যে দুটি ম্যাচ জিততেই হবে বাংলাদেশকে
আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল খেলার স্বপ্নকে সত্যি করার অভিযানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে নামছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
সংবাদ সম্মেলন কক্ষে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে নাজমুল হোসেন শান্ত হাসিমুখে বললেন, “টেস্ট ম্যাচেও এত সাংবাদিক দেখে ভালো লাগছে…।” টেস্ট ম্যাচের আগে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন এবারই প্রথম নয়। বরং এর চেয়েও বেশি ভিড় নানা সময়েই হয়েছে। তবে টেস্ট ক্রিকেটই যে এখন বাংলাদেশের মূল শক্তির জায়গা, সাদা পোশাকে সুসময়ের যে হাওয়া বইছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়, সেই রোমাঞ্চের রেশই হয়তো ফুটে উঠল টেস্ট অধিনায়কের কণ্ঠে।
সংবাদ সম্মেলনে লোকারণ্য নতুন কিছু না হলেও টেস্ট ক্রিকেটে বাড়তি আগ্রহ এখন দৃশ্যমানই। ক্রিকেট অনুসারী, সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশের ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবাই এখন বড় স্বপ্ন দেখছেন টেস্ট ক্রিকেটকে ঘিরেই। যে স্বপ্নের নাম ‘ফাইনাল।’ আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এখন চার নম্বরে আছে বাংলাদেশ। বাস্তবে কাজটা কঠিন হলেও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সমীকরণ এখনও নাজমুল হোসেন শান্তর দলের নাগালের বাইরে নয়।
সেই স্বপ্ন জিইয়ে রাখার পথে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদক্ষেপ নেওয়ার পালা এবার। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে ম্যাচ দুটি জিততে পারলে নিশ্চিতভাবেই সম্ভাবনার পালে রঙ লাগবে দারুণভাবে। সেই চেষ্টায় প্রথম ম্যাচটি শুরু বুধবার। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে খেলা শুরু সকাল সাড়ে ৯টায়।
টেস্ট শুরুর আগে দিন অধিনায়ক শান্ত বললেন, ফাইনালের ভাবনা এখনই মাথায় আনতে চান না তারা। তবে মনের কোণে যে স্বপ্নটা উঁকি দিতে শুরু করেছে, সেটি ফুটে উঠল তার কথায়। তিনি অবশ্য বারবার বললেন প্রক্রিয়ার পথ ধরে ছুটে চলার কথা।
“অনেক দূরে এখনই চিন্তা করছি না। আমরা যদি ভালো ক্রিকেট খেলতে থাকি, অবশ্যই অর্জন করা সম্ভব (ফাইনালে খেলা)। তবে আমার কাছে মনে হয়, আমরা গত কয়েক বছরে কীভাবে ক্রিকেট খেলছি, প্রত্যেকটা ম্যাচ ধরে কত ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি, প্রতিটি সেশনে কত ভালো করতে পারি, সবসময় এভাবে খুব ছোট টার্গেট নিয়ে ক্রিকেট খেলছি। যখন আমরা মিটিং করি বা অনুশীলন করি ও প্রস্তুতি নেই, তখন আমাদের এই ধরনের আলোচনাই হয়।
“আমরা বাড়তি কোনো কিছু করতে চাই না, প্রক্রিয়াটা অনুসরণ করতে চাই। আমরা যে জিনিসটা পারি, ওই জিনিসটাই শতভাগ দিয়ে করতে চাই। এখানে আমি কারও কাছ থেকে বাড়তি প্রচেষ্টা চাই না। প্রক্রিয়াটা অনুসরণ করে যেভাবে ফলাফল পাচ্ছি, ওই জিনিসটাই মাঠে করে দেখাতে চাই।”
টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে লোকের আগ্রহ, ফাইনালের হাতছানি, সবকিছুতে রোমাঞ্চ অনুভব করছেন অধিনায়ক। তবে এটুকুও জানিয়ে রাখলেন, দল হিসেবে তারা তৃপ্ত নন মোটেও।
“এটা অবশ্যই ভালো লাগছে সবাই টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছে। তবে সংস্কৃতিটা আরও দুই-তিন বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে। আরও অনেক ভালো করার সুযোগ আছে। যেভাবে আসলে আমরা ক্রিকেটাররা চিন্তা করছি, আমরা ভালো করছি, তারপরও কিন্তু আমরা খুশি নই। আমাদের মনে হয় যে এখান থেকে আরও উন্নতির অনেক জায়গা আছে। সবার পা মাটিতেই আছে এখনও।”
উন্নতির সেই তাড়না থাকাটা জরুরিও বটে। কারণ টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সুসময় চলছে বলার সঙ্গে অবশ্য একটু পাদটীকাও জুড়ে দিতে হবে। অভাবনীয় কিছু ফলাফলের পাশাপাশি এসেছে অপ্রত্যাশিত কিছু ধাক্কাও। এই বছর পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার পর ইনিংস ব্যবধানে হারতে হয়েছে জিম্বাবুয়ের কাছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে ঐতিহাসিক জয়ের পর ম্যাকাইতে পরাজয় এসেছে দুই দিনেই। অতি সম্প্রতি আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়ের সুবাস পেয়েও ড্রয়ের হতাশায় শেষ হয়েছে ম্যাচ।
