরি হতে। কিন্তু অভাবনীয়ভাবে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দল থেকে ডাক এলো তার। দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে ছুটলেন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার পথে। এখন তিনি পচেফস্ট্রুমে প্রস্তুতি ম্যাচে আছেন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলের সঙ্গে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যখন তার ফোনের স্ক্রিনে যখন নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান জর্জ বেইলির নামটি ভেসে ওঠে, তিনি ধারণাও করতে পারেননি, কোন চমক তার অপেক্ষায়।
“আমি ভেবেছিলাম হয়তো তিনি আমাকে অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের হয়ে ভারত সফরে যাওয়ার জন্য ফোন করছেন, অথবা আশেপাশে থাকা অন্য কোনো তরুণ খেলোয়াড়ের খোঁজ নিতে চাইছেন। কী হতে চলেছে, কোনো ধারণাই ছিল না আমার।
আমাদের মধ্যে (আগে) কিছুটা কথা হয়েছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে হয়নি যে আমি (জাতীয় দলের) খুব কাছাকাছি ছিলাম। তখনও মনের কোণে আশা ছিল যে, হয়তো একদিন টেস্ট দলে ফিরতে পারব। কিন্তু এখনই ভাবিনি। এটা তাই অবশ্যই বিস্ময়কর ছিল।”
তার জন্য তো বটেই, বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যও এই খবরটি ছিল বিস্ময়ের। তিনি যেভাবে ডাক পেলেন, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে এই নজির তো অতি বিরল!
সবসময় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় বলেই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট সিস্টেমকে শীর্ষে রাখা হয় ক্রিকেট দুনিয়ায়। ম্যাডিনসনের ক্ষেত্রে হয়েছে এর চরম ব্যতিক্রম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, গত ১৯ মাসে কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাচ না খেলেই টেস্ট দলে ফিরেছেন তিনি।
সবশেষ যে মৌসুম খেলেছেন, তার পারফরম্যান্স ছিল বাজে। এরপর অবশ্য ক্রিকেট নামক ব্যাপারটিই তার জীবনে হয়ে উঠেছিল গৌণ। জীবন নিয়েই যে ছিল টানাটানি!
গত বছরের এপ্রিলে তার অণ্ডকোষের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তার চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। তবে লড়াই তিনি চালিয়ে যান। অস্ত্রোপচার করে ও ৯ সপ্তাহের কেমোথেরাপির পর সু্স্থ জন। বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষার পর নিশ্চিত হন, এখন আর তার শরীরে সেই রোগ নেই। গত অক্টোবরে আবার ক্রিকেট অনুশীলনে ফেরেন তিনি।
গত মৌসুমে অবশ্য শুধু টি-টোয়েন্টিতেই সীমাবদ্ধ রাখেন নিজেকে। বিগ ব্যাশে পাঁচটি ম্যাচ খেলেন সিডনি থান্ডারের হয়ে। খুব ভালো করতে পারেননি। তার আসল পরিকল্পনা ছিল এই মৌসুম ঘিরে। কদিন আগে ঘরোয়া এক দিনের ম্যাচের আসরে ফিরে প্রথম ম্যাচে ১৪ রান করলেও পরেরটিতে করেন ১২৬। প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শেফিল্ড শিল্ডের। এর মধ্যেই অকল্পনীয় প্রাপ্তি!