আবু ধাবিতে আফগানদের বিপক্ষে ওই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই টেস্টের জন্য গোটা দল একসঙ্গে অনুশীলন করতে পেরেছে স্রেফ দুটি দিন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেই তুলনায় প্রস্তুতি নিয়েছে বেশ ভালো। এখানে আসার আগে চেন্নাই সুপার কিংস একাডেমিতে ১০ দিনের ক্যাম্প করেছে তারা কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে। ঢাকায় এসে খেলেছে দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ। বেশ তৈরি হয়েই নামছে ক্যারিবিয়ানরা।
তবে শান্ত আশ্বাস জোগালেন, তাদের প্রস্তুতিও দারুণ হয়েছে।
“আমি বলব যে ভালো প্রস্তুতি নিতে পেরেছি। বিশেষ করে, আফগানিস্তান সিরিজের পরে (ত্রিদেশীয় সিরিজ) যে ক্রিকেটাররা দেশে চলে এসেছিল, তারা আগেভাগেই অনুশীলন শুরু করেছে। আমার মনে হয় যে আমরা ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি এবং কন্ডিশনটা আমাদের জানাই। স্বাভাবিকভাবে ধারণা তো আছে। প্রস্তুতি নিয়ে বলব যে, আমি খুশি আছি।”
উইকেটের সম্ভাব্য আচরণ কেমন হবে, তা নিয়ে অবশ্য খুব বেশি কিছু বলতে চাইলেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে উইকেট সংক্রান্ত কোনো তথ্য তিনি দিতে চান না। ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক রস্টন চেইস বললেন, উইকেটে আপাতত ঘাস থাকলেও শেষ পর্যন্ত স্পিন সহায়ক হবে বলেই মনে করছেন তারা।
উইকেটে নিয়ে ধাঁধা থাকলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে খুব একটা সংশয় নেই। ওপেনিংয়ে থাকছেন তানজিদ হাসান ও সাদমান ইসলাম, এরপর মুমিনুল হক, শান্ত, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। কৌতূহল থাকবে বোলিং আক্রমণ নিয়ে। দেশের সফলতম বোলার তাইজুল ইসলাম তো থাকছেনই। কিন্তু প্রশ্ন থাকছে, তৃতীয় স্পিনার কি খেলানো হবে? পেস আক্রমণে থাকবেন কজন এবং কারা, সেটি নিয়েও আছে আগ্রহ।
আবু ধাবি টেস্টে মিরাজ ও তাইজুলের সঙ্গে তৃতীয় স্পিনার হিসেবে ছিলেন নাঈম হাসান। পেস আক্রমণে ছিলেন হাসান মাহমুদ ও ইবাদত হোসেন। ওই টেস্টে বিশ্রামে থাকা তাসকিন আহমেদ এই টেস্টের আগে অনুশীলনে বল করেছেন লম্বা সময়। অভিজ্ঞ এই পেসারকে একাদশে দেখা যেতেও পারে। শরিফুল ইসলামকে খেলানোর কথাও ভাবতে পারে দল।
পেস আক্রমণ নিয়ে শান্ত খোলাসা না করলেও এটুকু জানালেন, পেসারদেরকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হযেছে।
“পেস বোলারদের ক্ষেত্রে মধুর সমস্যা বা এরকম আসলে বলতে চাই না। কারণ পেস বোলাররা জানে কে কখন খেলবে এবং তারা খুবই পরিষ্কার কোন কন্ডিশনে কখন কে খেলবে। খুব ভালো ব্যাপার যে, প্রত্যেকটা সিরিজের জন্য যারা স্কোয়াডে থাকে, তারা প্রত্যেকটা ম্যাচ খেলার জন্য তৈরি থাকে। প্রস্তুতির দিক থেকে তারা খুব ভালো অবস্থানে সবসময় থাকে। এটা একটা ভালো ব্যাপার যে যেকোনো সময় আমি যেকোনো কাউকে ম্যাচের জন্য নিতে পারি।”
বাংলাদেশের সামনে যখন দারুণ কিছুর হাতছানি, উল্টো চিত্র সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে এটিই শেষ সিরিজ ক্যারিবিয়ানদের। পয়েন্ট তালিকায় তারা আছে তলানি থেকে দুইয়ে। বড় কোনো স্বপ্ন দেখার বাস্তবতা তাই নেই তাদের। অধিনায়ক চেইস তাই বললেন, শেষটা ভালোভাবে করে কিছু প্রাপ্তির দেখা পেতে চান তারা।
“পয়েন্ট টেবিলে ওপরের দিকে উঠতে হলে এই সিরিজেই এগোতে হবে। এ বছর আমাদের সময়টা বেশ ভালোই কেটেছে। আমরা চারটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছি, দুটিতে জিতেছি, একটি ড্র করেছি এবং একটিতে হেরেছি।
যেমনটা আমি বললাম, এই সিরিজে নামার আগে আমরা বেশ ভালো ফর্মে আছি। তাই আমরা এই দুটি ম্যাচ জিতে পয়েন্ট টেবিলে নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে চাই এবং সম্ভব হলে, পঞ্চম বা ষষ্ঠ স্থানে থেকে সিরিজ শেষ করতে চাই। এটা দলের জন্য বড়দিনের একটি ভালো উপহারও হবে।”