টেস্ট দলে ডাক পাওয়ার সেই ঘোর থেকে এখনও পুরোপুরি বের হতে পারেননি ৩৪ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
“সম্ভবত... এখনও আমি হতভম্ব! তবে খুব বেশি সামনেরটা ভাবনার চেষ্টা করছি না এবং কী সম্ভাবনা থাকতে পারে, তা নিয়ে খুব বেশি মাথায় রাখছি না।”
একসময় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের দারুণ সম্ভাবনাময় তরুণ ব্যাটসম্যান ছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে টেস্ট অভিষেক হয় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অ্যাডিলেইডে। তবে সেই টেস্টে ও পরের দুটি টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভালো করতে পারেননি। জায়গ হারান দলে, আর কখনও ফিরতে পারেননি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ছয়টি টি-টোয়েন্টিও খেলেছেন, সবশেষটি সেই ২০১৮ সালে।
ওই বছরই ফর্ম হারিয়ে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্য দল থেকে বাদ পড়েন তিনি। পরে চলে যান ভিক্টোরিয়ায়, যেখানে তখন কোচ ছিলেন এখনকার জাতীয় দলের কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড। পরের পাঁচ বছরে শেফিল্ড শিল্ডে তার ব্যাটিং গড় ছিল পঞ্চাশের বেশি। অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলেও সুযোগ পান। কিন্তু হাতে চিড় ধরায় ও পরে এসিএল চোটে পড়ায় আবার থমকে যেতে হয়। একসময় ভিক্টোরিয়া ছেড়ে আবার ফেরেন নিউ সাউথ ওয়েলসে।
কিন্তু সেখানে ফিরে আবার তার ব্যাটে রান হারিয়ে যায়। ক্যান্সারের আগে সবশেষ মৌসুমে তার গড় ছিল ১৭.৮০! মৌসুমের শেষ দিকে তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি বুঝতে পারেন, ওই রোগকে সঙ্গী করেই খেলেছেন গোটা মৌসুম।
তবে ক্যান্সারের কারণে তার পারফরম্যান্সে ভাটার টান পড়েছিল, এমনটি তিনি মনে করেন না।
“আমার মনে হয় না রান না করার পেছনে এটা (ক্যান্সার) কোনো কারণ ছিল। এটা এমনই এক জটিল ব্যাপার... ধরুন খুব ভালো ব্যাটিং করছি, ওই মৌসুমে সম্ভবত দুই-তিনবার এমন মুহূর্ত এসেছে, যখন আমি চমৎকার ২০ রান করেও সুযোগ হাতছাড়া করেছি, অথবা কঠোর পরিশ্রম করেও অল্প রানেই আউট হয়ে গেছি। ওই মৌসুমে এমন মুহূর্তও ছিল যখন আমার মনে হয়েছিল আমি সাফল্যের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।
তারপর যখন পেছনে ফিরে তাকিয়ে যখন দেখেছি, পুরো মৌসুমে গড় ২০ বা তারও কম, তখন আসলে ততটা খারাপ লাগেনি। মৌসুমটা অনেকটা এমনই ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়, আসলে ঠিক কী হয়েছে, তা জানা কঠিন।”
ক্যান্সারের পর খেলা ও জীবন নিয়ে মানসিকতা ও দর্শন তার বদলে গেছে অনেকটাই।
‘আমার মনে হয়, জীবনের সামগ্রিক দিকটা এখন সম্ভবত আরও একটু পরিপূর্ণ হয়েছে। পরিবার এবং তার মধ্যে ক্রিকেটের অবস্থানের কারণে জীবনের ভারসাম্যটা বেশ ভালো জায়গায় আছে। এবার এই আবহে ফিরে আসতে খুব একটা নার্ভাস ছিলাম না। ফিরে আসতে পেরে আমি রোমাঞ্চিত। যদিও এটা বেশ আশ্চর্যজনক। তবে এই অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাই।”
দীর্ঘদিন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে না খেললেও নতুন মৌসুমের জন্য তার প্রস্তুতি ছিল দারুণ। সেটিই তাকে বিশ্বাস জোগাচ্ছে টেস্টে সুযোগ পেলে ভালো করতে।
“প্রাক-মৌসুম অনুশীলনে আমি সম্ভবত গত কয়েক বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো অবস্থায় ফিরে এসেছি। এই মুহূর্তে আমার স্বাস্থ্য এবং সবকিছু নিয়ে আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী। অবশ্যই অনেক দিন ধরে কোনো চার দিনের ম্যাচ খেলিনি, কিন্তু শারীরিক দিক থেকে খুব একটা চিন্তিত নই। একবার এতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে মানিয়ে নিতে হয় এবং সুযোগ না আসা পর্যন্ত আমি সম্ভবত তা জানতে পারব না।”
ক্যারিয়ারের যে পর্যায়ে এখন আছেন ম্যাডিনসন, তার দর্শন এখন যেমন, তাতে সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়েও এখন আর বেশি ভাবেন না তিনি।
“আমার মনে হয় না, এখন এখন আমি আগের মতো উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে যাই। যেভাবে খেলতে চাই, সে ব্যাপারে সম্ভবত এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী; কখনও সেটা চাপ সামলানো, আবার কখনও পাল্টা চাপ সৃষ্টি করা।
আমার মনে হয়, খেলার সেই মুহূর্তগুলো আমি শিখে গেছি, যখন এই দুটোর মধ্যে অদলবদল করা যায় এবং সম্ভবত যেভাবে খেলাটা খেলতে চাই, সে ব্যাপারে এখন আরও বেশি নিশ্চিন্ত থাকি এবং শেষ ফলাফল নিয়ে চিন্তা করি না। শুধু খেলাটা উপভোগ করি এবং মাঠে থাকাটা উপভোগ করি।”
